ফলে জাতীয় খাদ্য উৎপাদনে বড় ভূমিকা রাখলেও তাদের আয় ও উৎপাদনশীলতা বৃহৎ কৃষকদের তুলনায় অনেক কম। এ চিত্র উঠে এসেছে বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) ‘ক্ষুদ্র খাদ্য উৎপাদকদের আয় ও উৎপাদনশীলতা জরিপ ২০২৫’-এ।

কৃষি বিশ্লেষকদের মতে, দেশের কৃষকের বড় অংশই ক্ষুদ্র ও প্রান্তিক। জমির আকার ছোট হওয়ায় তারা আধুনিক যন্ত্রপাতি, উন্নত প্রযুক্তি ও দক্ষ উৎপাদন ব্যবস্থাপনার সুবিধা তুলনামূলক কম পান। ফলে শ্রমের পেছনে ব্যয় বেশি হয়। অন্যদিকে আন্তর্জাতিক গড়ের তুলনায় অনেক ক্ষেত্রে অতিরিক্ত রাসায়নিক সার ও কীটনাশক ব্যবহারের কারণে তাদের উৎপাদন ব্যয় বেড়ে যায়। তাতে লাভের বড় অংশ চলে যায় খরচের খাতায়, মুনাফা থাকে সীমিত। কোনো কোনো ক্ষেত্রে লোকসানও গুনতে হয়।

কেবল খাদ্যশস্যের উৎপাদন বাড়ানোই যথেষ্ট নয় বলে মনে করেন কৃষি বিশ্লেষকরা। তাদের মতে, ক্ষুদ্র কৃষকদের কম আয়ের ফসল থেকে উচ্চ মূল্য সংযোজনকারী কৃষি কার্যক্রম যেমন ফল, সবজি, প্রাণিসম্পদ, মৎস্য ও প্রক্রিয়াজাত কৃষিপণ্যে অংশগ্রহণ বাড়াতে হবে। পাশাপাশি প্রযুক্তির ব্যবহার, যান্ত্রিকীকরণ, বাজার সংযোগ এবং উৎপাদনে বৈচিত্র্য আনতে না পারলে দেশের সংখ্যাগরিষ্ঠ ক্ষুদ্র কৃষক নিম্ন উৎপাদনশীলতা ও কম আয়ের এ চক্র থেকে কখনই বের হতে পারবেন না।

বিবিএসের জরিপ অনুযায়ী, দেশে মোট খাদ্য উৎপাদকের ৫৩ দশমিক ৬৫ শতাংশই ক্ষুদ্র কৃষক। অর্থাৎ বাংলাদেশের কৃষি এখনো মূলত ক্ষুদ্র কৃষিনির্ভর। বিভাগভিত্তিক হিসাবে ক্ষুদ্র কৃষকের হার সবচেয়ে বেশি চট্টগ্রামে (৫৯ দশমিক ৮১ শতাংশ), এরপর রংপুরে (৫৯ দশমিক ২৯ শতাংশ)। বিপরীতে সিলেটই একমাত্র বিভাগ, যেখানে বৃহৎ কৃষকের সংখ্যা ক্ষুদ্র কৃষকের চেয়ে বেশি।

সংখ্যায় এগিয়ে থাকলেও উৎপাদনশীলতায় পিছিয়ে রয়েছেন ক্ষুদ্র কৃষকরা। জরিপে দেখা গেছে, দেশের কৃষিতে সব খাত মিলিয়ে প্রতি শ্রম দিবসে গড় উৎপাদন মূল্য ১ হাজার ৮৬৮ টাকা। কিন্তু ক্ষুদ্র কৃষকের ক্ষেত্রে তা মাত্র ১ হাজার ৪৯৪ টাকা। যেখানে বৃহৎ কৃষকের উৎপাদনশীলতা ২ হাজার ৩০১ টাকা। অর্থাৎ শ্রমপ্রতি উৎপাদনের হিসাবে ক্ষুদ্র কৃষকরা বড় কৃষকদের তুলনায় প্রায় ৮০০ টাকা কম মূল্য উৎপাদন করছেন, যা তাদের আয়বৈষম্যের অন্যতম বড় কারণ হিসেবে সামনে এসেছে।

কৃষি অর্থনীতিবিদ ড. জাহাঙ্গীর আলম বণিক বার্তাকে বলেন, ‘ক্ষুদ্র কৃষকের জমি কম। পুঁজিও কম। ফলে তারা প্রচুর বিনিয়োগ করতে পারেন না। তাদের অধিকাংশই ট্র্যাডিশনাল কৃষিতে থেকে গেলেও আধুনিক প্রযুক্তি ব্যবহার করতে পারেন না। করলেও এটার পরিমাণ কম থাকে। ফলে তাদের উৎপাদনও কম হয়। এজন্য তাদের আয়ও কম। তারা সারা বছর নিজেদের শ্রম বিনিয়োগ করার মতো সুযোগও পান না। সেজন্য ভূমি সংস্কার দরকার।’

তিনি আরো বলেন, ‘বাংলাদেশে এখন ৯২ শতাংশই ছোট কৃষক, যাদের জমির পরিমাণ আড়াই একরের কম এবং দিনের পর দিন এ সংখ্যা বাড়ছে। বড় ও মাঝারি কৃষকের ক্ষয় ধীরে ধীরে বাড়ছে। সেজন্য জমি কনসলিডেট করে আধুনিক চাষের ব্যবস্থা করা এবং কৃষকদের শস্য বা কৃষি-বহির্ভূত বিভিন্ন গ্রামীণ কর্মকাণ্ডে সম্পৃক্ত করতে হবে। এতে তাদের আয় বাড়বে এবং জীবনমান উন্নত হবে।’

বিবিএসের হিসাবে মৌসুমভিত্তিক ফসলের (ধান, গম, ভুট্টা, আলু, সবজি প্রভৃতি) প্রতি শ্রম দিবসে উৎপাদন মূল্য ২ হাজার ৬৬৪ টাকা। গ্রামে যেটি ২ হাজার ৬৯০ টাকা এবং শহরে ২ হাজার ৪৭২ টাকা। এ ফসলের বার্ষিক জাতীয় গড় আয় ৯ হাজার ৮৯৪ টাকা। অন্যদিকে স্থায়ী ফসলে (বহুবর্ষজীবী বাগান বা ফলদ ফসল) প্রতি শ্রম দিবসে উৎপাদন মূল্য ৬ হাজার ৫৩০ টাকা। এ ফসলে বার্ষিক গড় নিট মুনাফা ১৬ হাজার ৮৮৯ টাকা।

আন্তর্জাতিক খাদ্যনীতি গবেষণা প্রতিষ্ঠানের (আইএফপিআরআই) ২০২৪ সালের এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, বাংলাদেশে ১৯৯০-৯১ থেকে ২০২১-২২ সময়ে প্রতি বছর গড়ে দশমিক ৩ শতাংশ হারে চাষযোগ্য জমি কমেছে। বিপরীতে জনসংখ্যা বাড়ছে। ফলে কৃষির উৎপাদনশীলতা বাড়ানোর তাগিদও বেড়েছে।

বাংলাদেশের সবচেয়ে বেশি উৎপাদিত একক পণ্য ধান। যেটির হেক্টরপ্রতি উৎপাদনে অনেক পিছিয়ে রয়েছে বাংলাদেশ। মার্কিন কৃষি বিভাগের (ইউএসডিএ) তথ্যমতে, ২০২৪-২৫ অর্থবছরে বাংলাদেশের হেক্টরপ্রতি ধানের উৎপাদন ছিল ৪ দশমিক ৮২ টন। ওই বছর অস্ট্রেলিয়ায় এ ফলন ছিল ১০ দশমিক ৯২ টন, যুক্তরাষ্ট্রে ৮ দশমিক ৪১ টন। এছাড়া তুরস্কে ৮ দশমিক ৯৩, মিসরে ৮ দশমিক ৪৪, পেরুতে ৮ দশমিক ২১, মরক্কোয় ৭ দশমিক ৮৬, ব্রাজিলে ৭ দশমিক ২৩ ও চীনে ৭ দশমিক ১৫ টন। জাপানে ৬ দশমিক ৮৭ টন, দক্ষিণ কোরিয়ায় ৬ দশমিক ৮৫, ভিয়েতনামে ৬ দশমিক ১৬ ও ইরানে ৫ দশমিক ৩২ টন।

খাতসংশ্লিষ্টরা বলছেন, বিশ্বের অনেক দেশ প্রথাগত কৃষিকে পেছনে ফেলে আধুনিক প্রযুক্তি (ড্রোন, স্মার্ট সেচ) ও উন্নত চাষাবাদ এবং উচ্চ মূল্যের ফসলে মনোযোগ দিচ্ছে। একই সঙ্গে টেকসই চাষাবাদ ব্যবস্থা এবং ডিজিটাল সরঞ্জামের মাধ্যমে জলবায়ু পরিবর্তন মোকাবেলা করছে। যে কারণে সেখানে ফলন বাড়ছে। বিপরীতে বাংলাদেশকে জলবায়ুর অভিঘাতের সঙ্গে লড়াই করতে হচ্ছে; একই সঙ্গে অন্যান্য দেশের মতো ড্রোন, স্মার্ট সেচ, স্যাটেলাইট পর্যবেক্ষণ, ডিজিটাল ফার্ম ম্যানেজমেন্ট ও উন্নত যান্ত্রিকীকরণও এখনো ব্যাপকভাবে ছড়িয়ে পড়েনি।

এসবের পাশাপাশি কৃষকের উৎপাদন ব্যয়ের বিষয়টিও বেশি আলোচিত হয়। বিশ্বে হেক্টরপ্রতি ব্যবহার করা সারের গড়ের তুলনায় বাংলাদেশে দ্বিগুণ ব্যবহার হয়। বিশ্বব্যাংকের হিসাবে, ২০২৩ সালে বিশ্বে আবাদযোগ্য জমির প্রতি হেক্টরে গড়ে ১৩৭ দশমিক ৬ কেজি সার ব্যবহার হয়েছে। একই সময়ে বাংলাদেশে হেক্টরপ্রতি গড়ে সার ব্যবহার হয় ৩৯২ কেজি।

শুধু সারই নয়, কীটনাশকের ব্যবহারও দেশে উদ্বেগজনক। বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) হিসাবে ২০১৫ সালে দেশে ৩৫ হাজার ৫২৩ টন কীটনাশক ব্যবহার হয়েছিল। ২০২৪ সালে দেশে কীটনাশকের ব্যবহার হয় ৪০ হাজার ৮৩২ টন। কৃষি মন্ত্রণালয়ের হিসাবে দেশে আবাদযোগ্য কৃষিজমি ৮৮ দশমিক ২৯ লাখ হেক্টর। সেই হিসাবে হেক্টরপ্রতি কীটনাশক ব্যবহার হয়েছে ৪ দশমিক ৬২ কেজি।

কৃষি খাতসংশ্লিষ্টরা বলছেন, ক্ষুদ্র কৃষকদের উৎপাদন সক্ষমতা কম নয়। বরং পর্যাপ্ত বিনিয়োগের অভাব, ভূমির স্বল্পতা, আধুনিক প্রযুক্তির সুবিধা না থাকায় তারা এ খাতে পুরোপুরি অবদান রাখতে পারছেন না। বিপরীতে ইনপুট ব্যয় বেশি হওয়ায় ক্ষুদ্র কৃষকদের মুনাফাও কম। প্রচলিত কৃষিতে ঘুরপাক খাওয়ায় বাজারেও প্রভাব তৈরি করতে পারেননি কৃষকরা।

এ বিষয়ে বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের কৃষি অর্থনীতি বিভাগের অধ্যাপক ড. এএইচএম সাইফুল ইসলাম বণিক বার্তাকে বলেন, ‘ক্ষুদ্র কৃষক মানেই অদক্ষ না। তারা সবসময়ই দক্ষ। বরং অনেক গবেষণায় ক্ষুদ্র কৃষকদের সম্পর্কে বলা হয়েছে “স্মল ইজ বিউটিফুল”। আমাদের জনসংখ্যা বাড়ছে আর খামার বা জমির আকার ধীরে ধীরে ছোট হচ্ছে। এখানে অনেকে বেশি দক্ষ, কেউ কম। এটার পার্থক্য আছে। কিন্তু সামগ্রিকভাবে তাদের অদক্ষ বলা যাবে না। কৃষকের দক্ষতা নির্ভর করে পরিস্থিতি, প্রাপ্যতা ও প্রবেশাধিকারের ওপর। ইনপুট ও আউটপুট মার্কেটের ওপরও এটি নির্ভর করে।’

তিনি আরো বলেন, ‘ক্ষুদ্র কৃষকের দক্ষতা অনেকটাই নির্ভর করে তার কৃষি উপকরণ ও উৎপাদিত পণ্যের (আউটপুট) বাজারে প্রবেশাধিকার এবং প্রয়োজনীয় সময়ে সেগুলোর প্রাপ্যতার ওপর। একজন কৃষক যখন যে উপকরণটি প্রয়োজন, সেটি যদি সময়মতো এবং সহজে পান তাহলে অদক্ষতার সৃষ্টি হওয়ার কথা নয়। একইভাবে বাজারের বিষয়টিও গুরুত্বপূর্ণ। যদি আমাদের বাজার পুরোপুরি পারফেক্ট মার্কেট হতো, তাহলে এ ধরনের অদক্ষতা অনেকটাই কমে যেত। কিন্তু বাস্তবে আমাদের বাজার ইমপারফেক্ট মার্কেট। এ ধরনের বাজারে অনেক বিষয় কৃষকের নিয়ন্ত্রণের বাইরে থাকে এবং সেগুলো তার উৎপাদন ও আয়ে প্রভাব ফেলে। ক্ষুদ্র কৃষকের সবচেয়ে বড় সীমাবদ্ধতা হলো তারা খুব অল্প পরিমাণে কৃষি উপকরণ কিনে থাকেন। ফলে বড় ক্রেতাদের মতো দরকষাকষির সুযোগ তার থাকে না। এ কারণে একই উপকরণ তাকে তুলনামূলক বেশি দামে কিনতে হয়। অন্যদিকে উৎপাদিত পণ্য বিক্রির ক্ষেত্রেও একই সমস্যা দেখা যায়। ক্ষুদ্র পরিমাণে উৎপাদন করার কারণে কৃষকের দরকষাকষির ক্ষমতা কম থাকে। যদি তার উৎপাদনের পরিমাণ বেশি হতো, তাহলে তিনি ভালো দামে পণ্য বিক্রি করতে পারতেন। অর্থাৎ ক্ষুদ্র পরিসরে উৎপাদনের কারণে কৃষককে একদিকে ইনপুট বেশি দামে কিনতে হয়, অন্যদিকে আউটপুট তুলনামূলক কম দামে বিক্রি করতে হয়। এ দুইদিক থেকেই তারা ক্ষতিগ্রস্ত হন। এ কারণেই কনসলিডেশন, কৃষক সংগঠন, উৎপাদক গোষ্ঠী কিংবা বিভিন্ন গ্রুপভিত্তিক উদ্যোগ কার্যকর সমাধান হতে পারে। কৃষকরা যদি দলগতভাবে উপকরণ কিনতে পারেন এবং উৎপাদিত পণ্য একসঙ্গে বাজারজাত করতে পারেন, তাহলে তাদের দরকষাকষির সক্ষমতা বাড়ে, লেনদেন ব্যয় কমে। ফলে সামগ্রিকভাবে তাদের দক্ষতা বৃদ্ধি পাবে।’