আন্তর্জাতিক সীসা বিষক্রিয়া প্রতিরোধ সপ্তাহ ২০২৬ উপলক্ষে ‘শনাক্তকরণ থেকে প্রতিরোধ’ প্রতিপাদ্যে ‘বাংলাদেশে লেড-ক্রোমেটের বাণিজ্য’ শীর্ষক প্রতিবেদনের তথ্য বিনিময় ও প্রচারের লক্ষ্যে এক গোলটেবিল বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়েছে। মঙ্গলবার (৩ নভেম্বর) ঢাকায় পরিবেশ অধিদপ্তরে এনভায়রনমেন্ট অ্যান্ড সোশ্যাল ডেভেলপমেন্ট অর্গানাইজেশন (এসডো), পরিবেশ অধিদপ্তর এবং আন্তর্জাতিক পলুট্যান্টস এলিমিনেশন নেটওয়ার্কের (আইপিইএন) যৌথ সহযোগিতায় এ অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হয়।

বৈঠকে সরকারি কর্মকর্তা, নিয়ন্ত্রক সংস্থা, উন্নয়ন সহযোগী, শিল্পপ্রতিষ্ঠান ও নাগরিক সমাজের প্রতিনিধিরা অংশ নেন। প্রতিবেদনের মূল ফলাফল তুলে ধরা, বাণিজ্য পর্যবেক্ষণ ও নিয়ন্ত্রণমূলক ব্যবস্থা জোরদার করা এবং লেড-ক্রোমেট বাণিজ্য নিয়ন্ত্রণে অংশীজনদের সুপারিশ সংগ্রহ করাই ছিল এই আয়োজনের মূল উদ্দেশ্য।

দেশে সীসার সংস্পর্শ জনস্বাস্থ্য ও পরিবেশের জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ উদ্বেগের বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে এবং বিশেষ করে শিশু ও অন্যান্য ঝুঁকিপূর্ণ জনগোষ্ঠীর ক্ষেত্রে এই ঝুঁকি সবচেয়ে বেশি। লেড-ক্রোমেট একটি সীসাযুক্ত রাসায়নিক রঙ্গক, যা রং, কোটিং ও প্লাস্টিকসহ বিভিন্ন রঙিন পণ্যে উজ্জ্বল হলুদ, কমলা ও লাল রং তৈরিতে ব্যাপকভাবে ব্যবহৃত হয়। সীসার সংস্পর্শে মানুষের মস্তিষ্ক ও স্নায়ুতন্ত্রের অপূরণীয় ক্ষতি হতে পারে এবং শিশুদের ক্ষেত্রে বুদ্ধিঙ্ক বা আইকিউ হ্রাস, শেখার অসুবিধা ও আচরণগত সমস্যা দেখা দেয়।

বাংলাদেশ স্ট্যান্ডার্ডস অ্যান্ড টেস্টিং ইনস্টিটিউশন (বিএসটিআই) রঙে সীসা নিয়ন্ত্রণের জন্য প্রাথমিক কিছু আইনি পদক্ষেপ গ্রহণ করেছে। বিডিএস মানদণ্ডের আওতায় সাজসজ্জার রঙে মোট সীসার সর্বোচ্চ সীমা বাধ্যতামূলকভাবে নব্বই পিপিএম নির্ধারণ করা হয়েছে। শিল্পকারখানার রঙের জন্যও বিএসটিআই একই নব্বই পিপিএম সীমার খসড়া মান তৈরি করেছে, যা এখনো গেজেট আকারে প্রকাশের অপেক্ষায় আছে। তবে এসব নিয়ম থাকা সত্ত্বেও সীসা ক্রোমেট আমদানির কার্যকর নজরদারি, কাস্টমসের পণ্য শ্রেণিবিন্যাস, বাজার তদারকি ও আইন প্রয়োগে আরো বেশি মনোযোগ দেয়া প্রয়োজন।

বাংলাদেশ কাস্টমস ট্যারিফে লেড-ক্রোমেট পিগমেন্ট মূলত এইচএস কোড ৩২০৬২০০০, যা ক্রোমিয়াম যৌগভিত্তিক পিগমেন্ট ও প্রস্তুতির আওতায় পড়ে। তবে এই কোডটির ব্যবহার বেশ বিস্তৃত হওয়ায় এতে লেড-ক্রোমেটকে আলাদা করে শনাক্ত করা যায় না। পণ্য চিহ্নিতকরণের এই ত্রুটি বাংলাদেশে লেড-ক্রোমেট আমদানির সুযোগ তৈরি করে দিয়েছে এবং এসডোর গবেষণা অনুযায়ী এর বেশির ভাগই ভারত থেকে আসে।

গোলটেবিল বৈঠকে এসডোর পলিসি অ্যান্ড অ্যাডভোকেসি অ্যাসোসিয়েট ড. ফয়জুন নাহার আইপিইএন-এর সহযোগিতায় প্রস্তুতকৃত প্রতিবেদন উপস্থাপন করেন। প্রতিবেদনে দেশের লেড-ক্রোমেটের আমদানি ও রফতানির ধরন, বাণিজ্যিক চর্চা এবং রঙসহ অন্যান্য পণ্যে লেড-ক্রোমেট ব্যবহারের সম্ভাবনা পর্যালোচনা করা হয়। এই তথ্যগুলো বিদ্যমান নজরদারি ও নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থার ঘাটতি বুঝতে এবং জাতীয় পর্যায়ে নিয়ন্ত্রণ জোরদারে করণীয় নির্ধারণে সহায়ক হবে।

প্রতিবেদনে বেশ কিছু গুরুত্বপূর্ণ পর্যবেক্ষণ তুলে ধরা হয়। বাংলাদেশে লেড-ক্রোমেট রঙ্গক উৎপাদনের কোনো প্রমাণ পাওয়া যায়নি এবং পর্যালোচিত কোনো ডেটাসেটে বাংলাদেশকে রপ্তানিকারক হিসেবেও দেখা যায়নি। আলাদা কোনো এইচএস কোড না থাকায় এটি সাধারণ একটি কোডের আওতায় বাণিজ্য হয়, যেখানে সীসাবিহীন রঞ্জকও অন্তর্ভুক্ত থাকে। ইউএন কমট্রেড-এর তথ্য অনুযায়ী দুই হাজার বাইশ থেকে দুই হাজার পঁচিশ সালের মধ্যে বাংলাদেশের সংশ্লিষ্ট পণ্যের আমদানি একান্ন দশমিক এক শতাংশ বেড়েছে। আমদানি করা লেড-ক্রোমেটের বেশির ভাগ সরবরাহ করেছে ভারত এবং এরপর রয়েছে চীন। আমদানিকৃত লেড-ক্রোমেটের প্রধান ব্যবহার রঙ শিল্পে হলেও প্লাস্টিক রঙিনকরণে উল্লেখযোগ্য কোনো দেশীয় উৎপাদক চিহ্নিত হয়নি। পাশাপাশি লেড-ক্রোমেট এখনো রটারডাম কনভেনশনের পূর্ব-অবগত সম্মতি পদ্ধতির আওতায় তালিকাভুক্ত না হলেও তা তালিকাভুক্তির পরিকল্পনা রয়েছে।

প্রধান অতিথির বক্তব্যে পরিবেশ অধিদপ্তরের মহাপরিচালক ড. মো. লুৎফর রহমান বলেন, সীসা বিষক্রিয়ার পরিস্থিতি দিন দিন আরো গুরুতর হচ্ছে এবং এটি সরাসরি মোকাবেলা করতে হবে। শিক্ষার্থীদের এই সংক্রান্ত গবেষণার দিকে উৎসাহ দিতে সরকারের পক্ষ থেকে অর্থায়ন করা দরকার এবং রাসায়নিকভাবে সীসা আরো অনেক বিষাক্ত মৌলের সঙ্গে জড়িত থাকায় এটি একটি বহুমাত্রিক সমস্যা।

বিশেষ অতিথির বক্তব্যে পরিবেশ, বন ও জলবায়ু পরিবর্তন মন্ত্রণালয়ের অতিরিক্ত সচিব ড. মো. সাইদুর রহমান জানান, লেড-ক্রোমেট-সংশ্লিষ্ট শিল্প খাতের একটি বিস্তারিত অর্থনৈতিক বিশ্লেষণ প্রয়োজন। অর্থনৈতিক স্বার্থ রক্ষা করতে হলে বর্তমান পরিস্থিতিতে গবেষণাভিত্তিক পদ্ধতি অনুসরণ করতে হবে এবং সমস্যার পাশাপাশি সমাধানও প্রযুক্তিনির্ভর হতে হবে।

গেস্ট অব অনার পরিবেশ অধিদপ্তরের অতিরিক্ত মহাপরিচালক মোহাম্মদ সোলায়মান হায়দার জানান, প্রথমে সংকট ও তার স্বাস্থ্যঝুঁকি কতটা বড় তা বুঝতে হবে এবং খোলা বাজারের বেশির ভাগ অংশ নিয়ন্ত্রণের বাইরে থাকায় বাজারকে সরকারের নজরদারির আওতায় আনা একটি বিশাল চ্যালেঞ্জ।

জাতীয় প্রতিষেধক ও সামাজিক চিকিৎসা প্রতিষ্ঠানের (নিপসম) পরিচালক অধ্যাপক ড. নাসরিন সুলতানা জানান, পুরো ব্যবস্থাকে বাজার তদারকির আওতায় আনতে হবে এবং নারী ও শিশুরা এসব ক্ষতিকর পদার্থের সংস্পর্শে কীভাবে আসছে সেদিকে বিশেষ নজর দিতে হবে।

এসডো-এর প্রতিষ্ঠাতা ও মহাসচিব ড. মো. শাহরিয়ার হোসেন জানান, সীসার সংস্পর্শে আসার কোনো নিরাপদ বা গ্রহণযোগ্য মাত্রা নেই এবং শিল্পপ্রতিষ্ঠানগুলোকে নিরাপদ বিকল্পের দিকে যেতে উৎসাহিত করতে গ্রিন ট্যাক্সেশনের মতো পদক্ষেপ খতিয়ে দেখতে হবে। ২০২৫ সালের গবেষণায় ৯০ শতাংশ রং প্রস্তুতকারক প্রতিষ্ঠান আগে থেকেই সীসার সীমা মেনে চলার উৎসাহজনক তথ্য দিয়েছে বলে জানান তিনি।

এসডো-এর নির্বাহী পরিচালক সিদ্দিকা সুলতানা বলেন, সীসামুক্ত বাংলাদেশের জন্য দেশের একটি জাতীয় কৌশল ও বহুবর্ষী কর্মপরিকল্পনা রয়েছে এবং এখন এর কার্যকর বাস্তবায়ন দরকার।

পরিবেশ অধিদপ্তরের উপপরিচালক ড. আবদুল্লাহ আল মামুন বলেন, জবাবদিহি ব্যবস্থা ভালো করতে এক্সটেন্ডেড প্রডিউসার রেসপন্সিবিলিটি বাধ্যতামূলক করতে হবে এবং বাংলাদেশে কী পরিমাণ লেড-ক্রোমেট আমদানি হচ্ছে তা নিয়ে আরো মূল্যায়ন প্রয়োজন।

জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক ড. মো. মোহাম্মদ মোস্তাফিজুর রহমান বলেন, জনস্বাস্থ্যের জন্য সীসা যে ঝুঁকি তৈরি করে তা লুকানোর সুযোগ নেই এবং বিভিন্ন পণ্যে সীসা মেশানোকে সঠিক বলে প্রমাণ করার মতো কোনো জৈবিক প্রয়োজন কখনো ছিল না।

বার্জার পেইন্টস বাংলাদেশের চিফ আর অ্যান্ড ডি অফিসার ড. এ এস এম ওবায়দুল্লাহ মাহমুদ বলেন, বাংলাদেশ সীসামুক্ত রঙ শিল্পের দিকে এগোচ্ছে এবং গবেষণা ও উন্নয়ন জোরদার করা গেলে এই রূপান্তর আরো মসৃণ হবে।

পরিবেশ অধিদপ্তরের পরিচালক রাজিনারা বেগম তার সমাপনী বক্তব্যে জানান, রাসায়নিক সংক্রান্ত বিধিমালা খসড়া করা হচ্ছে এবং সেখানে সীসাকে বিশেষ গুরুত্ব দিতে হবে। রটারডাম কনভেনশন অনুমোদনের প্রক্রিয়া চলছে এবং সবার আগে শ্রমিকদের পেশাগত স্বাস্থ্য ও নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে হবে।

এই আয়োজনের মাধ্যমে লেড-ক্রোমেটের আমদানি ও বাণিজ্যের ধরন, কাস্টমসের পণ্য শ্রেণবিন্যাস এবং আমদানি পদ্ধতি সম্পর্কে জ্ঞান বিনিময় ও বোঝাপড়া বাড়বে বলে আশা করা হচ্ছে। একই সঙ্গে বিভিন্ন দপ্তরের মধ্যে আন্তঃসংস্থা সমন্বয় শক্তিশালী হবে এবং সীসামুক্ত বাংলাদেশের লক্ষ্যে জাতীয় প্রচেষ্টাকে সহায়তা করা সম্ভব হবে।

—বিজ্ঞপ্তি