রংপুর জেলায় চলতি বোরো মৌসুমে ছত্রাকের (ব্লাস্ট) আক্রমণে বিপাকে পড়েছেন কৃষকরা। দু-একটি জাত আক্রান্ত হলেও বরাবরের মতো এবারো ‘ব্রিধান ২৮’ জাতের আবাদকারী কৃষকরা অপেক্ষাকৃত বেশি ক্ষতির সম্মুখীন হয়েছেন।

ভোক্তা পর্যায়ে ব্যাপক চাহিদা থাকায় কৃষকরা পুরনো এ জাতটি আবাদ করে অতিরিক্ত রোগবালাইয়ের কারণে প্রায়ই ক্ষতির মুখে পড়ছেন। তাই কৃষি বিভাগ থেকে প্রাচীন ‘ব্রিধান-২৮’ জাতের আবাদের পরিবর্তে কৃষকদের অন্য জাতের ধান আবাদে বেশি উৎসাহ প্রদান করার দাবি উঠেছে।

রংপুর সদর উপজেলার হরিদেব ইউনিয়নের রামনাথপুর গ্রামের কৃষক আশরাফুল ইসলাম এ বছর ১ একর ৫০ শতক জমিতে ২৮ জাতের ধানের আবাদ করেছেন। এক মাসের মধ্যে ফলন ঘরে তোলার জন্য প্রস্তুতিও নিচ্ছিলেন। কিন্তু ব্লাস্ট রোগে তার সেই স্বপ্ন ভেঙে গেছে। তিনি আশঙ্কা করছেন, জমির শতকরা ৭০ ভাগ গাছ নষ্ট হয়ে গেছে।

একই উপজেলার চন্দনপাট ইউনিয়ন, রাধাকৃঞ্চপুরসহ একাধিক জমির ২৮ জাতের ধানে ব্যাপক ব্লাস্ট দেখা দিয়েছে। চন্দনপাট ইউনিয়নের জিরার পাড় গ্রামের কৃষক বুলু সাড়ে ছয় দোন জমিতে ২৮ জাতের ধান আবাদ করেছেন। কিন্তু ব্লাস্টের কারণে প্রায় অর্ধেক জমির ধান গাছ নষ্ট হয়ে গেছে। ধার-দেনা করে আবাদ করা কৃষক বুলু চলমান করোনায় একটু মুনাফা করার আশা করলেও ফসল ঘরে তোলার অল্প কিছুদিন আগে ছত্রাকের আক্রমণে তার সেই স্বপ্ন ভেঙে চুরমার হয়ে গেল।

গংগাচড়া উপজেলার আলমবিদিতর ইউনিয়নের খামার মোহনা গ্রামের বাসিন্দা সামিউল ইসলাম বলেন, গংগাচড়ার খামার মোহনা এবং নীলফামারী জেলার সীমান্ত এলাকা গাড়া গ্রামে অবস্থিত তার ১৬ দোন জমি চুক্তিতে ধান আবাদ করছেন। তিনি বলেন, এবার হাইব্রিড ১২০৫, বিআর ১৬ এবং ব্রিধান-২৮ জাতের ধান আবাদ করেছেন। কিন্তু ২৮ জাতের ধানে ছত্রাকের আক্রমণ তুলনামূলক বেশি হয়েছে। সদর ও গংগাচড়া উপজেলা ছাড়াও রংপুরের বাকি ছয় উপজেলাসহ মেট্রোপলিটন এলাকায় সর্বত্র ধানে ছত্রাকের আক্রমণ দেখা দিয়েছে। এর মধ্যে ২৮ জাতের ধানে ছত্রাকের আক্রমণ বেশি হয়েছে বলে কৃষক সূত্রে জানা গেছে।

রংপুর জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর সূত্রে জানা গেছে, চলতি মৌসুমে (২০২০-২১) জেলায় ১ লাখ ৩০ হাজার ৯২৫ হেক্টর জমিতে বোরো ধানের আবাদ হয়েছে। এর মধ্যে ২৮ জাতের ধানের আবাদ হয়েছে ২৪ হাজার ২১৩ হেক্টর জমিতে, যা মোট আবাদের শতকরা ১৮ ভাগ। এদিকে ব্লাস্টে আক্রান্ত জমির ধানের পরিমাণ হচ্ছে প্রায় ১১ হেক্টর।

উপসহকারী কৃষি অফিসার মো. রোকনুজ্জামান বলেন, সিংহভাগই আক্রান্ত হয়েছে ব্রিধান ২৮ জাতের ধান। এছাড়া কমবেশি আক্রান্ত হয়েছে ব্রি ২৯, ব্রি ৫৮ এবং ব্রি ৮১।

তিনি বলেন, ব্লাস্ট হচ্ছে ছত্রাক জাতীয় একটি রোগ। বাতাস, বৃষ্টি ও পোকার মাধ্যমে এটি ছড়ায়। ব্লাস্ট আক্রান্ত গাছের শিষের গোড়ায়, পাতার গোড়ায় ও পুরো গিঁটে আক্রান্ত হয়ে পচে যায়।

কিছু আগাম জাতের ধান কাটা শুরু হলেও বর্তমানে গাছে ফুল এসেছে। ফসল ঘরে তুলতে কমপক্ষে আরো মাসখানেক সময় প্রয়োজন বলে জানান মো. রোকনুজ্জামান। গত বছর (২০১৯-২০) জেলায় ধানের আবাদ হয়েছিল ১ লাখ ২৯ হাজার ৯৫৫ হেক্টর। এর মধ্যে ব্রি ২৮ জাতের ধান আবাদ হয়েছিল মোট আবাদের শতকরা ১৭ ভাগ।

রংপুর জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের অতিরিক্ত উপপরিচালক (শষ্য) মো. মাসুদুর রহমান সরকার বলেন, ব্রি ২৮ জাতের ধানের ব্যাপক চাহিদা। তাছাড়া এ ধানের ফসল তুলতে সময় লাগে ১৪০ থেকে ১৪৫ দিন। অন্য ধানের সময় লাগে প্রায় ১৬০ দিন। তাই কৃষকরা ২৮ ধান আবাদে বেশি আগ্রহী হন। কিন্তু এ ধান আবাদ করলে তাকে অবশ্যই দুবার ছত্রাকনাশক ওষুধ স্প্রে করতে হবে। যারা নিয়ম মেনে জমিতে ওষুধ স্প্রে করেছেন তাদের ধানের ক্ষতি কম হয়েছে।