মৎস্য প্রক্রিয়াজাতকরণ প্রতিষ্ঠান ও রফতানিকারক প্রতিষ্ঠান, দেশী ও আন্তর্জাতিক এনজিও এবং ক্ষুদ্র ও মাঝারি উদ্যোক্তাদের কাছে ইলিশ ও অন্যান্য সামুদ্রিক মাছ কৌটাজাতকরণ প্রযুক্তি হস্তান্তর করেছে শেরেবাংলা কৃষি বিশ্ববিদ্যালয় (শেকৃবি)। শনিবার (৩০ মার্চ) বিশ্ববিদ্যালয়ের শেখ কামাল ভবনে ‘ফিশারিজ, অ্যাকুয়াকালচার অ্যান্ড মেরিন সায়েন্স’ অনুষদ আয়োজিত এক কর্মশালায় এ প্রযুক্তি হস্তান্তর করা হয়।
অনুষ্ঠানে মাছের কৌটাজাতকরণের বিভিন্ন দিক এবং বাংলাদেশে এই শিল্পের সম্ভাবনা তুলে ধরেন গবেষক দলের প্রধান অধ্যাপক ড. কাজী আহসান হাবীব। তিনি বলেন, গবেষণায় কৌটাজাতকৃত ইলিশকে এক বছর পর্যন্ত রেখে পরীক্ষা করে দেখা গেছে, এর গুণগত মান অনায়াসেই ভালো থাকে। এই সময়ের মাঝে জারণ ক্রিয়াও তেমন কোনো প্রভাব ফেলে না এবং এর মাঝে কোনো অনুজীবেরও বিকাশ ঘটেনি।
উদ্ভাবিত এই কৌটাজাত ইলিশের বিশেষ বৈশিষ্ট্য হচ্ছে, এর কাঁটা নরম হয়ে মাছের সাথে মিশে যায়। কিন্তু কৌটায় ইলিশের টুকরোর আকৃতি নষ্ট হয় না। ফলে এই ইলিশ খেতে কাঁটা বাছার ঝামেলা নেই। উপরন্তু এই নরম হয়ে যাওয়া কাঁটা বরং ক্যালসিয়ামের উৎস হিসেবে কাজ করে।
এছাড়াও গবেষক দলের প্রধান অধ্যাপক ড. কাজী আহসান হাবীব এই গবেষণায় তার অভিজ্ঞতা এবং প্রাপ্ত ফলাফল কর্মশালায় অংশগ্রহণকারীদের মাঝে বিশদভাবে ব্যাখ্যা করেন। পাশাপাশি এই কর্মশালায় ইলিশ মাছ কৌটাজাতকরণ পদ্ধতি গবেষণাগারে সরেজমিনে পরিদর্শন করানো এবং হাতে কলমে প্রশিক্ষণ দেয়ার মাধ্যমে উদ্ভাবিত ইলিশ মাছের কৌটাজাতকরণ প্রযুক্তিটি অংশগ্রহণকারী প্রতিষ্ঠানগুলোকে হস্তান্তর করেন।
কর্মশালার উদ্বোধনী পর্বে প্রধান অতিথি ছিলেন শেকৃবির উপাচার্য অধ্যাপক ড. মো. শহীদুর রশীদ ভূঁইয়া। এছাড়া সম্মানিত অতিথি মৎস্য অধিদপ্তরের মহাপরিচালক সৈয়দ মো. আলমগীর, বিশেষ অতিথি শেকৃবির উপ-উপাচার্য অধ্যাপক ড. অলোক কুমার পাল, কোষাধ্যক্ষ অধ্যাপক ড. মো. নজরুল ইসলাম এবং সাস্টেইনেবল কোস্টাল এন্ড মেরিন ফিশারিজ প্রকল্পের পরিচালক মো. জিয়া হায়দার চৌধুরী। কর্মশালাটি সভাপতিত্ব করেন ফিশারিজ, অ্যাকুয়াকালচার এবং মেরিন সায়েন্স অনুষদের ডীন অধ্যাপক ড. আসিফ ওয়ারেস নেওয়াজ।
অংশগ্রহণকারী প্রতিষ্ঠানগুলোর পক্ষ থেকে সাগর ফিশ এক্সপোর্টের কর্ণধার আবেদ আহসান সাগর বলেন, বিশ্বে এই মৎস্যজাত পণ্যের ক্যান শিল্পের বিরাট বাজার রয়েছে। তাই রফতানির সম্ভাবনাও প্রচুর। দেশে এই শিল্পটি একেবারে নতুন হওয়ায় তারা এই শিল্পে বিনিয়োগ করলে এ সংক্রান্ত বিভিন্ন সমস্যা সমাধানে মৎস্য অধিদপ্তরসহ সরকারের সংশ্লিষ্ট অন্যান্য দপ্তরের প্রয়োজনীয় সহযোগিতা কামনা করেন তিনি।
মৎস্য অধিদপ্তরের মহাপরিচালক সৈয়দ মো. আলমগীর বলেন, সরকার মৎস্য শিল্পের উন্নয়নে সবসময় আন্তরিক। সরকার তার নির্বাচনী ইস্তেহারে মৎস্য ও মৎস্যজাত পণ্য রপ্তানী করে বৈদেশিক মুদ্রা অর্জনের যে লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করেছে তার পরিমান পনের হাজার কোটি টাকা। এই লক্ষ্যমাত্রা অর্জনে কৌটাজাত ইলিশসহ অন্যান্য কৌটাজাত মাছ হতে পারে একটি গুরুত্বপূর্ণ পণ্য।
শেরেবাংলা কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য অধ্যাপক ড. মো. শহীদুর রশীদ ভূঁইয়া বলেন, ইলিশ আমাদের একটি জিআই পণ্য। জিআই পণ্যের গুরুত্বকে কাজে লাগিয়ে আর্থিকভাবে লাভবান হতে পারলে এটি আরো সার্থকতা পাবে। অধ্যাপক হাবীবের গবেষণা লব্ধ ফল অর্থাৎ টিনজাত ইলিশ তৈরির এই প্রযুক্তি নিঃসন্দেহে এক্ষেত্রে একটি উল্লেখযোগ্য অবদান। গবেষণাটিকে আরো এগিয়ে নিয়ে যেতে হবে। বিশেষ করে এর শেল্ফলাইফ ন্যূনতম ২ বছর পর্যন্ত পরীক্ষা করা দরকার, এতে করে রফতানি সহজতর হবে।
দুই বছর সময় ধরে গবেষণা করে ইলিশের স্বাদ অক্ষুণ্ণ রেখে দীর্ঘদিন সংরক্ষণ যোগ্য কৌটাজাতকৃত পণ্য তৈরির প্রযুক্তি উদ্ভাবন করেছেন শেকৃবির গবেষকদল। এতে নেতৃত্ব দেন অধ্যাপক ড. কাজী আহসান হাবীব। এই গবেষণাটি বাংলাদেশ সরকারের মৎস্য অধিদপ্তরের সাস্টেইনেবল কোস্টাল এন্ড মেরিন ফিশারিজ প্রজেক্ট এর অর্থায়নে পরিচালিত হয়।
দিনব্যাপী অনুষ্ঠিত এই প্রশিক্ষণ কর্মশালায় অংশগ্রহণ করেন ও প্রশিক্ষণ নেন মৎস্য কৌটাজাতকরণ শিল্প স্থাপন ও ব্যবসায়ে আগ্রহী প্রায় ৩০টি মৎস্য প্রক্রিয়াজাতকরণ ও রপ্তানিকারক প্রতিষ্ঠান এবং উদ্যোক্তা সৃষ্টিকারী স্বনামধন্য দেশীয় ও আন্তর্জাতিক এনজিও।










