দেশের রাজনৈতিক ইতিহাস দীর্ঘদিন ধরে একটি প্রভাবশালী একদলীয় রাষ্ট্র ব্যবস্থা, বংশানুক্রমিক নেতৃত্ব, আইনের শাসনের পরিবর্তে আইনকে শাসনের হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহারের ধারায় পরিচালিত হয়েছে, যা কর্তৃত্ববাদকে আরো দৃঢ় করেছে। রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক অলিগার্কি এবং পরিবারতান্ত্রিক রাজনীতির মতো বৈশিষ্ট্যগুলো প্রাতিষ্ঠানিক রূপ পেয়েছে। ফলে নিয়মিত নির্বাচন হলেও প্রকৃত গণতন্ত্রের মৌলিক শর্তগুলো পূরণ হয়নি। তবে জুলাই অভ্যুত্থান এ ধারাবাহিকতায় একটি ‘আংশিক বিচ্ছেদ’ সৃষ্টি করেছে, যদিও তা এখনো পূর্ণাঙ্গ গণতান্ত্রিক রূপান্তরে পরিণত হয়নি।

গতকাল ব্র্যাক বিশ্ববিদ্যালয়ের ব্র্যাক ইনস্টিটিউট অব গভর্ন্যান্স অ্যান্ড ডেভেলপমেন্ট (বিআইজিডি) আয়োজিত ‘বাংলাদেশে গণতন্ত্রের বর্তমান অবস্থা ও ভবিষ্যৎ’ শীর্ষক বার্ষিক সম্মেলনে উপস্থাপিত মূল প্রবন্ধে এসব কথা বলা হয়।

রাজধানীর ব্র্যাক সেন্টার ইন-এ অনুষ্ঠিত সম্মেলনের প্রতিপাদ্য ছিল ‘বাংলাদেশে নির্বাচনী গণতন্ত্রের প্রত্যাবর্তন: ২০২৬ সালের নির্বাচন থেকে প্রতিফলন ও শিক্ষা’।

মূল প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন বিআইজিডির সিনিয়র রিসার্চ ফেলো ড. মির্জা এম হাসান। সম্মেলনে দেশের গণতন্ত্রের বর্তমান অবস্থা, ২০২৬ সালের নির্বাচনের তাৎপর্য ও ভবিষ্যৎ রাজনৈতিক পথচলা নিয়ে গবেষক, শিক্ষাবিদ, নীতিনির্ধারক ও নাগরিক সমাজের প্রতিনিধিরা আলোচনা করেন। সম্মেলনে ‘স্টেট অব গভার্ন্যান্স ২০২৬’ শীর্ষক প্রতিবেদন ‘র‍্যাপচার, রিফর্ম অ্যান্ড রি-ইমেজিনিং: নেভিগেটিং দ্য অ্যাগোনি অব ট্রানজিশন’-এর মোড়ক উন্মোচন করা হয়। অনুষ্ঠানে সানেমের নির্বাহী পরিচালক সেলিম রায়হান, দ্য ডেইলি স্টারের সম্পাদক মাহফুজ আনাম, আইনজীবী সারা হোসেন, ঢাকা ইনস্টিটিউট অব রিসার্চ অ্যান্ড অ্যানালিটিকসের (ডায়রা) রিসার্চ অ্যাসোসিয়েট রাগিব আনজুমসহ রাজনীতিক ও সুশীল সমাজের প্রতিনিধিরা অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন।

সম্মেলনের উদ্বোধনী বক্তব্যে বিআইজিডির নির্বাহী পরিচালক ড. ইমরান মতিন বলেন, ‘গণতন্ত্র কোনো চূড়ান্ত গন্তব্য নয়; এটি একটি চলমান প্রক্রিয়া। তাই নির্বাচনী গণতন্ত্রের প্রত্যাবর্তনকে সমাপ্তি নয়, বরং নতুন যাত্রার সূচনা হিসেবে বিবেচনা করতে হবে। জুলাই অভ্যুত্থানের অভিজ্ঞতা থেকে রাষ্ট্র, সমাজ ও গণতন্ত্রের সম্পর্ক নতুনভাবে মূল্যায়নের প্রয়োজন রয়েছে।’

সম্মেলনে উপস্থিত ব্রিটিশ সাংবাদিক ডেভিড বার্গম্যানের এক প্রশ্নের জবাবে মির্জা হাসান বলেন, ‘এখন বাংলাদেশে নিপীড়নের একটা লঘু সংস্করণ দেখা যাচ্ছে। এক বছরের মধ্যে নিপীড়নের প্রকৃত বা কঠিন রূপ দেখা যাবে। একই বিষয়ের পুনরাবৃত্তি চলে আসছে। বিএনপি রাস্তায় তাদের (জাতীয় নাগরিক পার্টি) ওপর হামলা করছে। ফলে প্রক্রিয়াটা শুরু হয়েছে। রাজনৈতিক ব্যবস্থায় কে অ্যাকসেস (প্রবেশাধিকার) পাবে, এটা শক্তি ও সহিংসতার প্রশ্ন। অ্যাকসেস পেতে সহিংসতার সক্ষমতা থাকতে হয়, এটা না থাকলে কিছুই পাওয়া যায় না। এটাই বিএনপি, এনসিপি ও রাষ্ট্রের মধ্যকার সম্পর্ক।’

প্যানেল আলোচনায় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতি বিভাগের সহকারী অধ্যাপক ড. রুবাইয়া মুর্শেদ বলেন, ‘নাগরিক হিসেবে সক্রিয় হয়ে ওঠার ক্ষেত্রে শিক্ষার গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রয়েছে। কিন্তু দেশের শিক্ষা ব্যবস্থা এখনো সেই ধরনের নাগরিক প্রস্তুতি গড়ে তুলতে পারেনি।’

তিনি মনে করেন, জুলাই অভ্যুত্থানের অভিজ্ঞতা নাগরিক সচেতনতা বৃদ্ধির নতুন সুযোগ তৈরি করেছে।

অলটারনেটিভসের সংগঠক মাহফুজ আলম বলেন, ‘আমরা আন্দোলনের মাধ্যমে প্রচলিত বাম-ডান রাজনীতির বাইরে নতুন ধরনের রাজনীতি গড়ে তুলতে চেয়েছিলাম। কিন্তু আদর্শগত মতভেদের কারণে দলে যে বিভাজন তৈরি হবে, তার জন্য আমরা প্রস্তুত ছিলাম না। প্রতিষ্ঠিত রাজনৈতিক দলগুলোও সেই মতভেদকে কাজে লাগিয়েছে। তাই আন্দোলন থেকে গড়ে ওঠা রাজনৈতিক দলগুলোর টিকে থাকতে হলে নিজেদের মধ্যে ঐকমত্য গড়ে তোলা এবং তা ধরে রাখা খুবই গুরুত্বপূর্ণ।’

রাজনীতিবিদ ও চিকিৎসক ড. তাসনিম জারা বলেন, ‘রাজনৈতিক দলগুলো অনেক সময় নারীদের বিষয়গুলো শুধু নারী শাখার মধ্যেই সীমাবদ্ধ রাখে। আবার নারী শাখার মধ্যেও নারীদের একে অন্যের প্রতিদ্বন্দ্বী হিসেবে দাঁড় করানো হয়। ফলে তারা দলের গুরুত্বপূর্ণ নেতৃত্বের পদে এগিয়ে যাওয়ার সুযোগ পান না।’