সরকারি পরিসংখ্যানে জনআস্থা ফিরিয়ে আনা, তথ্য প্রকাশে স্বচ্ছতা নিশ্চিত করা এবং সবার জন্য পরিসংখ্যান সহজলভ্য করতে সরকার নানা সংস্কার উদ্যোগ নিয়েছে বলে জানিয়েছেন পরিকল্পনা প্রতিমন্ত্রী মো. জোনায়েদ আব্দুর রহিম সাকি। তিনি বলেন, ‘সরকার তথ্যের কোনো বিকৃতি চায় না। বাংলাদেশের জন্য আমাদের সুস্পষ্ট পরিকল্পনা রয়েছে। নির্ভরযোগ্য তথ্যের ভিত্তিতে আমরা এগিয়ে যেতে চাই, অগ্রগতি পরিমাপ করতে চাই এবং প্রয়োজন হলে ভুল সংশোধন করতে চাই।’
রোববার (৮ নভেম্বর) রাজধানীর শেরেবাংলা নগরে বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরো (বিবিএস) মিলনায়তনে ‘জাতীয় পরিসংখ্যান দিবস-২০২৬’ উপলক্ষে আয়োজিত আলোচনা সভায় বিশেষ অতিথির বক্তব্যে প্রতিমন্ত্রী এসব কথা বলেন।
সাকি বলেন, কার্যকর নীতিনির্ধারণ, উন্নয়ন পরিকল্পনা এবং অগ্রগতি মূল্যায়নে নির্ভরযোগ্য পরিসংখ্যান অপরিহার্য। দেশের প্রকৃত অবস্থা বুঝতে, অগ্রাধিকার নির্ধারণ করতে এবং গৃহীত পদক্ষেপের কার্যকারিতা যাচাই করতে সঠিক তথ্য প্রয়োজন। বর্তমান সরকার দায়িত্ব নেয়ার পর গণতান্ত্রিক উত্তরণের পাশাপাশি অর্থনৈতিক ও সামাজিক রূপান্তরকে অগ্রাধিকার দিয়েছে উল্লেখ করে তিনি বলেন, এসব লক্ষ্য বাস্তবায়নে পরিকল্পনা মন্ত্রণালয় সরকারের প্রস্তাবিত আর্থসামাজিক রূপান্তরের পাঁচটি মূল স্তম্ভের আলোকে পাঁচ বছর মেয়াদি কৌশলগত কাঠামো তৈরি করেছে।
প্রতিমন্ত্রী বলেন, ‘সঠিক তথ্য ছাড়া আমরা কোথায় আছি, কোথায় যেতে চাই, কী পদক্ষেপ নেওয়া প্রয়োজন কিংবা সঠিক পথে এগোচ্ছি কি না—তা যথাযথভাবে নির্ধারণ করা সম্ভব নয়।’ পূর্ববর্তী সরকারের সময়ে প্রকাশিত পরিসংখ্যানের বিশ্বাসযোগ্যতা নিয়ে প্রশ্নের কথা উল্লেখ করে সাকি বলেন, সরকারি পরিসংখ্যানে জনআস্থা ফিরিয়ে আনা বর্তমান সরকারের অন্যতম বড় চ্যালেঞ্জ। এ লক্ষ্যে আগে প্রকাশিত অর্থনৈতিক তথ্য, বিশেষ করে মোট দেশজ উৎপাদনের (জিডিপি) হিসাব ও পদ্ধতি নিরীক্ষার উদ্যোগ নেয়া হয়েছে।
বাংলাদেশ উন্নয়ন গবেষণা প্রতিষ্ঠান (বিআইডিএস) পরিকল্পনা মন্ত্রণালয়ের গবেষণা ও পরিসংখ্যান বিভাগের সঙ্গে যৌথভাবে এ গবেষণা পরিচালনা করবে। প্রতিমন্ত্রী জানান, প্রাথমিক গবেষণায় আগের জিডিপি হিসাব পদ্ধতিতে উল্লেখযোগ্য অসংগতি পাওয়া গেছে। প্রকৃত অর্থনৈতিক পরিস্থিতির সঙ্গে এসব হিসাব মিলিয়ে দেখতে হবে।
প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান পরিসংখ্যানের কোনো ধরনের বিকৃতি না করার বিষয়ে স্পষ্ট নির্দেশনা দিয়েছেন উল্লেখ করে সাকি বলেন, ‘তথ্যের বিকৃতি আমাদের ভুল সিদ্ধান্তের দিকে নিয়ে যাবে এবং উন্নয়ন প্রচেষ্টাকে ব্যর্থ করে দেবে। প্রকৃত অবস্থান, অর্জন ও প্রয়োজনীয় সংশোধন বুঝতে নির্ভরযোগ্য পরিসংখ্যান দরকার।’
তথ্য প্রকাশে সংস্কারের কথা তুলে ধরে প্রতিমন্ত্রী বলেন, বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরো (বিবিএস) ভোক্তা মূল্যসূচক (সিপিআই) প্রকাশে প্রযুক্তিনির্ভর সরাসরি তথ্য সংগ্রহ ও প্রকাশ পদ্ধতি চালু করেছে। নতুন ব্যবস্থায় মাঠপর্যায়ের তথ্য সংগ্রহকারীরা কম্পিউটারের সহায়তায় ব্যক্তিগত সাক্ষাৎকার পদ্ধতিতে (ক্যাপি) তথ্য সংগ্রহ করেন। এসব তথ্য সরাসরি ডেটাবেইসে যুক্ত হয় এবং সেখান থেকেই প্রকাশ করা হয়। এ ক্ষেত্রে মন্ত্রীর স্বাক্ষর বা আগাম অনুমোদনের প্রয়োজন হয় না।
তিনি বলেন, এটি একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রাতিষ্ঠানিক পরিবর্তন। এর ফলে পরিসংখ্যান প্রকাশের প্রক্রিয়ায় রাজনৈতিক হস্তক্ষেপের সুযোগ থাকছে না। সময়মতো তথ্য সংগ্রহ ও প্রকাশ নিশ্চিত করতে আধুনিক প্রযুক্তিও ব্যবহার করছে সরকার।
সরকারি তথ্যপ্রাপ্তি সহজ করার বিষয়ে সাকি বলেন, প্রয়োজনীয় পরিসংখ্যান সবার জন্য উন্মুক্ত করতে সংশ্লিষ্ট নীতিমালা সংশোধন করা হয়েছে। শিক্ষার্থী, শিক্ষক ও গবেষকদের গবেষণার সুবিধার্থে ডেটা ল্যাবও চালু করা হয়েছে। তবে তথ্যপ্রাপ্তি শুধু ওই কেন্দ্রে সরাসরি যাওয়ার সুযোগ আছে—এমন ব্যক্তিদের মধ্যে সীমাবদ্ধ রাখতে চায় না সরকার।
প্রতিমন্ত্রী বলেন, ‘নীতিগত সংস্কার ও প্রযুক্তিগত সুবিধার মাধ্যমে আমরা তথ্য জানার অধিকার নিশ্চিত করতে চাই। বাংলাদেশের যেকোনো প্রান্ত, এমনকি বিশ্বের যেকোনো স্থান থেকে মানুষ যেন আমাদের তথ্য ব্যবহার করে স্বাধীনভাবে গবেষণা ও বিশ্লেষণ করতে পারেন, সেই ব্যবস্থা করতে চাই।’
উন্মুক্ত তথ্যব্যবস্থা সরকারি নীতি ও পরিসংখ্যানের স্বাধীন মূল্যায়নের সুযোগ তৈরি করবে উল্লেখ করে তিনি বলেন, শুধু সরকারি সংস্থার মূল্যায়নের ওপর নির্ভর করলে চলবে না। স্বাধীন গবেষক, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ও অন্যান্য অংশীজনের পর্যালোচনা তথ্যের বিশ্বাসযোগ্যতা বাড়াতে সহায়তা করবে।
‘ওয়ান সিটিজেন, ওয়ান ডিজিটাল আইডি, ওয়ান ওয়ালেট’ উদ্যোগের কথা উল্লেখ করে সাকি বলেন, এর মাধ্যমে একটি সমন্বিত নাগরিক তথ্যভান্ডার গড়ে তোলা সম্ভব হবে। পাশাপাশি সমাজের বিভিন্ন শ্রেণি ও গোষ্ঠীর বিভাজিত তথ্য সংগ্রহ সহজ হবে। এতে জনগোষ্ঠীর চাহিদা অনুযায়ী লক্ষ্যভিত্তিক মূল্যায়ন ও তথ্য-প্রমাণনির্ভর সিদ্ধান্ত নেয়া যাবে।
প্রকৃত আর্থসামাজিক পরিস্থিতির প্রতিফলন ঘটে—এমন তথ্য সংগ্রহের ওপর গুরুত্ব দিয়ে প্রতিমন্ত্রী বলেন, একটি বিশ্বাসযোগ্য, স্বচ্ছ ও সহজলভ্য জাতীয় পরিসংখ্যানব্যবস্থা গড়ে তুলতে সরকার, পরিসংখ্যানবিদ, গবেষক ও সংশ্লিষ্ট সব পক্ষকে সম্মিলিতভাবে কাজ করতে হবে।










