দেশের প্রতি ছয়জন বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষার্থীর একজন ই-সিগারেটে বা ভেপিংয়ে আসক্ত। সম্প্রতি বিজ্ঞান সাময়িকী 'প্লোস ওয়ান' এ প্রকাশিত এক নতুন গবেষণায় এ ভয়াবহ চিত্র উঠে এসেছে। শুধু তাই নয়, এই ই-সিগারেটের ব্যবহার তরুণদের মানসিক স্বাস্থ্যের ওপর মারাত্মক নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে বলছে গবেষণা পত্রটি।
‘ভেপিং এবং মানসিক স্বাস্থ্য: বাংলাদেশের বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষার্থীদের মধ্যে একটি ক্রস-সেকশনাল জরিপ’ শীর্ষক গবেষণাটি দেশের সাত বিশ্ববিদ্যালয়ের ১৮ থেকে ২৫ বছর বয়সী ১ হাজার ৬১৫ জন স্নাতক পর্যায়ের শিক্ষার্থীর ওপর পরিচালিত হয়। এর মধ্যে ঢাকার দুটি বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় ও পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয় এবং চট্টগ্রাম, সিলেট ও খুলনার একটি করে পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয় রয়েছে।
গবেষণার ফলাফল বিশ্লেষণ করে দেখা যায়, মোট অংশগ্রহণকারী শিক্ষার্থীদের ১৫ দশমিক ৪ শতাংশ নিয়মিত ই-সিগারেট ব্যবহার করেন। এর মধ্যে শুধু ই-সিগারেটে ব্যবহার করেন ৬ দশমিক ২ শতাংশ শিক্ষার্থী। অন্যদিকে প্রচলিত ধূমপান এবং ই-সিগারেট উভয়ই করেন এমন শিক্ষার্থীর হার ৯ শতাংশ। ই-সিগারেটে আসক্তদের মধ্যে অর্ধেকেরও বেশি ৫৮ শতাংশ এমন ই-তরল ব্যবহার করেন যার মধ্যে উচ্চমাত্রার নিকোটিন রয়েছে ।
ই-সিগারেট বা ভেপিংয়ের পেছনে মূল কারণ হিসেবে ৩৭ দশমিক ৫ শতাংশ শিক্ষার্থীই বলছেন তারা কৌতূহল নিয়ে এটি শুরু করেছেন। এছাড়া বন্ধুদের প্ররোচনায় ২৬ দশমিক ২ শতাংশ এবং সামাজিক ট্রেন্ড বা আধুনিক লাইফস্টাইল ফুটিয়ে তোলার জন্য ১৮ দশমিক ৫ শতাংশ শিক্ষার্থী ই-সিগারেট ব্যবহার করছেন। পাশাপাশি ২৫ শতাংশ শিক্ষার্থীর মধ্যে এ ভুল ধারণা বা গুজব কাজ করে, ই-সিগারেট সাধারণ সিগারেটের চেয়ে কম ক্ষতিকর।
বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের এক শিক্ষার্থী সিগারেটের পাশাপাশি ই-সিগারেটও ব্যবহার করছেন জানিয়ে বণিক বার্তাকে বলেন, ই-সিগারেটের প্রচুর ধোঁয়া আর নানা ফ্রেভার আমাকে আকর্ষণ করে। এছাড়া বন্ধু মহলে যারা স্মোক করে তারা একটাকে স্মার্টনেস হিসেবেই দেখে। শুরুতে ই-সিগারেটের ধোঁয়াই আমাকে আকর্ষণ করেছিল। বলতে গেলে ধোঁয়া নিয়ে একরকম মজা করার বিষয় ছিল।
প্রতিবেশী দেশ ভারতে ক্ষতিকর দিক বিবেচনায় ই-সিগারেটকে নিষিদ্ধ করা হয়। এর আগে ভারতে তরুণদের মধ্যে এর ব্যবহার ২৩ শতাংশ পর্যন্ত পৌঁছেছিল। নিষেধাজ্ঞা অমান্য করলে সর্বোচ্চ ১০ বছর কারাদণ্ডের পাশাপাশি পাঁচ হাজার টাকা জরিমানা এবং দ্বিতীয়বার অমান্য করলে তখন যদি জেল নাও দেয়া হয় তবে এক লাখ টাকা জরিমানা করা বিধান রয়েছে৷
গবেষণার তথ্যমতে, এশিয়ায় সবচেয়ে ভয়াবহ পরিস্থিতি মালয়েশিয়ায়, যেখানে প্রায় ৭৪ দশমিক ৯ শতাংশ বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষার্থী ই-সিগারেটে আসক্ত। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষার্থীদের ক্ষেত্রে এ হার ১২ দশমিক ৮ শতাংশ।
গবেষণাপত্রটি ই-সিগারেটের সঙ্গে শিক্ষার্থীদের মানসিক সমস্যার একটি গভীর ও উদ্বেগজনক সংযোগ উল্লেখ করেছে। সাধারণ ধারণা রয়েছে, ধূমপান মানসিক চাপ কমায়, কিন্তু গবেষণার উপাত্ত বলছে ভিন্ন কথা । যে সব শিক্ষার্থী ই-সিগারেট এবং সাধারণ ধূমপান দুটোই করেন তাদের মধ্যে মানসিক তীব্র যন্ত্রণা বা সাইকোলজিক্যাল ডিস্ট্রেসের হার ৮০ দশমিক ৫ শতাংশ এবং বিষণ্ণতার হার ৬৩ দশমিক ৮ শতাংশ। শুধু ই-সিগারেট ব্যবহারকারীদের মধ্যেও বিষণ্ণতা ৬০ দশমিক ৮ শতাংশ এবং তীব্র দুশ্চিন্তার হার ৫৭ দশমিক ৬ শতাংশের মতো আশঙ্কাজনক পর্যায়ে পাওয়া গেছে।
গবেষণাটির প্রধান গবেষক ডা. ফারাহ সাবরিনা বণিক বার্তাকে বলেন, আমাদের গবেষণার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ বার্তা হলো, ই-সিগারেট বা ভেপিংকে নিরাপদ বিকল্প হিসেবে দেখার যে ধারণা তরুণদের মধ্যে তৈরি হয়েছে, তার সঙ্গে বাস্তবতার বড় ধরনের অমিল রয়েছে। গবেষণায় আমরা দেখেছি, ই-সিগারেট ব্যবহারকারী শিক্ষার্থীদের মধ্যে মানসিক অস্থিরতা, বিষণ্নতা ও উদ্বেগের হার উদ্বেগজনকভাবে বেশি। বিশেষ করে যারা একই সঙ্গে ই-সিগারেট ও প্রচলিত ধূমপান করেন, তাদের মধ্যে মানসিক স্বাস্থ্য সমস্যার ঝুঁকি আরো বেশি দেখা গেছে।
এছাড়া গবেষণায় দেখা গেছে, ই-সিগারেটের কারণে শিক্ষার্থীরা কেবল মানসিকভাবেই ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছেন না, বরং বিভিন্ন শারীরিক জটিলতাতেও ভুগছেন। এর ব্যবহারের ফলে মাথা ঘোরা, ক্রনিক কাশি, ক্ষুধা কমে যাওয়া ও ওজন হ্রাস, তীব্র মাথাব্যথা এবং বুক ব্যথা ও শ্বাসকষ্টের মতো লক্ষণ দেখা গেছে ।
গবেষণা দলের সুপারভাইজার নর্থ সাউথ বিশ্ববিদ্যালয়ের পাবলিক হেলথ বিভাগের অধ্যাপক ও গ্লোবাল হেলথ্ ইনস্টিটিউটের পরিচালক ড. মোহাম্মদ দেলোয়ার হোসেন হাওলাদার বণিক বার্তাকে বলেন, এ ভয়াবহ পরিস্থিতি থেকে তরুণ প্রজন্মকে রক্ষা করতে ই-সিগারেটে ও ডিসপোজেবল ভেপের সহজলভ্যতা বন্ধে দ্রুত আইনি পদক্ষেপ নিতে হবে। ভারতের মতো বাংলাদেশেও এর বিপণন ও আমদানি নিষিদ্ধ করা দরকার। ভেপিং বা ই-সিগারেট সাধারণ সিগারেটের চেয়ে কম ক্ষতিকর, এ ভুল ধারণাও ভাঙতে হবে।










