রোদ-বৃষ্টি মাথায় নিয়ে কর্তব্যের ডাকে ছুটতে হয় পুলিশ সদস্যদের। ডিউটি শুরুর সময় নির্ধারিত থাকলেও শেষটা পরিস্থিতির ওপর নির্ভর করে। দীর্ঘ ডিউটির ফাঁকে জোটে না মানসম্মত খাবারও। এমনকি সুপেয় পানি পাওয়াও ভাগ্যের ব্যাপার হয়ে দাঁড়ায় ডিউটিতে। এমন অস্বাস্থ্যকর কর্মপরিবেশ ও খাদ্যাভ্যাসের কারণে শ্বাসকষ্ট, কিডনিসংক্রান্ত জটিলতা ও হূদরোগ মাঠপর্যায়ে কর্মরত পুলিশ সদস্যদের নিত্যসঙ্গী হয়ে দাঁড়িয়েছে। আর এসব রোগে আক্রান্তদের জন্য কভিড-১৯-এর সংক্রমণ প্রাণঘাতী হয়ে উঠতে পারে বলে মত বিশেষজ্ঞদের।

পুুলিশ সদর দপ্তরের হিসাব মতে, এ পর্যন্ত কভিড-১৯ আক্রান্ত হয়ে মারা গেছেন ছয়জন পুলিশ সদস্য। তারা সবাই ঢাকার বিভিন্ন থানা ও বিভাগে কর্মরত ছিলেন। আবার ঢাকার কর্মরত পুলিশ সদস্যরাই আক্রান্ত হয়েছেন বেশি। বৃহস্পতিবার পর্যন্ত সারা দেশে ১২৮৫ জন পুলিশ সদস্য কভিড-১-এ আক্রান্ত হয়েছেন। এর মধ্যে শুধু ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশেই (ডিএমপি) ৬৬৬  জন পুলিশ সদস্য আক্রান্ত হয়েছেন। এর বাইরে কোয়ারেন্টিনে রয়েছেন ২ হাজার ৬৮৯ জন এবং আইসোলেশনে রয়েছেন ১ হাজার ৮৯ জন পুলিশ সদস্য। সুস্থ হয়ে ফিরেছেন ৯৩ জন।

পুলিশ সদস্যরা জানান, সারা দিন রোদ-বৃষ্টি মাথায় নিয়ে তাদের ডিউটি পালন করতে হয়। দীর্ঘক্ষণ দাঁড়িয়ে ডিউটি করার পর শরীরের চাহিদা অনুযায়ী পানি খাওয়া সম্ভব হয় না। আবার অনেক স্থানে ডিউটি করার সময় আশপাশে খাবারও পাওয়া যায় না। ডিউটি শেষে ব্যারাকে ফিরে থাকতে হয় গাদাগাদি করে। এতে অধিকাংশ পুলিশ সদস্যই শ্বাসকষ্ট, হূদরোগ, ডায়াবেটিস, আলসার ও কিডনিসংক্রান্ত সমস্যায় আক্রান্ত হন।

পুলিশের তথ্যমতে, পুলিশের সবচেয়ে বেশিসংখ্যক সদস্য কর্মরত রয়েছেন ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশে (ডিএমপি)। বায়ুদূষণের এ শহরের রাস্তায় যান চলাচল স্বাভাবিক রাখতে ১২ থেকে ১৮ ঘণ্টা ডিউটি করতে হয় পুলিশের ট্রাফিক বিভাগের সদস্যদের। থানা পুলিশকেও অপরাধ নিয়ন্ত্রণে রাখতে দীর্ঘ ডিউটি করতে হয় চরম দূষণের মধ্যে। ডিউটি শেষে ব্যারাকে ফিরে থাকতে হয় অস্বাস্থ্যকর পরিবেশে গাদাগাদি করে। ডিউটির চাপে অধিকাংশ পুলিশ সদস্যই সময়মতো খাবার খেতে পারেন না।

পুলিশ সদস্যদের মাঝে প্রথম কভিড-১৯ শনাক্ত হয় গত ২৫ এপ্রিল। আর গত ২৮ এপ্রিল এ রোগে পুলিশ সদস্যদের মধ্যে প্রথম মৃত্যুর ঘটনা ঘটে। ডিএমপির ওয়ারী বিভাগে কর্মরত পুলিশ কনস্টেবল জসিম উদ্দিন ওইদিন মারা যান। এর দুদিন পর কভিড-১৯ আক্রান্ত হয়ে আরো দুই পুলিশ সদস্য মারা যান। তারা হলেন এএসআই মো. আবদুল খালেক ও কনস্টেবল মো. আশেক মাহমুদ। এর মধ্যে আবদুল খালেক কর্মরত ছিলেন ডিএমপির পাবলিক অর্ডার ম্যানেজমেন্ট দক্ষিণ বিভাগে। আর কনস্টেবল আশেক মাহমুদ কর্মরত ছিলেন ডিএমপির ট্রাফিক উত্তর বিভাগে। 

এই তিন পুলিশ সদস্যের মৃত্যুর রেশ কাটতে না কাটতেই গত ১ মে মারা যান এসআই নাজির উদ্দিন। তিনি পুলিশের বিশেষ শাখার প্রতিরক্ষা শাখায় কর্মরত ছিলেন। পরদিন অর্থাৎ ২ মে মারা যান এসআই সুলতানুল আরেফিন। তিনি ডিএমপির পাবলিক অর্ডার ম্যানেজমেন্টে কর্মরত ছিলেন। এরপর গত ৬ মে মারা যান এএসআই রঘুনাথ রায়। তিনি পুলিশের পাবলিক অর্ডার ম্যানেজমেন্টের দক্ষিণ বিভাগের আলফা কোম্পানিতে কর্মরত ছিলেন। 

পুলিশ সদর দপ্তরের এআইজি (মিডিয়া) মো. সোহেল রানা জানান, ব্যারাকে বা পুলিশ লাইনসে চিরাচরিতভাবে অল্প পরিসর জায়গায় অনেককে থাকতে হয়। প্রতিনিয়ত মান উন্নয়নের জন্য কাজ করা হচ্ছে। বর্তমান এ পরিস্থিতিতে ব্যারাকে বা লাইনসে একসঙ্গে থাকা একটু ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে উঠেছে।

তিনি বলেন, আমরা চেষ্টা করেছি, সেখানে যারা থাকেন তাদের সামাজিক দূরত্ব বাজায় রাখার জন্য। স্বাস্থ্যবিধি মেনে চলার বিষয়টিতেও গুরুত্ব দেয়া হয়েছে। তার পরও পেশাগত কারণে বাড়তি কিছু ঝুঁকি থেকে যায়। এসব কারণে বাংলাদেশ পুলিশে সংক্রমণের হার একটু বেশি। যেহেতু আমাদের ঝুঁকি বেশি, আমরা ঝুঁকি নিচ্ছিও।

গত বছর কর্তব্যরত অবস্থায় সারা দেশে মারা যান ১৭৯ জন পুলিশ সদস্য। এর মধ্যে ১৪২ জনই মারা যান শারীরিক অসুস্থতার কারণে। এর মধ্যে অধিকাংশই শ্বাসকষ্ট, হূদরোগ ও কিডনিসংক্রান্ত রোগে আক্রান্ত হয়ে মারা যান। এই তিনটি রোগের পূর্ব উপস্থিতি কভিড-১৯ আক্রান্তদের জন্য প্রাণঘাতী হয়ে উঠতে পারে বলে মত বিশেষজ্ঞদের।

আইইডিসিআরের প্রধান বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা এএসএম আলমগীর বণিক বার্তাকে বলেন, কভিড-১৯ আক্রান্তদের বেশির ভাগই ঘরে থেকে চিকিৎসকের পরামর্শ অনুসরণ করে সুস্থ হয়ে উঠেছেন। তবে যারা আগে থেকেই শ্বাসকষ্ট, হূদরোগ, কিডনিজনিত সমস্যায় আক্রান্ত, তাদের জন্য এ সংক্রমণ ঝুঁকিপূর্ণ।

এদিকে করোনাভাইরাস সংক্রমণের মধ্যে স্বাস্থ্যঝুঁকি বিবেচনা করে সতর্কতার সঙ্গে দায়িত্ব পালন করতে নির্দেশ দিয়েছে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়। মন্ত্রণালয়ের রাজনৈতিক অধিশাখা-২-এর সিনিয়র সহকারী সচিব কাইজার মোহাম্মদ ফারাবী স্বাক্ষরিত ওই নির্দেশনায় বলা হয়েছে, আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর প্রত্যেক সদস্য স্বাস্থ্যের ঝুঁকি বিবেচনা করে সতর্কতার সঙ্গে দায়িত্ব পালন করতে হবে।

পুলিশের কভিড-১৯ আক্রান্তের ঝুঁকির বিষয়ে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান বণিক বার্তাকে বলেন, পুলিশকে মাঠপর্যায়ে থেকে কাজ করতে হচ্ছে। তাদের মধ্যে এরই মধ্যে সুরক্ষা সরঞ্জাম সরবরাহ করা হয়েছে। আরো সুরক্ষা সরঞ্জাম আনা হচ্ছে। জাতীর এ সংকটে যেসব পুলিশ সদস্য নিজের জীবন বাজি রেখে কাজ করে চলেছেন, তাদের বিষয়ে সরকার সবসময়ই আন্তরিক।