চারদিনের জাপান সফরে গেলেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। জাপানের প্রধানমন্ত্রী তাকাইচি সানায়ের আমন্ত্রণে তিনি এ সফর করছেন। প্রধানমন্ত্রীর জাপান সফরে কৌশলগত অংশীদারত্ব জোরদার এবং হালনাগাদ ‘মুক্ত ও অবাধ ইন্দো-প্যাসিফিক’ (এফওআইপি) বাস্তবায়নে সমন্বয় বৃদ্ধির প্রত্যাশা করা হচ্ছে। সফরে বাণিজ্য ও বিনিয়োগ সম্প্রসারণ, অর্থনৈতিক অংশীদারত্ব চুক্তির (ইপিএ) বাস্তবায়ন, জ্বালানি ও অবকাঠামো সহযোগিতা এবং আঞ্চলিক ও আন্তর্জাতিক বিভিন্ন বিষয়ে আলোচনা হবে।
প্রধানমন্ত্রীর এ সফরে জাপান সরকার ও দেশটির আন্তর্জাতিক সহযোগিতা সংস্থা জাইকার কাছ থেকে প্রায় ৬ বিলিয়ন ডলারের বিনিয়োগ ও আর্থিক সহযোগিতা প্রত্যাশা করছে বাংলাদেশ। মাতারবাড়ী সমুদ্রবন্দর, মহেশখালী-মাতারবাড়ী সমন্বিত অবকাঠামো উন্নয়ন উদ্যোগ (এমআইডিআই), বে অব বেঙ্গল ইন্ডাস্ট্রিয়াল গ্রোথ বেল্ট (বিগ-বি) ২.০, জ্বালানি, সবুজ রূপান্তর, জলবায়ু সহনশীল অবকাঠামো, উৎপাদন শিল্প ও ইলেকট্রনিক খাতে সহযোগিতা চাওয়া হবে। তবে এবার নতুন বড় প্রকল্পে ঋণ সহায়তার চেয়ে সরাসরি বিদেশী বিনিয়োগ (এফডিআই), উৎপাদন শিল্প গড়ে তোলা, প্রযুক্তি হস্তান্তর এবং দীর্ঘমেয়াদি সরকারি-বেসরকারি অংশীদারত্বে বেশি গুরুত্ব দিচ্ছে বাংলাদেশ। এছাড়া সফরে তিন-চারটি সমঝোতা স্মারক সই হবে বলে আশা করা হচ্ছে।
প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয় সূত্রে পাওয়া সফরসূচি অনুযায়ী, প্রধানমন্ত্রী আজ সকালে টোকিওর নারিতা আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে পৌঁছবেন। সন্ধ্যায় নিপ্পন ফাউন্ডেশন ও সাসাকাওয়া পিস ফাউন্ডেশনের সম্মানসূচক চেয়ারম্যান ইয়োহেই সাসাকাওয়ার আয়োজিত নৈশভোজে অংশ নেবেন তিনি। আগামীকাল জাপানের প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ে দুই নেতার বৈঠক ও মধ্যাহ্নভোজের কর্মসূচি রয়েছে। এদিন চিবা প্রিফেকচারে জেরার স্থলভিত্তিক এলএনজি টার্মিনাল ও বিদ্যুৎ কেন্দ্র এবং ইচিকাওয়া শহরে নিটসু লজিস্টিকস হাব পরিদর্শন করবেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান।
সফরে ইপিএ কার্যকরের অগ্রগতি, জাপানের বাজারে বাংলাদেশী পণ্যের প্রবেশাধিকার সম্প্রসারণ এবং দুই দেশের ব্যবসায়িক সংযোগ জোরদারের উদ্যোগ গুরুত্ব পাবে বলে কূটনৈতিক সূত্র জানিয়েছে।
অর্থনৈতিক সম্পর্ক বিভাগ (ইআরডি) সূত্রে জানা গেছে, চলমান প্রকল্পের অগ্রগতি ত্বরান্বিত এবং নতুন সহযোগিতার ক্ষেত্র চিহ্নিত করার পাশাপাশি মাতারবাড়ী সমুদ্রবন্দর, মহেশখালী অর্থনৈতিক অঞ্চল, লজিস্টিকস ও যোগাযোগ অবকাঠামোয় জাপানের সহযোগিতা বাড়ানোর বিষয়ে আলোচনা হতে পারে।
ইআরডির কর্মকর্তাদের তথ্যমতে, অবকাঠামো খাতে ৩ বিলিয়ন ডলারের বেশি বিনিয়োগ ও সহযোগিতা প্রত্যাশা করছে বাংলাদেশ। জ্বালানি, সবুজ রূপান্তর, জলবায়ু সহনশীলতা, উৎপাদন শিল্প ও ইলেকট্রনিকসহ অন্যান্য খাতে প্রত্যাশা ২ দশমিক ৫ থেকে ৩ বিলিয়ন ডলার। বিগ-বি ২.০ কাঠামোর আওতায় সহযোগিতা সম্প্রসারণ নিয়েও আলোচনা হতে পারে। মাতারবাড়ী বন্দর ঘিরে লজিস্টিকস, যোগাযোগ ব্যবস্থা ও মহেশখালী অর্থনৈতিক অঞ্চলের উন্নয়নে অর্থায়ন বাড়ানোর বিষয় আলোচনায় আসতে পারে। কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎ কেন্দ্রেও অর্থায়ন বাড়ানোর প্রত্যাশা রয়েছে।
জাপানি কোম্পানি টয়োটা, ইউনিক্লো ও সনির মতো প্রতিষ্ঠানকে বাংলাদেশে বিনিয়োগে আগ্রহী করা, উৎপাদন শিল্প গড়ে তোলা এবং প্রযুক্তি ও কারিগরি দক্ষতা কাজে লাগানোর বিষয়েও গুরুত্ব দিচ্ছে সরকার। ইআরডির এক কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে বণিক বার্তাকে বলেন, ‘আমাদের সঙ্গে তাদের (জাপানের) দীর্ঘদিনের সম্পর্কের ভিত্তিতে অনেক আগে থেকে বিভিন্ন খাতে তারা ঋণ দিয়েছে, সহায়তা করেছে। মেট্রো, বন্দরের মতো বড় প্রকল্পেও অর্থায়ন করেছে। এবার নতুন করে বড় কোনো প্রকল্প নেই। তবে একটি অংশীদারত্বমূলক সম্পর্ক গড়ে তোলা, দুই দেশের বাণিজ্য সহজ করা ও বিনিয়োগের জন্য প্রধানমন্ত্রীর সফরটি গুরুত্ব বহন করছে।’
ইআরডি সচিব মো. শাহরিয়ার কাদের ছিদ্দিকী বণিক বার্তাকে বলেন, ‘সফরে বিভিন্ন বিষয়ে বাংলাদেশ-জাপান সরকারের বৈঠক হবে, আলোচনা হবে। কী কী নিয়ে আলোচনা হবে, সেটা এখনই বলা যাচ্ছে না। প্রধানমন্ত্রীর সফরের বিষয়গুলো মূলত পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় চূড়ান্ত করে। আমরা শুধু প্রয়োজনীয় তথ্য-উপাত্ত তৈরি করি। সফরের পর যৌথ বিবৃতিতে বিস্তারিত জানা যাবে।’
আগামী ২৮ অক্টোবর বিকালে টোকিওতে জাপান এক্সটার্নাল ট্রেড অর্গানাইজেশনের (জেট্রো) আয়োজনে জাপান-বাংলাদেশ অর্থনৈতিক ফোরামে অংশ নেবেন প্রধানমন্ত্রী। সফরে তার সঙ্গে জাপান-বাংলাদেশ পার্লামেন্টারি ফ্রেন্ডশিপ লিগ, জাপান-বাংলাদেশ কমিটি ফর কমার্শিয়াল অ্যান্ড ইকোনমিক কো-অপারেশনের চেয়ারম্যান, জাপান আন্তর্জাতিক সহযোগিতা সংস্থার (জাইকা) প্রেসিডেন্ট এবং জাপান ব্যাংক ফর ইন্টারন্যাশনাল কো-অপারেশনের গভর্নরের বৈঠকের কর্মসূচি রয়েছে।
প্রধানমন্ত্রীর সফরসঙ্গীদের মধ্যে রয়েছেন তার সহধর্মিণী ডা. জুবাইদা রহমান, অর্থ ও পরিকল্পনামন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী, অর্থ ও পরিকল্পনা মন্ত্রণালয়ের উপদেষ্টা ড. রাশেদ আল মাহমুদ তিতুমীর, পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী হুমায়ুন কবির, বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ প্রতিমন্ত্রী অনিন্দ্য ইসলাম অমিত, বেসামরিক বিমান পরিবহন ও পর্যটনমন্ত্রী এম রশিদুজ্জামান মিল্লাত এবং ডাক, টেলিযোগাযোগ ও তথ্যপ্রযুক্তি এবং বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি মন্ত্রণালয়ের উপদেষ্টা রেহান আসিফ আসাদ।
সফরসঙ্গীদের মধ্যে আরো রয়েছেন ইনভেস্ট বাংলাদেশ অথরিটির চেয়ারম্যান চৌধুরী আশিক মাহমুদ বিন হারুন এবং এশিয়া-প্যাসিফিক অঞ্চলে বৈদেশিক কর্মসংস্থানবিষয়ক প্রধানমন্ত্রীর বিশেষ সহকারী ড. এমডি শাকিরুল ইসলাম খান। প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের প্রতিনিধিদের মধ্যে রয়েছেন অতিরিক্ত প্রেস সচিব আতিকুর রহমান রুমন, ব্যক্তিগত সচিব-২ মো. মেহেদুল ইসলাম, ব্যক্তিগত সচিব-১ মিয়া মোহাম্মদ আশরাফ রেজা ফরিদী, সহকারী সামরিক সচিব লেফটেন্যান্ট কর্নেল মো. জুনুন নাহিদ, প্রটোকল কর্মকর্তা-২ কামরুল ইসলাম, গবেষণা কর্মকর্তা মো. আবদুস সাত্তার পাটোয়ারী এবং সহকারী ব্যক্তিগত চিকিৎসক ডা. এএনএম মনোয়ারুল কাদির।
জেট্রো বাংলাদেশ প্রধান ও জাপান বাংলাদেশ চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রির (জেবিসিসিআই) সভাপতি কাজুইকি কাতাওকা বণিক বার্তাকে বলেন, ‘প্রধানমন্ত্রীর এ সফরকে শুধু জাপানি ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানগুলোর বিনিয়োগের অঙ্গীকারকে স্বাগত জানানোর উপলক্ষ হিসেবে নয়, বরং বাংলাদেশের ব্যবসা পরিবেশের উন্নয়ন এগিয়ে নেয়ার সুযোগ হিসেবেও কাজে লাগানো উচিত।’
কাতাওকার বক্তব্য অনুযায়ী, জেট্রোর আয়োজনে ব্যবসায়িক বৈঠক ও অর্থনৈতিক ফোরামে জাপানি কোম্পানিগুলো সমঝোতা স্মারক (এমওইউ) ও করপোরেট সংবাদ বিজ্ঞপ্তি প্রকাশের মাধ্যমে বাংলাদেশে তাদের বিনিয়োগের অঙ্গীকার পুনর্ব্যক্ত বা জোরদার করবে। জাপানের প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে বৈঠকেও বাংলাদেশে জাপানি বেসরকারি খাতের বিনিয়োগ এবং কর্মসংস্থান সৃষ্টিতে কোম্পানিগুলোর অবদান নিয়ে আলোচনা হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। এ সফর বাংলাদেশের বাজারে আগ্রহী নতুন জাপানি ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানকে আকৃষ্ট করারও সুযোগ তৈরি করবে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
সফরের শেষ দিন ২৯ অক্টোবর নাগোয়ার টয়োটা মোটোমাচি কারখানা পরিদর্শন করবেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। এরপর টয়োটার আয়োজিত মধ্যাহ্নভোজে অংশ নেবেন তিনি। পরে টয়োটা স্মারক শিল্প ও প্রযুক্তি জাদুঘর পরিদর্শনের কর্মসূচি রয়েছে তার। ওইদিন সন্ধ্যায় নারিতা আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর থেকে তার জাপান ত্যাগের কথা রয়েছে। ঢাকায় কূটনৈতিক ও সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো জানিয়েছে, বাংলাদেশে টয়োটার কারখানা স্থাপনের আগ্রহ বাস্তবায়নের বিষয়েও আলোচনা হবে।
দ্বিপক্ষীয় সম্পর্কের বাইরে আঞ্চলিক ও আন্তর্জাতিক শান্তি ও স্থিতিশীলতা, বাংলাদেশে আশ্রিত রোহিঙ্গাদের সমস্যার টেকসই ও শান্তিপূর্ণ সমাধান এবং জ্বালানি সংকট মোকাবেলায় পারস্পরিক সহযোগিতা জোরদারের বিষয়ে দুই পক্ষের আলোচনা হওয়ার কথা রয়েছে। বাংলাদেশের প্রত্যাশা, সফরের মধ্য দিয়ে নতুন বেসরকারি বিনিয়োগের সুযোগ সৃষ্টি, চলমান প্রকল্পের বাস্তবায়ন ত্বরান্বিত এবং বাণিজ্যিক অংশীদারত্ব ও উন্নয়ন সহযোগিতা সম্প্রসারিত হবে।










