বাংলাদেশ পরিবেশ অধিদপ্তর আইন অনুযায়ী বিভিন্ন কলকারখানা থেকে নির্গত রাসায়নিকযুক্ত তরল বর্জ্য সরাসরি পরিবেশে নিক্ষেপ করা যায় না। এসব তরল শোধনাগার বা ইটিপির মাধ্যমে পরিশোধনের পর পুনরায় ব্যবহার করতে বা ফেলে দিতে হবে। কিন্তু দেশের অনেক কারখানায়ই ইটিপি নেই। আবার যেগুলোয় আছে, খরচের ভয়ে সেগুলোও চালানো হয় না। বিভিন্ন গবেষণায় রাজধানীসহ দেশের গুরুত্বপূর্ণ নদ-নদী দূষণের অন্যতম কারণ হিসেবে চিহ্নিত হয়েছে টেক্সটাইল কারখানাগুলো। দেখা গেছে, রাতের বেলা বেশির ভাগ কারখানাই অপরিশোধিত তরল বর্জ্য সরাসরি নদীতে ফেলে, যা নদী দূষিত তো করেই, বিষাক্ত করে নদীর মাছ ও আশপাশের অঞ্চলের উৎপাদিত ফসলও। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, বিদ্যমান পরিবেশ সংরক্ষণ বিধিমালার বেশকিছু অস্পষ্টতার কারণে এসব কার্যক্রমের বিরুদ্ধে যথাযথ ব্যবস্থাও নেয়া যাচ্ছে না।
বিদ্যমান পরিবেশ বিধিমালা বিশ্লেষণ করে দেখা গেছে, আগে যেসব কার্যক্রম পরিবেশের জন্য কম ঝুঁকিপূর্ণ হিসেবে বিবেচিত ছিল, এখন সেগুলো অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে উঠছে। এমন পরিস্থিতিতে পরিবেশ বিধিমালা ১৯৯৭ সংশোধন করার প্রক্রিয়া শুরু হয়। খসড়া চূড়ান্ত শেষে পরিবেশ বিধিমালা ২০২১ এখন পাসের অপেক্ষায়। নতুন বিধিমালায় সবচেয়ে বড় যে পরিবর্তন তা হলো টেক্সটাইল খাত ও অবকাঠামো নির্মাণযজ্ঞকে কমলা-খ থেকে লাল তালিকায় নেয়া হয়েছে।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, বিশ্বের সব দেশেই এ দুটি খাত পরিবেশের জন্য অত্যন্ত ঝুঁকির তালিকায় থাকলেও এতদিন বাংলাদেশে কম ঝুঁকিপূর্ণ হিসেবে দেখা হয়েছিল। সংশোধিত আইন পাস হলে পরিবেশ সংরক্ষণের অনেক বাধা কেটে যাবে বলেও প্রত্যাশা তাদের।
খসড়া বিধিমালা ২০২১-এ ভাষাগত একটি পার্থক্যও দেখা গেছে। ১৯৯৭ সালের বিধিমালায় সবুজ, কমলা-ক, কমলা-খ ও লাল শ্রেণীতে ছাড়পত্র দেয়া হতো। নতুন বিধিমালায় কমলা-ক-এর পরিবর্তে হলুদ শব্দটি ব্যবহার করা হয়েছে। শুধু যে ভাষাগত পরিবর্তন এসেছে তা নয়, শিল্পের শ্রেণীভেদ ও ছাড়পত্র পাওয়ার শর্তের ক্ষেত্রেও পরিবর্তন লক্ষ করা গেছে।
পরিবেশ সংরক্ষণ নীতিমালা ১৯৯৭ অনুযায়ী কাপড় রঙ করাসহ রাসায়নিক প্রক্রিয়াটি লাল তালিকায় ছিল। অন্যদিকে ওয়াশিং ছিল কমলা-খ তালিকায়। আবার ১০০ মিটারের নিচে রাস্তা নির্মাণ, পুনর্নির্মাণ, সম্প্রসারণ (ফিডার রোড, স্থানীয় রাস্তা) এবং সেতু নির্মাণ, পুনর্নির্মাণ, সম্প্রসারণের বিষয়টিও ছিল এ তালিকায়। পরিবেশ সংরক্ষণ বিধিমালা ২০২১-এর খসড়ায় বলা হয়েছে, বস্ত্র ও অবকাঠামো নির্মাণের এ দুটো ব্যাপারে পরিবেশ অধিদপ্তরের ছাড়পত্র পেতে হলে সংস্থাটির লাল তালিকায় বর্ণিত শর্তগুলো মেনে চলতে হবে।
নতুন এ খসড়ায় লাল তালিকায় রয়েছে টেক্সটাইল খাতের সমন্বিত প্রাকৃতিক ও সিনথেটিক টেক্সটাইল মিলস (স্পিনিং, উইভিং, ডায়িং ও ফিনিশিং), টেক্সটাইল ডায়িং ইউনিট (দৈনিক ২৫ টনের বেশি) এবং ওয়াশিং ইউনিট (প্রতিদিন ২৫ টনের বেশি)। অবকাঠামো উন্নয়নের ক্ষেত্রে রাস্তা, সেতু, রেললাইন, বিমানবন্দর ও ফ্লাইওভার নির্মাণের বিষয়টি আলাদাভাবে উল্লেখ করা হয়েছে। খসড়ায় দেখা গেছে, ৫০ কিলোমিটারের বেশি রাস্তা, ৫০০ মিটারের বেশি সেতু, রেললাইন স্থাপন, ম্যাস র্যাপিড ট্রানজিট সিস্টেম ও ফ্লাইওভার বা এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়ে নির্মাণযজ্ঞের ক্ষেত্রে পরিবেশ অধিদপ্তরের লাল তালিকার শর্ত পূরণ করে ছাড়পত্র পেতে হবে।
লাল তালিকায় অন্তর্ভুক্ত নতুন শিল্প খাতগুলোর বিষয়ে সংস্থাটির একজন ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা বণিক বার্তাকে বলেন, টেক্সটাইলের মাধ্যমে ব্যাপক হারে নদীদূষণ হয়। কিন্তু পরিবেশ অধিদপ্তর এটি সুষ্ঠুভাবে নজরদারি করতে পারছে না। তাই ক্ষতি বিবেচনায় এটি লাল তালিকায় রাখা হয়েছে। একইভাবে নতুন করে রাস্তা, সেতু ও রেললাইন নির্মাণ করতে গেলে জীববৈচিত্র্য ও চারপাশের পরিবেশ মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়। এসব যৌক্তিকতা বিবেচনা করে যথেষ্ট যাচাই-বাছাই শেষে এসব সিদ্ধান্ত নেয়া হয়েছে।
পরিবেশ সংরক্ষণ বিধিমালার খসড়াটিতে লাল তালিকায় অনেক বিষয় যেমন নতুন করে স্থান পেয়েছে, একইভাবে অনেক বিষয় লাল তালিকা থেকে সরে কমলা তালিকায় ঢুকেছে। ১৯৯৭ সালের পরিবেশ সংরক্ষণ বিধিমালায় হাসপাতাল, জীবনরক্ষাকারী ওষুধ ও জাহাজ ভাঙার মতো উচ্চঝুঁকিপূর্ণ শিল্পগুলো ছিল লাল তালিকায়। কিন্তু নতুন বিধিমালায় এগুলোকে কমলা শ্রেণীতে রাখা হয়েছে। এছাড়া নতুন খসড়ায় অনেক শিল্পকে অন্তর্ভুক্ত করার পাশাপাশি বিদ্যমান বিধিমালার বেশকিছু বিষয়কে স্পষ্ট করা হয়েছে। বিদ্যমান বিধিমালায় কমলা-খতে মোট শিল্প অন্তর্ভুক্ত ছিল ৬৯টি। খসড়া বিধিমালায় কমলা শ্রেণীতে ১১৩টি শিল্পকে তালিকাভুক্ত করা হয়েছে।
এ প্রসঙ্গে ওই কর্মকর্তা বলেন, ব্যবসা সহজীকরণের লক্ষ্যে এগুলো আমরা কমলা তালিকায় রেখেছি। যেমন জাহাজ ভাঙা শিল্প বিদ্যমান আইনে লাল তালিকায় আছে। কিন্তু এটি আমরা কমলা শ্রেণীতে রেখেছি। কারণ জাহাজ ভাঙার মাধ্যমে পরিবেশ দূষণ হলেও সেটা শিল্প-কারখানার মতো লোকালয়ে পরিবেশ দূষণ করছে না। তাই তাদের ছাড়পত্রের বিষয়টি কেন্দ্রীয় অফিসের বদলে বিভাগীয় অফিস থেকে তদারক করা যৌক্তিক বলে আমরা মনে করেছি।
তবে জাহাজ ভাঙা শিল্পের শ্রেণীবদলকে অযৌক্তিক বলে মনে করছেন বাংলাদেশ পরিবেশ আইনবিদ সমিতির (বেলা) প্রধান নির্বাহী সৈয়দা রিজওয়ানা হাসান। তিনি বণিক বার্তাকে বলেন, এ খাতকে যে কারণ দেখিয়ে লাল থেকে কমলা তালিকায় নামানো হয়েছে, সেটি যথাযথ যুক্তিসম্পন্ন নয়। তাছাড়া দীর্ঘদিন ধরেই পৃথিবীর সব দেশে টেক্সটাইল ও অবকাঠামো উন্নয়ন পরিবেশ দূষণের দিক থেকে লাল তালিকায় রয়েছে। বাংলাদেশে কেন এটি এতদিন লাল তালিকায় আসেনি সেটিই আশ্চর্যের।
এসবের পাশাপাশি নতুন বিধিমালায় ছাড়পত্র পাওয়ার পদ্ধতিও সহজ করা হচ্ছে। নতুন নিয়ম অনুযায়ী, কেউ ছাড়পত্রের জন্য আবেদন করলে সেটি সর্বোচ্চ সাত কার্যদিবসের মধ্যে অনুমোদন করতে হবে। তা করা না গেলে ফিরিয়ে দেয়ার কারণও উল্লেখ করতে হবে। এতে ফাইল আটকে রাখার ঘটনার আর সুযোগ থাকবে না বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।










