বিশ্ববাজারে অব্যাহত দরপতন ও দেশব্যাপী সমালোচনার মুখে ১৭ জুলাই ভোজ্যতেলের দাম সমন্বয় করা হয়। ১৮ জুলাই থেকে নতুন দাম কার্যকরের ঘোষণা দেয়া হলেও তা বাস্তবায়ন করেনি কোম্পানিগুলো। আগের মজুদ শেষ করতে পুরনো দামের ভোজ্যতেল বাজার থেকে সরিয়েও নেয়নি মোড়কজাত কোম্পানিগুলো। এর বিপরীতে বাড়তি দামের ভোজ্যতেলে মূল্যছাড় দিয়ে ডিলার ও ব্যবসায়ীদের বিক্রি করার সুযোগ দিচ্ছে তারা। এদিকে মোড়কে দাম পরিবর্তন না হওয়ায় ব্যবসায়ীরা লাভবান হলেও ঠকছেন সাধারণ ভোক্তারা।
পাইকারি ও খুচরা বাজারে খোঁজ নিয়ে জানা গিয়েছে, ভোজ্যতেলের দাম দেশে প্রায় এক মাস পরপর সংশোধন হবে এমন ধারণায় বাজারে আগের দামের বিপুল পরিমাণ ভোজ্যতেল মজুদ থেকে গিয়েছে। ১৮ জুলাই থেকে নতুন দাম কার্যকর করার কথা থাকলেও দেশের বিভিন্ন পাইকারি ও খুচরা বাজারে এ দামে ভোজ্যতেল পাওয়া যাচ্ছে না। ব্যবসায়ীরা বলছেন, আগের স্টক শেষ করতে বিক্রি হওয়া ভোজ্যতেলের ওপর দাম কমিয়ে দেয়া হচ্ছে। কিন্তু মোড়কের দামের পরিবর্তন না হওয়ায় আগের দামেই ভোজ্যতেল বিক্রি করছেন খুচরা বিক্রেতারা।
এদিকে গত কয়েক দিনেও বিশ্ববাজারে ভোজ্যতেলের দাম কমেছে। এরই মধ্যে সবচেয়ে বেশি পাম অয়েলের দাম কমে গিয়েছে। শিকাগো বোর্ড অব ট্রেডের তথ্য বলছে, অপরিশোধিত পাম অয়েল ১২ জুলাই ৯৫১ ডলারে লেনদেন হলেও ২০ জুলাই বুকিং কমে লেনদেনের সমাপনী দর ঠেকেছে ৮৮৮ ডলারে। এরপর গতকাল ২২ জুলাই পাম অয়েলের টনপ্রতি বুকিং দর স্থির হয় ৮৮১ ডলারে। অর্থাৎ নয়দিনের ব্যবধানে আগস্টে সরবরাহযোগ্য পাম অয়েলের বুকিং দর কমেছে ৭০ ডলার। অন্যদিকে ১২ জুলাই অপরিশোধিত সয়াবিনের দাম ছিল ১ হাজার ৪৩৭ ডলার। ২০ জুলাই দাম আরো কমে নেমে এসেছে ১ হাজার ৩৬৪ ডলারে এবং ২২ জুলাই দাম নেমে ১ হাজার ২৯১ ডলারে স্থির হয়। অর্থাৎ একই সময়ে সয়াবিনের দাম কমেছে ১৪৬ ডলার। নতুন মৌসুমে বিভিন্ন দেশের বাড়তি উৎপাদনের পূর্বাভাস ও রফতানিকারক দেশে মজুদ বাড়তে থাকায় বিশ্বব্যাপী ভোজ্যতেলের দাম আরো কমে যাওয়ার আশঙ্কা করছে কমোডিটি খাতের একাধিক এক্সচেঞ্জও।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক বাংলাদেশ এডিবল অয়েল লিমিটেডের রূপচাঁদা ব্র্যান্ডের চট্টগ্রামের ডিলার প্রতিষ্ঠানের ঊর্ধ্বতন এক কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে বণিক বার্তাকে বলেন, নতুন দামের ভোজ্যতেল আসার আগেই আগের মজুদ শেষ করতে চাইছে কোম্পানি কর্তৃপক্ষ। পুরনো দামের ভোজ্যতেল খুচরা বিক্রেতারা সংগ্রহ করতে অনীহা প্রকাশ করায় বর্তমান সংশোধিত দামের সঙ্গে সমন্বয় করে দেয়া হচ্ছে। ডিলারদেরও আগের কেনা মূল্যের ওপর ছাড় দেয়া হয়েছে। পুরনো ভোজ্যতেলের মজুদ শেষ হলে নতুন দামের ভোজ্যতেল মিলগেট থেকে বাজারে সরবরাহ করা হবে।
এদিকে ভোজ্যতেলের দাম কমানো হলেও তা যৌক্তিক নয় বলে দাবি করেছেন ভোজ্যতেল-সংশ্লিষ্ট ব্যবসায়ীরা। ভারতসহ বিভিন্ন দেশে নিয়মিত দাম সমন্বয়ের পাশাপাশি রেকর্ড পরিমাণ কমানো হয়েছে। কিন্তু বাংলাদেশে দুই দফায় সয়াবিনের দাম লিটারপ্রতি ৪৫ টাকা বাড়ানো হলেও দাম কমানোর ক্ষেত্রে ধীর নীতিতে রয়েছে কোম্পানিগুলো।
চট্টগ্রামের চান্দগাঁও এলাকার মেসার্স মালতী এন্টারপ্রাইজের স্বত্বাধিকারী সঞ্জয় দেবনাথ বণিক বার্তাকে বলেন, দাম কমানোর আগে বিভিন্ন কোম্পানির বোতলজাত সয়াবিনের অর্ডার ছিল আমাদের। কিন্তু ১৭ জুলাইয়ের পর আমাদের প্রতিষ্ঠানের পক্ষ থেকে কার্যাদেশ বাতিল করা হলে আগের মোড়কে সরবরাহ করা ভোজ্যতেল বর্তমান দামে বিক্রি করছে ডিলার প্রতিনিধিরা। আমরা বর্তমান দামের সঙ্গে সমন্বয় করে সয়াবিন বিক্রি করছি।
বাজার বিশ্লেষণে দেখা গিয়েছে, চলতি বছরের মার্চে বিশ্ববাজারে অপরিশোধিত পাম অয়েলের সর্বোচ্চ দাম ওঠে ১ হাজার ৭৭৭ ডলারে। অন্যদিকে সয়াবিনের ইতিহাসের রেকর্ড দাম ওঠে মে মাসে। মার্চে দাম ১ হাজার ৯৫৭ ডলার, এপ্রিলে ১ হাজার ৯৪৮ ও মে মাসে দাম উঠে যায় ১ হাজার ৯৬৩ ডলারে। এরই পরিপ্রেক্ষিতে দেশে দফায় দফায় বাড়িয়ে বোতলজাত সয়াবিনের দাম ২০৫ টাকায় নির্ধারণ করে মিল মালিকদের অ্যাসোসিয়েশন ও সরকার। তবে দুই মাস ধরে বিশ্ববাজারে ভোজ্যতেলের দাম টানা কমতে থাকলে সয়াবিনের দাম লিটারপ্রতি ১৪ টাকা কমিয়ে ১৮৫ টাকা নির্ধারণ করা হয়। অন্যদিকে পাম অয়েলের লিটারপ্রতি দাম ৬ টাকা কমিয়ে করা হয় ১৫৬ টাকা।
এদিকে নতুন দামের বোতলজাত ভোজ্যতেল বাজারে সরবরাহ না করলেও পাইকারি বাজারে খোলা সয়াবিন, পাম অয়েল ও সুপার পাম অয়েলের দাম কমে গিয়েছে অস্বাভাবিক পরিমাণ। পাইকারি বাজারগুলোতে অন্তত ১৫ দিন আগের কেনা ভোজ্যতেলের এসও (সরবরাহ আদেশ) থাকায় দাম সমন্বয়ের পর বিক্রয় চাপ বেড়েছে। যার কারণে অনেকে আগের বাড়তি দামে কেনা ভোজ্যতেল বিক্রি করতে কিংবা মিলগেট থেকে ভোজ্যতেল সংগ্রহ করতে চাইছেন না ট্রেডিং প্রতিষ্ঠান কিংবা পাইকারি ব্যবসায়ীরা।
পাইকারি বাজারে খোঁজ নিয়ে জানা গিয়েছে, মণপ্রতি (৩৭ দশমিক ৩২ কেজি) সয়াবিন বিক্রি হয়েছে ৬ হাজার ৭০০ টাকায়। যদিও পাইকারিতে খোলা সয়াবিন বিক্রি হয়েছে ৭ হাজার (সরাসরি মিল থেকে সংগ্রহযোগ্য) টাকায়। অন্যদিকে পাম অয়েলের দাম মণপ্রতি কমে ৪ হাজার ৫০০ টাকায় নেমে এসেছে। পাইকারিতে পাম অয়েল বিক্রি হচ্ছে মণ ৫ হাজার টাকায়। একইভাবে পাইকারি পর্যায়ে সুপার পাম অয়েলের দাম নেমে এসেছে ৫ হাজার ৫০০ টাকায়। বিশ্ববাজারে ভোজ্যতেলের বুকিং দর ও দেশীয় বাজার কমতে থাকায় এসও বেচাকেনা অনেক কমেছে। লোকসান এড়াতে ব্যবসায়ীদের মধ্যে এসও বিক্রয় চাপ থাকায় আমদানিকারক প্রতিষ্ঠানগুলোর পক্ষ থেকে নতুন এসও সরবরাহও কমিয়ে দেয়া হয়েছে।
এ বিষয়ে জানতে যোগাযোগ করা হলে সিটিগ্রুপের উপমহাব্যবস্থাপক (বিপণন) প্রদীপ কারন বণিক বার্তাকে বলেন, সরকারিভাবে সমন্বয়ের আগেই খোলা ভোজ্যতেলের দাম সমন্বয় হয়ে গেছে। সরকারি দামের চেয়েও কমে খোলা সয়াবিন, পাম অয়েল কিংবা সুপার পাম অয়েল বিক্রি করা হচ্ছে। এর পরও মিলগেটে ক্রেতাপ্রতিষ্ঠানের গাড়ি পাওয়া যাচ্ছে না। আগে চট্টগ্রামের মিলগেটে প্রতিদিন ১৮০-২০০ ট্রাক ভোজ্যতেল সরবরাহ করা হলেও বর্তমানে এক-চতুর্থাংশ সরবরাহ করা হচ্ছে। সর্বশেষ মঙ্গলবার মাত্র ৪৭ ট্রাক ভোজ্যতেল সংগ্রহ করেছে ক্রেতাপ্রতিষ্ঠানগুলো। দাম কমে যাওয়ায় আগের কেনা ভোজ্যতেল সংগ্রহ করতে অনীহা প্রকাশ করছেন ট্রেডিং প্রতিষ্ঠান ও পাইকারি ব্যবসায়ীরা।










