আবার আসিব ফিরে ধানসিঁড়িটির তীরে—এই বাংলায় হয়তো মানুষ নয়— হয়তো বা শঙ্খচিল শালিকের বেশে। রূপসী বাংলার কবি জীবনানন্দ দাশ এক সময়ের প্রমত্তা ধানসিঁড়ি নদীর তীরে ভিন্ন রূপে বারবার ফিরে আসার সংকল্প করেছিলেন। কিন্তু সেই ধানসিঁড়িটিকে আজ মরা খালে রূপান্তর করা হয়েছে। বারবার এ নদী খননের নামে কোটি কোটি টাকা লোপাট হচ্ছে। তবু ফিরে পায়নি এ নদী তার যৌবনের খরস্রোতা রূপ। সম্প্রতি ঝালকাঠির এ ঐতিহ্যবাহী ধানসিঁড়ি নদী পুনঃখননে অনিয়ম-দুর্নীতির অভিযোগ উঠেছে।

১৯১০ সালের সিএস নকশা অনুযায়ী, ৩৬০ দাগে রাজাপুরের বাঘরী অংশে এ নদীর মোহনার প্রশস্ততা ছিল ৫৬৭ ফুট। তখন এ নদীতে বড় বড় জাহাজ চলত। ধানসিঁড়ির মোহনায় তখন ছিল দক্ষিণবঙ্গের সবচেয়ে বড় বন্দর। এখানে কলকাতা থেকে সরাসরি জাহাজ এসে ভিড়ত। এর পর ১৯৪৭ সালে দেশ ভাগের পর ১৯৫০ সালে পাকিস্তান সরকারের জরিপে ১নং দাগে ধানসিঁড়ি নদীর মোহনার প্রশস্ততা পাওয়া যায় ২০০ ফুট। এ জরিপের নকশা ২০২২ সালে এখনো চলমান। অথচ ২০০ ফুট প্রশস্ত এ নদীর বর্তমানে অস্তিত্ব নেই বললেই চলে।

ঝালকাঠি পানি উন্নয়ন বোর্ডের তথ্য মতে জানা যায়, প্রধানমন্ত্রীর ডেল্টা প্লান অনুযায়ী ৬৪ জেলার অভ্যন্তরে ছোট নদী, খাল খনন প্রকল্পের আওতায় রূপসী বাংলার কবি জীবনানন্দ দাশের প্রিয় ঝালকাঠি জেলার ধানসিঁড়ি নদীটি ২০১৮-১৯ অর্থবছরে দুই বছর মেয়াদে দুই কিস্তিতে সাড়ে আট কিলোমিটার পুনঃখননের জন্য প্রায় ৪ কোটি ৪৯ লাখ ৩৮ হাজার টাকা বরাদ্দ দেয়া হয়। 

দীর্ঘ ১০ কিলোমিটার দৈর্ঘ্যের ঐতিহ্যবাহী নদীটি ঝালকাঠি সদর উপজেলার গাবখান নদীর মোহনা থেকে দেড় কিলোমিটার বাদ দিয়ে রাজাপুর উপজেলার বাঘরি বাজারের জাঙ্গালিয়া নদীর মোহনা পর্যন্ত মোট সাড়ে আট কিলোমিটার খনন শুরু হয়। প্রকল্পের কার্যাদেশে নদীর ওপরে প্রস্থ ৮০ ফুট, সমতল থেকে নদীর গভীরতা ১৫ ফুট ও নদীর তলদেশে প্রস্থ মাত্র ২০ ফুট করা হয়। কার্যাদেশে আরো উল্লেখ করা হয়, নদীর তলদেশ থেকে মাটি কেটে পাড় থেকে দূরে সরিয়ে নিতে হবে। কিন্তু খননকাজে পানি উন্নয়ন বোর্ডের সঠিক তদারক না থাকায় নদী খননে বাস্তবে এর সঙ্গে মিল না রেখে ঠিকাদার কাজ শেষ করেন। নদী খননকালেই ব্যাপক দুর্নীতির অভিযোগ করেছিলেন স্থানীয়রা।

পরবর্তী সময়ে বর্ষা মৌসুমে খনন করে নদীর পাড়ে রাখা মাটি আবার ধানসিঁড়ি নদীতে পড়ে নদীর তলদেশ ভরাট হয়ে যায়। ২০২১-২২ অর্থবছরে ধানসিঁড়ি খননের জন্য পুনরায় পানি উন্নয়ন বোর্ডে প্রস্তাব পাঠালে নতুন করে নদীর তলদেশ খননের জন্য ১ কোটি ৯৯ লাখ টাকা বরাদ্দ আসে। এবার কাজ পান পটুয়াখালীর ঠিকাদার আবুল কালাম আজাদ। তিনি দুই-তিন সপ্তাহ আগে ধানসিঁড়ি নদীর তলদেশ খননকাজ শুরু করেছেন।

সরেজমিনে গিয়ে দেখা যায়, সঠিকভাবে খননের অভাবে ধানসিঁড়ি নদীতে পানির প্রবাহ না নেই। ফলে দুই পাড়ে কয়েক হাজার হেক্টর জমি অনাবাদী পড়ে আছে। পানির অভাবে শুকনো মৌসুমে কৃষক জমিতে চাষাবাদ করতে পারছেন না, তেমনি বর্ষা মৌসুমেও জমিতে আটকে পড়া পানি নিষ্কাশনের ব্যবস্থা না থাকায় আমন ও ইরি ধান চাষে বিঘ্ন ঘটছে।

স্থানীয়দের অভিযোগ, দুই বছর আগেও যে নদীর প্রশস্ততা ৮০ ফুট রেখে খনন করা হয়েছিল, বর্তমানে সেই নদীর প্রশস্ততা এবার খননে ৪৯-৫৫ ফুট রাখা হয়েছে, যা একটি খালের সমান। এবারো তলদেশের মাটি উঠিয়ে নদীর পাড়ে ফেলে প্রশস্ততা কমিয়ে ফেলা হয়েছে। স্থানীয়রা বলেন, আমরা লোকদেখানো এ খনন চাই না। এসএ নকশা অনুযায়ী এ নদীর খনন চাই আমরা।

স্থানীয় রফিক হাওলাদার বলেন, নদীর তলদেশ খনন করে মাটি দূরে সরানোর কথা থাকলেও ঠিকাদাররা ইচ্ছা করেই মাটি না সরিয়ে নদীর পাড়ে রাখে, যা বছর ঘুরতে না ঘুরতেই নদীতে পড়ে আবার ভরাট হয়ে যায়। এভাবে বছর বছর টেন্ডারে কোনো কাজ তো হচ্ছেই না, বরং প্রতি বছর কোটি কোটি সরকারি টাকা হাতিয়ে নিচ্ছে একটি চক্র। ২০১০-১১ অর্থবছরেও প্রায় ৮৪ লাখ টাকা ব্যয়ে ধানসিঁড়ি নদীটি খনন করা হয়েছিল, যা পরে কোনো কাজে আসেনি। আসলে ধানসিঁড়ি নদীটি এখন সোনার ডিম পাড়া হাঁসে পরিণত হয়েছে।

ঝালকাঠি পানি উন্নয়ন বোর্ডের প্রকৌশলী রাকিব হাসান বলেন, ধানসিঁড়ি নদীর শুধু তলায় চার ফুট খনন করা হচ্ছে। ওপরের প্রশস্ততা এর আগে যেমন ছিল তেমনই থাকবে। খননে ঠিকাদার কিছু কিছু জায়গায় ভুল করেছিলেন। স্থানীয়দের অভিযোগের ভিত্তিতে সেগুলো ঠিক করতে বলা হয়েছে। খননকৃত মাটিগুলো এখন নদীর পাড়ে রাখলেও কাজশেষে মাটিগুলো অন্যত্র সরিয়ে নেয়া হবে।