করোনার ক্ষতি কাটিয়ে উঠতে ২৩টি প্রণোদনা প্যাকেজ ঘোষণা করেছে সরকার, যার আর্থিক মূল্য ১ লাখ ২৮ হাজার ৪৪১ কোটি টাকা। বেজা, বেপজা ও বাংলাদেশ হাই-টেক পার্কে অবস্থিত শতভাগ বিদেশী কিংবা দেশী-বিদেশী যৌথ মালিকানাধীন প্রতিষ্ঠান এ প্যাকেজের আওতায় ঋণ পেয়েছে। তবে এসব অর্থনৈতিক অঞ্চলের বাইরের বিদেশী প্রতিষ্ঠানগুলো এ ঋণ সুবিধা পায়নি। কিন্তু সব প্রতিষ্ঠানকে সমান সুবিধা দেয়ার পক্ষে মত দিয়েছে বাংলাদেশ ব্যাংক। এজন্য অর্থনৈতিক অঞ্চলের বাইরের বিদেশী প্রতিষ্ঠানগুলোকেও এ প্যাকেজের অন্তর্ভুক্ত করার উদ্যোগ নেয়া হয়েছে। এ বিষয়ে অর্থ বিভাগের মতামত জানতে চেয়েছে কেন্দ্রীয় ব্যাংক। সংশ্লিষ্ট সূত্রে এসব তথ্য জানা গেছে।
সম্প্রতি অর্থ বিভাগের সিনিয়র সচিব আব্দুর রউফ তালুকদারের কাছে এ-সংক্রান্ত মতামত চেয়ে একটি চিঠি দিয়েছে বাংলাদেশ ব্যাংক। চিঠিতে বলা হয়, নভেল করোনাভাইরাসের প্রাদুর্ভাবের কারণে প্রধানমন্ত্রী ঘোষিত প্রণোদনা প্যাকেজের আওতায় বাংলাদেশ অর্থনৈতিক অঞ্চল কর্তৃপক্ষ (বেজা), বাংলাদেশ রফতানি প্রক্রিয়াকরণ অঞ্চল কর্তৃপক্ষ (বেপজা) ও বাংলাদেশ হাই-টেক পার্কে অবস্থিত ‘এ’, ‘বি’ ও ‘সি’ শ্রেণীর শিল্পপ্রতিষ্ঠানগুলো ঋণ সুবিধা পাচ্ছে। এসব অঞ্চলে অবস্থিত ‘এ’ শ্রেণীর প্রতিষ্ঠানগুলো পুরোপুরি বিদেশী মালিকানাধীন। ‘বি’ শ্রেণীর প্রতিষ্ঠানগুলো দেশী-বিদেশী যৌথ মালিকানার এবং ‘সি’ শ্রেণীর প্রতিষ্ঠানগুলো দেশী মালিকানার। তবে বেজা, বেপজা ও বাংলাদেশ হাই-টেক পার্কের বাইরের বিদেশী ও দেশী-বিদেশী যৌথ মালিকানাধীন প্রতিষ্ঠানগুলোকেও প্রণোদনার আওতায় ঋণ সুবিধা দিতে বিভিন্ন পক্ষ থেকে অনুরোধ জানানো হয়েছে।
এ পরিপ্রেক্ষিতে অর্থনৈতিক অঞ্চলের বাইরের প্রতিষ্ঠানকে প্রধানমন্ত্রী ঘোষিত বিভিন্ন ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠান বাস্তবায়িত ও বাস্তবায়নাধীন আর্থিক প্রণোদনা প্যাকেজগুলোর সুবিধার আওতায় ঋণ সুবিধা দেয়া যাবে কিনা সে বিষয়ে অর্থ বিভাগের মতামত জানানোর অনুরোধ জানিয়েছে বাংলাদেশ ব্যাংক। এসব প্রতিষ্ঠানকে একই সুবিধা দেয়া হলে বিদেশী উদ্যোক্তারা দেশে বিনিয়োগে আগ্রহী হবে বলেও মনে করে কেন্দ্রীয় ব্যাংক। তবে এ চিঠির পরিপ্রেক্ষিতে এখন পর্যন্ত কোনো মতামত দেয়নি অর্থ বিভাগ।
এ বিষয়ে জানতে চাইলে বাংলাদেশ ব্যাংকের মুখপাত্র ও নির্বাহী পরিচালক সিরাজুল ইসলাম বণিক বার্তাকে বলেন, শুধু দেশীয় প্রতিষ্ঠানগুলোর জন্য প্রথমে প্রণোদনা প্যাকেজ ঘোষণা করা হয়। পরবর্তী সময়ে বেজা, বেপজা ও বাংলাদেশ হাই-টেক পার্কে অবস্থিত বিদেশী ও দেশী-বিদেশী যৌথ মালিকানাধীন প্রতিষ্ঠানগুলোকে এ সুবিধার আওতায় আনা হয়। এবার অর্থনৈতিক অঞ্চলের বাইরে অবস্থিত বিদেশী প্রতিষ্ঠানগুলোকে একই সুবিধা প্রদানে মতামত চাওয়া হয়েছে। কারণ এসব প্রতিষ্ঠানেও বাংলাদেশী শ্রমিক কাজ করেন। এ প্রতিষ্ঠানগুলোর মাধ্যমেও দেশে বৈদেশিক মুদ্রা আসে। তাই এদের সমান সুবিধা দেয়ার জন্য মতামত চাওয়া হয়েছে।
প্রণোদনা প্যাকেজ ঘোষণার এক বছর পার হলেও এখনো তা চলমান রয়েছে উল্লেখ করে তিনি আরো বলেন, এ প্যাকেজগুলো তিন বছর মেয়াদে ঘোষণা করা হয়েছে। তাই পরবর্তী সময়ে এসব প্যাকেজের আওতায় অন্যরা যেসব সুবিধা পাবে, বিদেশী প্রতিষ্ঠানগুলোকেও এ ধরনের সুবিধা দেয়ার জন্যই এ উদ্যোগ নেয়া হয়েছে।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক কেন্দ্রীয় ব্যাংকের ঊর্ধ্বতন একজন কর্মকর্তা বণিক বার্তাকে বলেন, জুলাই থেকে আবার বাংলাদেশ ব্যাংক প্রায় ৯০ হাজার কোটি টাকার প্রণোদনা প্যাকেজ বাস্তবায়ন শুরু করবে। এক্ষেত্রে বেজা, বেপজা ও বাংলাদেশ হাই-টেক পার্কের বিদেশী ও দেশী-বিদেশী যৌথ মালিকানাধীন প্রতিষ্ঠানগুলো এ সুবিধা পাবে। কিন্তু অর্থনৈতিক অঞ্চলের বাইরেও অনেক বিদেশী কোম্পানি রয়েছে। বাংলাদেশ ব্যাংক মনে করে, সমভাবে তাদেরও এ সুবিধা পাওয়া উচিত। এটি বাস্তবায়ন হলে সমতা বিধান হবে। কিন্তু এখনো অর্থ বিভাগের মতামত আমরা পাইনি। তবে আশা করি এক্ষেত্রে বাংলাদেশ ব্যাংকের সঙ্গে সরকার দ্বিমত করবে না। এটি বাস্তবায়ন হলে বিদেশী উদ্যোক্তারাও বাংলাদেশে বিনিয়োগে আগ্রহী হবেন। কারণ এর আগে বাংলাদেশে কখনই এ সুবিধা দেয়া হয়নি।
সূত্র বলছে, নভেল করোনাভাইরাসের প্রকোপ মোকাবেলায় বাংলাদেশ ব্যাংক ঘোষিত প্রণোদনা তহবিল থেকে কম সুদের ঋণ পেয়েছেন ১৩ লাখ গ্রাহক। পোশাক শ্রমিকদের বেতনের জন্য যে ঋণ দেয়া হয়েছিল, তার আওতায় বেতন পেয়েছেন ৩৮ লাখ গ্রাহক। আর ঋণে দুই মাসের সুদ ভর্তুকি সুবিধা পেয়েছেন ৭৩ লাখ গ্রাহক। এখন পর্যন্ত ঘোষিত ২৩ প্যাকেজের মধ্যে নয়টি তহবিলের সঙ্গে বাংলাদেশ ব্যাংক সরাসরি সম্পৃক্ত। তবে মোট ১২টি তহবিল বাস্তবায়ন করছে বাংলাদেশ ব্যাংক, যার আকার প্রায় ১ লাখ কোটি টাকা। এর মধ্যে ৮৩ হাজার ৫৩ কোটি টাকার তহবিল এরই মধ্যে বাস্তবায়ন হয়েছে। বাস্তবায়নের হার মোট প্যাকেজের ৮৩ শতাংশ।
এ অবস্থায় বিদেশী বিনিয়োগ বাড়াতে সম্প্রতি বাংলাদেশ বিনিয়োগ উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ (বিডা) সরকারের কাছে বেশকিছু সুপারিশ করে। সরকারের এ সংস্থার সুপারিশগুলোর মধ্যে অন্যতম ছিল সরকারের পক্ষ থেকে শিল্প খাতকে প্রণোদনা সুবিধা দেয়ার ক্ষেত্রে দেশী-বিদেশী প্রতিষ্ঠানের সমতা বিধান রক্ষা করা। প্রণোদনাপ্রাপ্তির ক্ষেত্রে বিদেশী প্রতিষ্ঠানগুলোকে সমান সুযোগ দেয়া গেলে এসব উদ্যোক্তা বাংলাদেশে বিনিয়োগে কিছুটা হলেও আগ্রহী হবেন বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।










