বরিশাল অঞ্চলে ১৯৫৬ সালে প্রতিষ্ঠিত হয় মুরগি প্রজনন ও উন্নয়ন খামার। উদ্দেশ্য ছিল মানুষের পুষ্টির চাহিদা পূরণ ও প্রান্তিক পর্যায়ে মুরগির খামার গড়ে তুলতে সহায়তা করা। প্রতিষ্ঠাকাল থেকে ভালোভাবে চললেও নব্বইয়ের দশকে দেখা দেয় জনবল সংকট। বর্তমানে খামারটিতে কর্মকর্তা-কর্মচারীর ১৯টি পদের বিপরীতে কর্মরত আছেন মাত্র আটজন। এছাড়া মোরগ-মুরগি, ডিম ও বাচ্চা বিক্রির ক্ষেত্রে অব্যবস্থাপনার অভিযোগ রয়েছে উপকারভোগীদের। এসব কারণে খামারটিতে ডিম ও মুরগি উৎপাদন অনেকটাই কমেছে।

উপকারভোগীদের অভিযোগ, খামারে মোরগ-মুরগি, বাচ্চা ও ডিম কিনতে গেলে টাকা জমা নেয়া হয় ঠিকই। তবে নাম লিখে সিরিয়াল দিয়ে রাখলেও রসিদ দেয়া হয় না ক্রেতাদের। ফলে বড় অংকের টাকা সরকারের হাতছাড়া হয়ে যাচ্ছে বলে দাবি তাদের।

আমানতগঞ্জের বাসিন্দা হারুন অর রশিদ, দেলোয়ার হোসেন ও ছালাম মিয়া জানান, নামমাত্র একটি সিটি জেন চার্টার টানিয়ে রাখা হয়েছে। তবে কোনো নিয়মই মানছে না কর্তৃপক্ষ। ক্রয়-বিক্রয়ের ক্ষেত্রে রসিদ ব্যবহারের নিয়ম মানা হচ্ছে না। একইভাবে ডিম ও মুরগি কে কত পিস কিনতে পারবে সে নিয়মও মানা হচ্ছে না এখানে।

খামার সূত্রে জানা গেছে, খামারটিতে ১৭ হাজার মুরগি ধারণ ক্ষমতা রয়েছে। সেখানে মুরগি রয়েছে ১ হাজার ৫৮৬টি। এর মধ্যে ডিম দেয়া মুরগি রয়েছে ৯১৬টি। এছাড়া ২০ বছরের পুরনো ম্যানুয়াল মেশিনে জোড়াতালি দিয়ে হ্যাচারির কর্যক্রম চালু রাখা হয়েছে। বছরে দুবার প্রান্তিক খামারি ও সাধারণ মানুষ ১২-১৫ টাকা দামে মুরগির বাচ্চা ক্রয় করতে পারেন। সেই হিসাবে ২০২২-২৩ অর্থবছরের জুন-জুলাই পর্যন্ত মোরগ-মুরগি বিক্রি করে খামারের আয় হয়েছে ২ লাখ ৯৫ হাজার ৯৭০ টাকা। মুরগির বাচ্চা বিক্রি করে আয় হয়েছে ১১ লাখ ১৯ হাজার ৯২০ টাকা ও ডিম বিক্রি করে ৮ লাখ ৯৭ হাজার ৯৩৬ টাকা আয় হয়েছে। একইভাবে ২০২৩-২৪ অর্থবছরের জুলাই-ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত মোরগ-মুরগি বিক্রি করে আয় হয়েছে ২ লাখ ৭৯ হাজার ১০৭ টাকা। মুরগির বাচ্চা বিক্রি করে আয় হয়েছে ১১ লাখ ৮২ হাজার ১৬৯ টাকা। ডিম বিক্রি করে ৬ লাখ ৬৩ হাজার ১৩৪ টাকা আয় হয়েছে। এ দুই অর্থবছরে ৪৪ লাখ ৫৬ হাজার ৭০৬ টাকা সরকারের কোষাগারে জমা দিয়েছে খামার কর্তৃপক্ষ।

এ ব্যাপারে খামারের উপপরিচালক ডা. সুশান্ত দাস বণিক বার্তাকে বলেন, ‘এখানে কিছু অনিয়ম, নিয়মে পরিণত হয়েছে। আমরা চেষ্টা করছি অনিয়ম দূর করতে। খামারটিতে আধুনিক হ্যাচারি মেশিন ও যন্ত্রপাতি স্থাপন করলে একদিনে ৫০ হাজার বাচ্চা উৎপাদন ও বিক্রি সম্ভব। একই সঙ্গে ২ লাখ ৬৮ হাজার মানুষের বার্ষিক ডিমের চাহিদা, এক হাজার মানুষের কর্মসংস্থান, পাঁচ হাজার লোকের বার্ষিক মাংসের চাহিদা পূরণ সম্ভব। এছাড়া ৪ হাজার ৪২৬ টন জৈবসার উৎপাদন সম্ভব এ খামার থেকে।’

খামারটি দারিদ্র্যবিমোচনসহ আত্মকর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি এবং একটি বাড়ি, একটি খামার কার্যক্রম বাস্তবায়নে আবদান রাখবে বলে আশাবাদ ব্যক্ত করেন ডা. সুশান্ত দাস। খামারটির উন্নয়নে কাজ করে যাচ্ছেন বলেও জানান তিনি।

খামার সূত্রে জানা গেছে, নগরীর আমানতগেঞ্জ ১৮ একর জমির ওপর প্রতিষ্ঠিত হয় খামারটি। এর মধ্যে ছয় একর স্থলভূমি। বাকি জমি জলাশয়। বর্তমানে খামারের দখলে রয়েছে মাত্র পাঁচ একর জমি। বাকিটা জেলা প্রশাসনের নিয়ন্ত্রণে। খামারটিতে সাতটি লেয়ার শেড, দুটি গ্রোয়ার শেড, দুটি ব্রুডার শেড ও একটি হ্যাচারি শেড রয়েছে। তবে এসব শেড এখন ব্যবহারের উপযোগী নয়। পুরনো ভবনগুলোর দেয়ালে ফাটল ধরেছে। প্রতিষ্ঠাকাল থেকে ভালোভাবে চললেও নব্বইয়ের দশক থেকে জনবল সংকট দেখা দিলে খামারটির উৎপাদন ক্ষমতা হ্রাস পেতে থাকে। এভাবেই চলতে থাকে বছরের পর বছর। কিন্তু এর উন্নয়নে আর কোনো উদ্যোগ নেয়া হয়নি।

অন্যদিকে জনবল সংকটের কারণে খামার পরিচালনা করতে হিমশিম খাচ্ছে কর্তৃপক্ষ। খামারটিতে উপপরিচালক পদটি শূন্য রয়েছে। সেখানে অতিরিক্ত দায়িত্বে একজন কর্মরত রয়েছেন। ভাইরোলজিস্টের একটি ও পোলট্রি উন্নয়ন কর্মকর্তার দুটি পদ শূন্য রয়েছে দীর্ঘদিন। এছাড়া উপসহকারী দুটি পদের বিপরীতে কর্মরত আছেন একজন, অফিস সহকারীর একটি পদ থাকলেও শূন্য রয়েছে দীর্ঘদিন, ডাক অ্যাটেনডেন্টের চারটি পদের বিপরীতে একজন কর্মরত থাকলেও তিনি প্রেশনে ভোলায় রয়েছেন। পোলট্রি অ্যাটেনডেন্টের দুটি পদই শূন্য রয়েছে, হ্যাচারি অ্যাটেনডেন্টের দুটি পদের বিপরীতে আছেন একজন।