আশুলিয়ায় সোয়েটার তৈরির কারখানা এবিসি। প্রায় এক দশকের এ কারখানায় এতদিন ম্যানুয়াল বা হাতে চালিত মেশিনের মাধ্যমে উৎপাদন কার্যক্রম চলত। মূলত শ্রমিকনির্ভর এ উৎপাদন প্রক্রিয়ায় দক্ষতার বিষয়টি তুলনামূলক কম গুরুত্বপূর্ণ ছিল। সম্প্রতি কারখানাটিতে স্থাপন করা হয়েছে সোয়েটার তৈরির স্বয়ংক্রিয় বা অটোমেটেড জ্যাকার্ড মেশিন। কম্পিউটারের মাধ্যমে দেয়া নির্দেশনায় এ মেশিন দিয়ে একজন অপারেটর চাহিদা অনুযায়ী সোয়েটার নিটিংয়ের পুরো প্রক্রিয়া সম্পন্ন করতে পারেন। তবে স্বয়ংক্রিয় এ ব্যবস্থা চালুর প্রভাবে তুলনামূলক দক্ষ হওয়ায় পুরুষ কর্মীর চাহিদা বাড়ছে।
পোশাক খাতে সাম্প্রতিককালে স্বয়ংক্রিয় উৎপাদন ব্যবস্থা ব্যবহারের প্রবণতা বাড়ছে। স্বয়ংক্রিয় নিটিং মেশিন, রোবোটিকস, থ্রিডি প্রিন্টিংসহ নতুন নতুন প্রযুক্তি তৈরি পোশাকের উৎপাদন প্রক্রিয়ায় ব্যবহার করতে শুরু করেছেন উদ্যোক্তারা। এতে কারখানায় শ্রমিকের সংখ্যা কমে যাচ্ছে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, অটোমেশনের কারণে শ্রমিকের চাহিদা কমে যাওয়ার ঘটনা এখন হরহামেশাই ঘটছে। কিন্তু স্বয়ংক্রিয় ব্যবস্থা চালুর যেসব প্রভাব পড়ছে, তার অন্যতম হলো নারী শ্রমিকের অংশগ্রহণ কমে যাওয়া।
আশির দশকে শুরু হওয়া রফতানিমুখী তৈরি পোশাক শিল্পের কর্মীদের ৯০ শতাংশই ছিলেন নারী, বাকি ১০ শতাংশ পুরুষ। গত পাঁচ বছরে পোশাক কারখানার চিরাচরিত এ দৃশ্যপটে বড় পরিবর্তন এসেছে। এর অন্যতম কারণ হিসেবে বিশেষজ্ঞরা পোশাক শিল্পের স্বয়ংক্রিয় উৎপাদন ব্যবস্থার বিষয়টিকে তুলে ধরছেন। তাদের দাবি স্বয়ংক্রিয় যন্ত্রগুলো পরিচালনায় পুরুষরা তুলনামূলক বেশি দক্ষতার পরিচয় দিচ্ছেন। অন্যদিকে দক্ষতার ঘাটতিতে নারীরা মেশিন পরিচালনায় পারদর্শিতা দেখাতে পারছেন না। এতে করে স্বাভাবিকভাবেই কারখানায় নারীর আধিক্য কমছে, আর বাড়ছে পুরুষের অংশগ্রহণ।
অটোমেশনের কারণে নারীর চেয়ে পুরুষ কর্মীর আধিক্য বাড়ছে কিনা—এমন প্রশ্নের জবাবে বিজিএমইএ সভাপতি ড. রুবানা হক বলেন, সোয়েটার কারখানার জ্যাকার্ডে (স্বয়ংক্রিয় যন্ত্র) রূপান্তর নারী শ্রমিকের অংশগ্রহণ কমিয়েছে। ওভেন খাতে নারী শ্রমিকের অংশগ্রহণ এখনো তুলনামূলক বেশি। এ খাতে নারী কর্মীর আধিক্যের বিষয়ে প্রচলিত ধারণাটি তথ্যভিত্তিক নয়। ফলে নারীর সংখ্যা কমে যাওয়ার বিষয়টি সঠিক না-ও হতে পারে। বিদ্যমান ধারণার চেয়ে কম হলেও পোশাক খাতে নারী কর্মী কমে যাওয়ার তথ্যভিত্তিক কোনো প্রমাণ নেই। সাধারণভাবে এ খাতে নারী ও পুরুষের অনুপাত ৬০:৪০ হিসেবে বিবেচনা করা যেতে পারে।
পোশাক কারখানার ডিজিটাল মানচিত্রটি তৈরির কাজ করছে ব্র্যাক বিশ্ববিদ্যালয় ও সিঅ্যান্ডএ ফাউন্ডেশন। পোশাক শিল্প মালিকদের সমিতি বিজিএমইএ, বিকেএমইএ ও বাংলাদেশ সরকারের কল-কারখানা ও প্রতিষ্ঠান পরিদর্শন অধিদপ্তরের সহায়তায় ‘ম্যাপড ইন বাংলাদেশ (এমআইবি)’ শীর্ষক প্রকল্পের আওতায় উদ্যোগটি এখনো চলমান। এটির হালনাগাদ পরিসংখ্যানে পোশাক কারখানায় নারী ও পুরুষ কর্মীর অংশগ্রহণ চিত্র ফুটে উঠেছে।
এমআইবির পরিসংখ্যান অনুযায়ী, ডিজিটাল ম্যাপের আওতায় এখন পোশাক কারখানা আছে মোট ৩ হাজার ২২৩টি। এ কারখানাগুলোতে কর্মরত আছেন মোট ২৫ লাখ ৬২ হাজার ৩৮৩ জন কর্মী। এর মধ্যে পুরুষ কর্মী ১৪ লাখ ৯৪ হাজার ১১ জন। নারী কর্মী ১০ লাখ ৬৮ হাজার ৩৭২ জন। এ হিসেবে পুরুষ কর্মী ৪১ দশমিক ৭ শতাংশ ও নারী কর্মী ৫৮ দশমিক ৩ শতাংশ।
সম্প্রতি পোশাক খাত নিয়ে একটি সমীক্ষার প্রাথমিক ফল প্রকাশ করেছে বেসরকারি গবেষণা প্রতিষ্ঠান এশিয়ান সেন্টার ফর ডেভেলপমেন্ট (এসিডি)। প্রতিষ্ঠানটির গবেষণার তথ্য বলছে, পোশাক কারখানায় পুরুষ কর্মীর ৪০ দশমিক ৮ শতাংশ বাকি ৫৮ দশমিক ৩ শতাংশ নারী কর্মী। আন্তর্জাতিক শ্রম সংস্থার সমীক্ষায় দেখা গেছে, ২০১০ সালে নারী শ্রমিকের হার ছিল ৬৩ দশমিক ৪ শতাংশ, আর ২০১৮ সালে এ হার ছিল ৬০ দশমিক ৫ শতাংশ। সেন্টার ফর পলিসি ডায়লগের (সিপিডি) এক গবেষণার তথ্য মতে, ২০১৮ সালে পোশাক খাতে নারী কর্মী ছিল ৬০ দশমিক ৮ শতাংশ। অন্যদিকে ওই সময় খাতটিতে পুরুষ কর্মী ছিল ৩৯ দশমিক ২ শতাংশ।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, অটোমেশন ছাড়াও পোশাক কারখানায় নারী শ্রমিকের অংশগ্রহণ কমে যাওয়ার আরো বেশকিছু কারণ রয়েছে। এর মধ্যে অন্যতম শিক্ষা ও নির্ধারিত বিষয়ের প্রশিক্ষণে পুরুষের তুলনায় নারী শ্রমিকের দক্ষতার ঘাটতি। এছাড়া খাতের মজুরি ক্রমেই বৃদ্ধি পাওয়ায় পোশাক কারখানায় কাজে পুরুষ কর্মীর আগ্রহ বৃদ্ধি পাচ্ছে। সামাজিক বৈষম্যের কারণেও এ খাতে নারীর অংশগ্রহণ কমছে।
প্রযুক্তিগত দক্ষতা বিবেচনায় নারী-পুরষের মধ্যে এক ধরনের বিভেদ তৈরি হচ্ছে, যাতে পিছিয়ে পড়ছেন মূলত নারীরাই—এমন মত সিপিডির গবেষণা পরিচালক ড. খন্দকার গোলাম মোয়াজ্জেমের। তিনি বণিক বার্তাকে বলেন, নারী শ্রমিকের অংশগ্রহণ কমে যাওয়ার অন্যতম প্রধান কারণ কারখানায় অটোমেশন। এছাড়া পোশাক খাতে দক্ষতানির্ভর কাজ বেড়েছে। এসব কাজে নারীরা পুরুষের চেয়ে তুলনামূলক কম দক্ষ। এর ফলে পোশাক কারখানায় পুরুষ কর্মীরা অগ্রাধিকার পাচ্ছেন। ফলে স্কিল কম্পোজিশন অনেক পরিবর্তন হয়ে গেছে। এসব কারণে নতুন যে মেশিনগুলো আসছে, সেগুলো পরিচালনায়ও দক্ষতার প্রয়োজন হচ্ছে। যেসব কর্মী কয়েক ধরনের মেশিন পরিচালনায় সক্ষম, তাদেরই কারখানা কর্তৃপক্ষ পছন্দ করছেন বেশি। এক্ষেত্রে পুরুষরা একাধিক মেশিন পরিচালনায় দক্ষতা অর্জন করলেও নারী কর্মীরা শুধু অন জব ট্রেনিংয়ের মাধ্যমে নির্দিষ্ট মেশিনের কাজে দক্ষ হন। দক্ষতানির্ভর কাজের প্রভাবে আগে কর্মীরা এক কারখানায় বেশিদিন কাজ না করলেও এখন সে প্রবণতা কমেছে। মজুরি বৃদ্ধিও পোশাক কারখানায় কাজে আগের চেয়ে বেশি আগ্রহী করছে পুরুষকে। নারী ক্ষমতায়ন প্রেক্ষাপট বিবেচনায় নিলে বিদ্যমান পরিস্থিতি নারী কর্মীর জন্য হুমকিস্বরূপ।










