বরিশাল নগরে সড়ক রয়েছে ৬০০ কিলোমিটারের বেশি। তবে অধিকাংশ সড়কই বেহাল। সাবেক মেয়র শওকত হোসেন হিরনের আমলে সড়ক উন্নয়নে কিছু কাজ করা হয়েছিল। এরপর আহসান হাবিব কামালের আমলেও সংস্কার হয় অধিকাংশ সড়কের। মূলত ২০১৫ সালের পর দুই-একবার সংস্কার ছাড়া তেমন কোনো উন্নয়নকাজ হয়নি নগরীর অভ্যন্তরীণ সড়কে। সাবেক দুই মেয়র সেরনিয়াবাত সাদিক আব্দুল্লাহ ও তার চাচা আবুল খায়ের আব্দুল্লাহ খোকন সেরনিয়াবাতের সময়ে সড়কে তেমন কোনো উন্নয়ন হয়নি।

নগরের বাসিন্দারা বলছেন, নয় বছরে সংস্কার না করায় অভ্যন্তরীণ অধিকাংশ সড়কই চলাচলের অনুপযোগী হয়ে পড়েছে। বিশেষ করে বর্ধিত এলাকার সড়ক ও ড্রেনেজ ব্যবস্থা না থাকায় সমস্যায় পড়েছে ২৩, ২৪ ও ২৫, ২৬, ২৭, ২৮, ২৯ ও ৩০ নম্বর ওয়ার্ডের বাসিন্দারা। টানা বৃষ্টি হলে সড়কে সৃষ্ট খানাখন্দেও পানি জম থাকছে। তাতে রাস্তাঘাটও কর্দমাক্ত হয়ে যাচ্ছে। বর্ধিত এলাকায় এখনো অনেক সড়ক কাঁচা রয়েছে। এর মধ্যে জানুয়ারিতে সড়ক রক্ষায় আগাম কোনো ব্যবস্থা না নিয়ে নগরীর খাল খনন করে পানি উন্নয়ন বোর্ড (পাউবো)। সিটি করপোরেশন তখন সড়ক রক্ষায় পাইলিং বা গাইড ওয়ালের ব্যবস্থা না করায় ভেঙে পড়েছে শতকোটি টাকার সড়ক। রূপাতলী খালের এক কিলোমিটার খননে পাউবো ২৮ লাখ টাকা খরচ করলেও কাজের কাজ কিছুই হয়নি। উল্টো রূপাতলী খালে ভেঙে পড়েছে সড়কটি।

নগরীর ২৪ নম্বর ওযার্ডের জিয়ানগর এলাকার বাসিন্দা আবুল হোসেন বলেন, ‘পাকা ও কাঁচা সড়ক সবই বর্ষায় জোয়ারে প্লাবিত হয়। জলাবদ্ধতা দূর করতে খাল খনন করা হয়েছে। তবে খ্রিস্টান পাড়া থেকে আধা কিলোমিরাটর পাকা ও বাকি প্রায় আধা কিলোমিটার কাঁচা সড়ক রক্ষায় কোনো ব্যবস্থা নেয়া হয়নি। রূপাতলী খালের পাশে একটা লাইট পোস্ট ছিল। সড়কের সঙ্গে সেটিও ভেঙে পড়েছে। ১০ মাস পেরিয়ে গেলেও তা পুনর্নির্মাণে সিটি করপোরেশন কোনো পদক্ষেপ নেয়নি।’

নগর ভবন সূত্রে জানা গেছে, নগরীর আওতায় সড়ক রয়েছে ১ হাজার ৯৫২টি, যার দৈর্ঘ্য প্রায় ৬০০ কিলোমিটার। এর মধ্যে পিচ ঢালাই সড়ক রয়েছে ৩৬১ দশমিক ২১ কিলোমিটার। কংক্রিটের সড়ক রয়েছে ১০৩ দশমিক ৮৯ কিলোমিটার। আরসিসি সড়ক রয়েছে ৩৪ দশমিক ৬৩৯ কিলোমিটার। বাকি সড়কগুলো কাঁচা। সিটি করপোরেশনের তথ্যানুসারে, নগরে ক্ষতিগ্রস্ত সড়কের দৈর্ঘ্য প্রায় ৩০০ কিলোমিটার। এসব সড়কের কোথাও কোথাও বড় গর্ত রয়েছে।

নগরবাসী জানায়, সড়কের যে অবস্থা, তাতে স্বাভাবিকভাবে চলাফেরা করার মতো নেই। রিকশা বা অটোরিকশায় যেতে গেলে পড়ে যাওয়ার মতো অবস্থা হয়। প্রতিদিন কোথাও না কোথাও দুর্ঘটনা ঘটে।

নাগরিক সমাজের নেতা ডা. মিজানুর রহমান বলেন, ‘সড়ক দিয়ে যানবাহন চলাচলের সময় চাকা খাদে পড়ে যায়। অনেক সময় কাদাপানি গায়ে মেখে পথচারীদের ঘরে ফিরে যেতে হয়।’

খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, সামান্য বৃষ্টি হলে নগরীর অভ্যন্তরীণ সড়কে জলাবদ্ধতার সৃষ্টি হয়। বিশেষ করে ১২ নম্বর ওয়ার্ডের খ্রিস্টান পাড়া সড়ক, স্টেডিয়াম কলোনি, চাঁদমারি মাদ্রাসা সড়ক, ভিআইপি সড়ক, ২৫ নম্বর ওয়ার্ডের মওলানা ভাসানী সড়ক থেকে সোহরাফ খান হাউজিং হয়ে ফকিরবাড়ি স্কুলের সংযোগ সড়কে জলাবদ্ধতা দেখা দেয়। এছাড়া ইসলাম পাড়া, সদর রোড, নিউ সদরঘাট সড়ক, ফকিরবাড়ি রোড, কালীবাড়ি রোড, মল্লিক রোড, মুসলিম গোরস্তান রোড, দরগাবাড়ি রোড়, কাশীপুর বাজারসংলগ্ন জোড়পুকুর, ইসাকাঠি সড়ক, লুৎফর রহমান সড়ক, কাউনিয়া প্রধান সড়ক, কাশিপুর কলোনি সড়ক, কাশিপুর চৌমাথা সড়কসহ গুরুত্বপূর্ণ সড়কগুলো খানাখন্দে ভরা।

২৫ নম্বর ওয়ার্ডের বাসিন্দা মেহেদি হাসান জানান, স্থানীয়দের উদ্যোগে একবার পানি অপসারণের চেষ্টা করা হলেও তাতে কোনো লাভ হয়নি। বড় ধরনের উদ্যোগ ছাড়া ভাসানী সড়কের জলাবদ্ধতা নিরসন করা যাবে না।

রূপাতলী হাউজিং স্টেটের বাসিন্দা আনিছুর রহমান জানান, আগে থেকেই রূপাতলী হাউজিংয়ের বিভিন্ন সড়কে পানি জমেছে। তবে কয়েকটি শাখা সড়কের কাজ করা হয়েছে। এরই মধ্যে যেসব সড়ক উঁচু করা হয়েছে তাতে পানি জমে না। তবে সড়কের সঙ্গে ড্রেনেজ ব্যবস্থার উন্নতি না হলে এ সমস্যার সমাধান হবে না।

এ বিষয়ে সিটি করপোরেশনের নির্বাহী প্রকৌশলী মো. আবুল বাশার বণিক বার্তাকে বলেন, ‘ভাঙা ১৫০টি সড়ক ও ৫০টি ড্রেন নির্মাণ এবং সংস্কারের জন্য দরপত্র আহ্বান করা হয়েছে। কিছু সড়কে কাজ শুরু হয়েছে। বাকি সড়কের কাজ শিগগিরই শুরু হবে। বর্ষার সময় সড়কে কার্পেটিং করা যায় না। বর্ষা কমলেই নগরীর ভাঙা সড়কগুলো মেরামত করা হবে।’

তিনি আরো বলেন, ‘২০২৩ সালের শেষ দিকে নগরীর অবকাঠামো উন্নয়নে সরকার ৭৯৭ কোটি টাকার প্রকল্প অনুমোদন দিয়েছে। এর মধ্যে প্রায় ২০০ কোটি টাকার কাজ শুরু হয়েছে। বাকি কাজ পর্যায়ক্রমে হবে। যে টাকা সরকার বরাদ্দ দিয়েছে তা দিয়ে নগরীর সব সড়ক সংস্কার ও নতুন করে নির্মাণ করা যাবে।’