গ্রামাঞ্চলে ‘ব্যাঙের ছাতা’ হিসেবে পরিচিত হলেও মাশরুম হলো এক ধরনের পুষ্টিকর ছত্রাক, যা ভিটামিন, মিনারেল ও অ্যান্টিঅক্সিডেন্ট সমৃদ্ধ। এটি উচ্চ রক্তচাপ, হৃদরোগসহ বেশ কয়েকটি রোগ প্রতিরোধে ভূমিকা রাখে। মাশরুম চাষ সম্প্রসারণের লক্ষ্যে দেশের ৬৪ জেলার ১৬০টি উপজেলায় কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের একটি প্রকল্প চলমান রয়েছে। পাঁচ বছর মেয়াদি এ প্রকল্পের লক্ষ্য হলো সারা দেশে ৮০০ উদ্যোক্তা সৃষ্টি ও স্বাবলম্বী করা। ২০২৩ সালের জানুয়ারিতে বান্দরবানেও শুরু হয় মাশরুম চাষ সম্প্রসারণের মাধ্যমে পুষ্টি উন্নয়ন ও দারিদ্র্য হ্রাসকরণ প্রকল্পের কার্যক্রম। ৯৭ কোটি টাকা ব্যয়ে এ প্রকল্পের আওতায় বেশ কয়েকজন উদ্যোক্তাকে এরই মধ্যে প্রশিক্ষণ দেয়া শুরু হয়েছে। তবে উৎপাদন কেন্দ্র ও প্রদর্শনী ঘর নির্মাণ পুরোপুরি শেষ না হওয়ায় বছর পেরিয়ে গেলেও মাশরুম উৎপাদন ও বাজারজাত করতে পারেননি তারা।
উদ্যোক্তারা বলছেন, শুরু থেকেই প্রকল্পের কার্যক্রমে অনিয়মের অভিযোগ রয়েছে। এর মধ্যে প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত এক উদ্যোক্তাকে দেয়া উৎপাদন ও প্রদর্শনীর দুটি ঘর দেয়ার পর ভেঙে নেয়ার অভিযোগও রয়েছে এক উপসহকারী কৃষি কর্মকর্তার বিরুদ্ধে। এছাড়া প্রকল্প শুরুর আগে থেকেই বাণিজ্যিকভাবে ক্ষুদ্র পরিসরে চাষ করা ব্যক্তিদের প্রকল্পভুক্ত উদ্যোক্তা দেখিয়ে দুটি ঘর নির্মাণ ও ঘরের আনুষঙ্গিক সামগ্রীসহ যন্ত্রপাতি ক্রয়ের টাকা নগদে দেয়া এবং নির্ধারিত পরিমাণের চেয়ে কম টাকা দেয়ার অভিযোগ রয়েছে।
সদর উপজেলায় প্রশিক্ষণ পাওয়া তিনজন উদ্যোক্তার একজন হলেন মংথোয়াইসিং মারমা। তিনি বলেন, ‘প্রকল্পের আওতায় আমার জন্য বাকীছড়ামুখ এলাকায় এক বছর আগে দুটি ঘর নির্মাণকাজ শুরু হয়। তবে সেগুলো এখনো পুরোপুরি শেষ হয়নি। বাধ্য হয়ে উপশহরের বালাঘাটার আমবাগান এলাকায় মাশরুম উৎপাদন করতে হচ্ছে।’
এ ব্যাপারে প্রকল্পটির সিনিয়র মনিটরিং ও মূল্যায়ন কর্মকর্তা মোহাম্মদ মনিরুজ্জামান বণিক বার্তাকে বলেন, ‘উদ্যোক্তার হাতে নগদ টাকা দেয়ার বিধান নেই। বিধি অনুযায়ী ঘর নির্মাণ থেকে শুরু করে প্রয়োজনীয় সব কিছু ক্রয় ও প্রদান করবেন উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা। উৎপাদন শুরুর পরও বাজারজাতের জন্য ভ্যানগাড়ি না পাওয়াসহ সার্বিক বিষয় খতিয়ে দেখা হবে। অনিয়ম পেলে কোনো ছাড় দেয়া হবে না।’
কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর সূত্রে জানা গেছে, প্রকল্পের কার্যক্রম চলমান থাকলেও এ বিষয়ে কিছুই জানেন না কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের কর্মকর্তারা। প্রকল্পে প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত একজন উদ্যোক্তার জন্য ইনকিউবেশন কক্ষ ও তার আনুষঙ্গিক ব্যয় বাবদ ১ লাখ ৩৮ হাজার ৫০০, চাষ ঘর ও আনুষঙ্গিক ব্যয় বাবদ ১ লাখ ৫৩ হাজার ৫০০ টাকা, স্টেরিলাইজেশন কাম ইনোকুলেশন চেম্বার বাবদ ৩০ হাজার, সাইন বোর্ড বাবদ ২ হাজার, উৎপাদিত মাশরুম বাজারজাত করার একটি ভ্যান ক্রয় বাবদ ৪৫ হাজার এবং সেটিংস ও মালাপত্র পরিবহন বাবদ ৫ হাজার টাকা বরাদ্দ রয়েছে। সব মিলিয়ে একজন উদ্যোক্তা মাশরুম উৎপাদন ও বাজারজাতের জন্য ৩ লাখ ৭৪ হাজার টাকা বরাদ্দ পাবেন।
তবে প্রকল্পটির কার্যক্রম সম্পর্কে কিছুই জানা নেই বলে জানিয়েছেন বান্দরবান কৃষি সম্প্রসারণ অধিপ্তরের উপপরিচালক এমএম শাহ নেয়াজ। তিনি বণিক বার্তাকে বলেন, ‘প্রকল্পের কার্যক্রম সম্পর্কে জেলা অফিসকে কিছুই জানানো হয় না। কেবল প্রকল্প পরিচালকের কার্যালয়ের সঙ্গে প্রকল্পভুক্ত উপজেলা কৃষি কর্মকর্তাদের যোগাযোগ হয়।’
জানুয়ারির মাঠ পর্যায়ের তথ্য অনুযায়ী, প্রকল্পটির মেয়াদের আড়াই বছরেও শেষ হয়নি প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত অধিকাংশ উদ্যোক্তার মাশরুম উৎপাদন কেন্দ্র ও প্রদর্শনী ঘর নির্মাণকাজ। এছাড়া কৃষি বিভাগের আগের প্রকল্পের উপকারভোগী ও প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত উদ্যোক্তাদেরও প্রকল্পভুক্ত দেখানো হয়েছে।
গত বছরের এপ্রিলের মাঝামাঝিতে উপসহকারী কৃষি কর্মকর্তা মিলু তঞ্চঙ্গ্যা প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত উদ্যোক্তা মংহ্লাশৈ মারমাকে দেয়া উৎপাদন ও প্রদর্শনী ঘর দুটি ভেঙে সব সরঞ্জাম নিয়ে তাকে বুঝিয়ে দেন বলে জানিয়েছেন ইউজিন ত্রিপুরা ওরফে মানিক। বণিক বার্তাকে তিনি বলেন, ‘প্রকল্পটির তালিকাভুক্ত উদ্যোক্তা হিসেবে প্রশিক্ষণ পান মংহ্লাশৈ। প্রকল্পের বরাদ্দ থেকে করা দুটি ঘর দীর্ঘদিন অসমাপ্ত অবস্থায় ছিল। কেন জানি এপ্রিলের মাঝামাঝিতে ঘর দুটি ভেঙে ফেলেন মিলু তঞ্চঙ্গ্যা। পরে ভেঙে দেয়া দুটি ঘরের সব জনিসপত্র আমাকে বুঝিয়ে দেন।’
জানতে চাইলে উদ্যোক্তা মংহ্লাশৈ মারমা বণিক বার্তাকে বলেন, ‘ওই দুটির ঘরের ফ্লোরসহ অন্যান্য কাজের জন্য শুরুতে উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা এহসানুল হক তাকে মাত্র ৩০ হাজার টাকা দিয়েছিলেন। তবে ওই টাকায় সংকুলান না হওয়ার কথা জানালে বাজেট আসেনি জানিয়ে মো. এহসানুল হক তাকে নিজের টাকা দিয়ে দুটি ঘর নির্মাণ করতে বলেন। উপজেলা কৃষি কর্মকর্তার কথায় বিশ্বাস রেখে মোটরসাইকেল বিক্রি করে পাওয়া ৬০ হাজার টাকা পুরোটাই ঘর নির্মাণকাজে বিনিয়োগ করেছি। এর পরও কাজ পুরোপুরি শেষ করতে পারিনি। বিষয়টি জানানোর পর অফিসের টাকায় ঘরের বাকি কাজ করে দেয়া হবে বলে জানান উপসহকারী কৃষি কর্মকর্তা মিলু তঞ্চঙ্গ্যা। বিষয়টি উপজেলা কৃষি অফিসে না জানাতেও বলেন তিনি। সবশেষ গত বছরের এপ্রিলের মাঝামাঝিতে ঘর দুটি ভেঙে সবকিছু নিয়ে যান। একই সঙ্গে এলাকার প্রভাবশালীদের মাধ্যমে তার কাছ থেকে সাদা কাগজে স্বাক্ষরও নিয়ে যান।’
তবে এসব বিষয় জানতে মুঠোফোনে একাধিকবার যোগাযোগ করা হলেও সাড়া দেননি কৃষি কর্মকর্তা মিলু তঞ্চঙ্গ্যা। তবে মংহ্লাশৈ মারমাকে ৩০ হাজার টাকা দেয়ার বিষয়টি স্বীকার করেছেন রোয়াংছড়ি উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা মো. এহসানুল হক।
তিনি বণিক বার্তাকে বলেন, ‘উপজেলায় চারজন উদ্যোক্তা রয়েছেন। এর মধ্যে লিরাগাঁওয়ে মংহ্লাশৈ মারমাকে বারবার তাগাদা দেয়ার পরও তিনি মাশরুম উৎপাদন করতে অপারগতা প্রকাশ করেন। এ কারণে মানিক ত্রিপুরাকে নয়, ভেঙে নেয়ার পর দুটি ঘরের সব কিছু নুয়ই মারমাকে বুঝিয়ে দেয়া হয়েছে। তাকে প্রশিক্ষণও দেয়া হয়েছে। তবে আবহাওয়া উষ্ণ হওয়ায় উৎপাদন বন্ধ রয়েছে।’
সদর উপজেলার উদ্যোক্তা বিজয় বড়ুয়া বণিক বার্তাকে বলেন, ‘আমি আগে থেকেই মাশরুম উৎপাদন করে আসছিলাম। আমাকে প্রকল্পভুক্ত দেখানো হলেও নতুন করে কোনো ঘর নির্মাণ করতে হয়নি। তবে উৎপাদন ও প্রদর্শনী ঘর নির্মাণ বাবদ আমাকে ২ লাখ টাকা দেয় সদর উপজেলা কৃষি কর্মকর্তার কার্যালয়। তারাও কিছু সরঞ্জাম ক্রয় করে দেয়। রোয়াংছড়ি উপজেলার খায়াম্রং পাড়া ও লিরাগাঁও পাড়ার উদ্যোক্তাদের মাশরুম উৎপাদন বন্ধ রয়েছে।’










