আত্মহত্যা প্রতিরোধ এবং মানসিক স্বাস্থ্যবিষয়ক সচেতনতা তৈরিতে কাজ করা সংগঠন আঁচল ফাউন্ডেশনের এক সমীক্ষায় এ চিত্র উঠে এসেছে। গতকাল রাজধানীতে আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে ‘শিক্ষার্থীদের আত্মহত্যা: ক্রমবর্ধমান সংকট’ শীর্ষক সমীক্ষার ফল তুলে ধরে সংগঠনটি। আত্মহত্যাগুলোর কারণ হিসেবে হতাশা, অভিমান, প্রেম, পারিবারিক টানাপড়েন, মানসিক অস্থিতিশীলতা, যৌন নির্যাতনের শিকার হওয়ার বিষয়গুলো উঠে এসেছে সমীক্ষায়।

দেশের শিক্ষার্থীদের মানসিক স্বাস্থ্য পরিস্থিতি নিয়ে ১৬৫টি স্থানীয় ও জাতীয় গণমাধ্যমে প্রকাশিত সংবাদ পর্যালোচনা করে প্রতি বছরের মতো ২০২৫ সালের আত্মহত্যার চিত্র বিশ্লেষণ করেছে আঁচল ফাউন্ডেশন। ২০২৫ সালে সারা দেশে মোট ৪০৩ জন স্কুল, কলেজ, বিশ্ববিদ্যালয় ও মাদ্রাসার শিক্ষার্থীর আত্মহত্যার তথ্য পেয়েছে তারা। ২০২৪ সালে সংখ্যাটি ছিল ৩১০।

গত বছর কলেজ পর্যায়ে ৯২ জন বা ২২ দশমিক ৮ শতাংশ, বিশ্ববিদ্যালয়ে ৭৭ জন বা ১৯ দশমিক ১০ শতাংশ এবং মাদ্রাসায় ৪৪ জন বা ১০ দশমিক ৭২ শতাংশ শিক্ষার্থী আত্মহত্যা করেছে।

বিশ্ববিদ্যালয় পর্যায়ে ৭৭ জন শিক্ষার্থীর মধ্যে ৪৪ জন সরকারি (পাবলিক) বিশ্ববিদ্যালয়ের, ১৭ জন বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের, মেডিকেল কলেজের ছয়জন ও ১০ জন জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয় ও বিভিন্ন অধিভুক্ত কলেজের শিক্ষার্থী।

আঁচল ফাউন্ডেশনের তথ্য অনুযায়ী, ২০২১ সালে ১০১ জন বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী, ২০২২ সালে ৫৩২ জন শিক্ষার্থী, ২০২৩ সালে ৫১৩ জন শিক্ষার্থী, ২০২৪ সালে ৩১০ জন শিক্ষার্থী আত্মহননের পথ বেছে নিয়েছিল। সরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের নারীর চেয়ে পুরুষ শিক্ষার্থীদের আত্মহত্যার হার ৫৯ শতাংশ বেশি।

লিঙ্গভিত্তিক বিশ্লেষণে দেখা যায়, ২০২৫ সালে আত্মহত্যাকারী শিক্ষার্থীদের মধ্যে ২৪৯ জন বা ৬১ দশমিক ৮ শতাংশ নারী, ১৫৪ জন বা ৩৮ দশমিক ২ শতাংশ পুরুষ। স্কুল পর্যায়ে ১৩৯ জন নারী ও ৫১ জন পুরুষ; কলেজে ৫০ জন নারী ও ৪২ জন পুরুষ আত্মহত্যা করেছেন। তবে বিশ্ববিদ্যালয় পর্যায়ে পুরুষ শিক্ষার্থীর সংখ্যা সামান্য বেশি; যেখানে ৪১ জন পুরুষের বিপরীতে ৩৬ জন নারী শিক্ষার্থী আত্মহত্যা করেছেন। মাদ্রাসায় ২৪ জন নারী ও ২০ জন পুরুষ আত্মহত্যা করেছেন।

তথ্য বিশ্লেষণে বলা হয়, মেয়েদের ক্ষেত্রে ধারণা করা যাচ্ছে, কৈশোরে মেয়েরা সামাজিক ও পারিবারিক চাপ, সম্পর্কগত টানাপড়েন এবং আবেগঘটিত সংকটে বেশি ভঙ্গুর হয়ে পড়ছে। আর উচ্চশিক্ষা পর্যায়ে পুরুষ শিক্ষার্থীর আত্মহত্যার ক্ষেত্রে ধারণা করা যাচ্ছে, ভবিষ্যৎ অনিশ্চয়তা, কর্মসংস্থান ও আত্মপরিচয়ের সংকট আত্মহত্যায় বড় ভূমিকা রেখেছে। সাইবার বুলিংয়ের কারণেও একজন নারী শিক্ষার্থী আত্মহত্যা করেছেন, যা ডিজিটাল নিরাপত্তা ও অনলাইন সহিংসতার নতুন মাত্রা তুলে ধরে বলে সমীক্ষা প্রতিবেদনে বলা হয়।

বিভাগভিত্তিক বিশ্লেষণে দেখা যায়, শিক্ষার্থীদের মধ্যে আত্মহত্যার প্রবণতা সবচেয়ে বেশি ঢাকা বিভাগে। ২০২৫ সালে আত্মহত্যাকারী শিক্ষার্থীদের ১১৮ জন বা ২৯ দশমিক ২৪ শতাংশ এ বিভাগের। জনসংখ্যার ঘনত্ব, নগরায়ণ, প্রতিযোগিতামূলক শিক্ষাব্যবস্থা এবং পারিবারিক বিচ্ছিন্নতা এ ক্ষেত্রে প্রভাব ফেলতে পারে বলে মনে করে আঁচল ফাউন্ডেশন।

আত্মহত্যাকারী শিক্ষার্থীদের মধ্যে চট্টগ্রাম বিভাগের ৬৩ জন, তথা ১৫ দশমিক ৬৩ শতাংশ, বরিশাল বিভাগের ৫৭ জন বা ১৪ দশমিক ৪ শতাংশ এবং রাজশাহী বিভাগের ৫০ জন বা ১২ শতাংশ।

সংবাদ সম্মেলনে উপস্থিত ছিলেন যুক্তরাজ্যের ন্যাশনাল হেলথ সার্ভিসের কনসালট্যান্ট ফরেনসিক সাইকিয়াট্রিস্ট ডা. আনিস আহমেদ, মনোরোগ বিশেষজ্ঞ ডা. সৈয়দ মাহফুজুল আলম, টাঙ্গাইল মেডিকেল কলেজের সহকারী পরিচালক ডা. মারুফ আহমেদ খান, আঁচল ফাউন্ডেশনের সভাপতি তানসেন রোজ ও প্রোগ্রাম কো-অর্ডিনেটর সোহেল মামুন।

শিক্ষার্থীদের আত্মহত্যা মোকাবেলায় আঁচল ফাউন্ডেশনের বেশ কয়েকটি প্রস্তাব তুলে ধরা হয় সংবাদ সম্মেলনে। সেগুলো হলো সব শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানকে মনোসেবা এবং শিক্ষার্থীদের মেন্টাল হেলথ স্ক্রিনিংয়ের আওতায় আনা; মানসিক চাপ, বিষণ্নতা বা উদ্বেগের চিহ্ন শনাক্ত করতে শিক্ষক ও সহপাঠীদের প্রশিক্ষণ; আত্মহত্যা ও মানসিক সমস্যার ওপর সামাজিক স্টিগমা কমাতে সংবাদ, পোস্টার ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রচারণা চালানো; প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষকদের সাইকো সোশ্যাল প্রশিক্ষণের আওতায় আনা; অভিভাবকদের সঙ্গে শিক্ষার্থীদের যোগসংযোগ ঘটাতে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোতে নিয়মিত মানসিক স্বাস্থ্য সচেতনতাবিষয়ক কর্মসূচির আয়োজন করা।