হালদা নদীতে মৌসুমের শেষের দিকে নদীতে কার্পজাতীয় মা-মাছ (রুই, কাতলা, মৃগেল) ডিম ছাড়ায় বাজারে চাহিদা কম। ফলে ডিম থেকে উৎপাদিত রেণুর কেজি বিক্রি হচ্ছে ৬০ থেকে ৯০ হাজার টাকা। অথচ বিগত বছরগুলোয় ২ লাখ টাকা পর্যন্তও প্রতি কেজি রেণু বিক্রি হয়েছে।

বিভিন্ন হ্যাচারিতে দায়িত্বপ্রাপ্তদের দেয়া তথ্যমতে, হালদা থেকে পাওয়া কার্পজাতীয় মাছের প্রতি কেজি ডিম ভালোভাবে কুয়ায় আধুনিক প্রযুক্তিতে ফোটানো গেলে ২০-২৫ গ্রাম রেণু পাওয়া যায়। এক কেজি রেণু উৎপাদন করতে হলে ৪৮-৫০ কেজি ডিমের প্রয়োজন পড়ে। আর এক কেজি রেণু থেকে চার থেকে সাড়ে চার লাখ পিস মাছের জোগান পাওয়া সম্ভব। সব মিলিয়ে এক কেজি রেণু থেকে আড়াই লাখ পিস মাছ পাওয়া যায়।

এদিকে গত শুক্রবার থেকে রেণু বিক্রি শুরু হলেও ক্রেতা কম থাকায় দাম কমিয়ে তা বিক্রি করতে বাধ্য হচ্ছেন বিক্রেতারা। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, হালদায় মা-মাছ দেরিতে ডিম ছাড়ায় ক্রেতারা এবার বিকল্প জায়গা থেকে রেণু সংগ্রহ করেছেন। তাই চাহিদা কমে যাওয়ায় দাম অস্বাভাবিক কমে গেছে। 

মদুনাঘাট মৎস্য হ্যাচারির দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তা মোহাম্মদ হাসান আহসানুল কবির বণিক বার্তাকে বলেন, ‘মদুনাঘাট হ্যাচারিতে সব মিলিয়ে ১৭ কেজির মতো রেণু উৎপাদন হয়েছে। হ্যাচারি থেকে প্রতি কেজি সর্বনিম্ন ৬০ হাজার থেকে সর্বোচ্চ ৯০ হাজার টাকায় বিক্রি করেছি। কিছু ভালো রেণু আছে। গত বছর ডিম কম থাকলেও প্রায় ২ লাখ টাকা পর্যন্ত সর্বোচ্চ বিক্রি হয়েছিল। আর এবার মা-মাছের দেরিতে ডিম দেয়া এবং ঈদের কারণে রেণুর দাম কমেছে।’

চট্টগ্রাম জেলা মৎস্য অধিদপ্তরের তথ্যমতে, মদুনাঘাট মৎস্য হ্যাচারিতে ১ হাজার ২৮০ কেজি, মাছুয়াঘোনা হ্যাচারিতে ২ হাজার ৪০০, শাহ্ মাদারী মৎস্য হ্যাচরিতে ১ হাজার ৯০০ ও মোবারকখীল মৎস্য হ্যাচারিতে প্রায় ১ হাজার ৫৪০ কেজিসহ মোট ৭ হাজার ১২০ কেজি ডিম ফুটিয়ে রেণু উৎপাদন হয়েছে। এছাড়া রাউজান উপজেলার পশ্চিম গহিরায় বেসরকারি সংস্থা ইন্টিগ্রেটেড ডেভেলপমেন্ট ফাউন্ডেশনের (আইডিএফ) হ্যাচারি থেকে সংগ্রহ করা হয়েছে ১ হাজার ৩০০ কেজি ডিম। এছাড়া ব্যক্তিগত উদ্যোগে আরো প্রায় চার হাজার কেজি ডিম ফুটিয়ে রেণু উৎপাদনের কাজ চলছে।

ব্যবসায়ীরা বলছেন, হালদায় মা-মাছের ডিম সংগ্রহের জন্য আগাম যে প্রস্তুতি সরকারি বা বেসরকারিভাবে থাকার কথা ছিল এবার সেভাবে করা হয়নি। ফলে পর্যাপ্ত কুয়া ও ডিম সংরক্ষণের ব্যবস্থা না থাকায় মূল জেলেরা ডিম সংগ্রহ করেননি। যারা যতটুকু সংগ্রহ করেছেন অদক্ষতার কারণে অনেক ডিম বা রেণু নষ্ট হয়েছে। তাছাড়া যারা মাছ চাষ করেন তারা আগেই বিকল্প জায়গা থেকে সংগ্রহ করায় হালদার রেণুর দাম অর্ধেকে নেমেছে।

হালদাপারের ডিম সংগ্রহকারী ও রেণু বিক্রেতা কামাল সওদাগর বলেন, ‘গত বছর বা তার আগে আমরা এক কেজি রেণু দেড়-দুই লাখ টাকা পর্যন্ত বিক্রি করেছি। কিন্তু এ বছর কেউ কেউ ৫০ হাজার টাকায়ও বিক্রি করেছেন। একটু ভালো মানের রেণু ১ লাখ টাকার কাছাকাছি দামে বিক্রি হয়েছে।’

চট্টগ্রাম জেলা মৎস্য কর্মকর্তা ফারহানা লাভলী বণিক বার্তাকে বলেন, ‘সরকারি হ্যাচারিগুলোর রেণু গত শুক্রবার বিক্রি শুরু হয়েছে। দাম গত বছর থেকে অনেক কম। সরকারি যে চারটি হ্যাচারি আছে সেগুলো আরো আধুনিকায়ন, কুয়ার পরিমাণ বৃদ্ধি ও রেণু উৎপাদনের ধারণক্ষমতা বৃদ্ধিতে কাজ শুরু করেছি।’ আগামী বছরে এর ফলাফল পাওয়া যাবে বলে জানান তিনি।

সার্বিক বিষয়ে কথা হয় হালদা গবেষক, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের হালদা রিভার রিসার্চ ল্যাবরেটরির কো-অর্ডিনেটর ও প্রাণিবিদ্যা বিভাগের চেয়ারম্যান ড. মনজুরুল কিবরিয়ার সঙ্গে। বণিক বার্তাকে তিনি বলেন, ‘বাজারে চাহিদা কিছুটা কম থাকায় রেণুর দাম এ বছর কম বলে শুনেছি। যে পরিমাণ ডিম সংগ্রহ করা হয়েছিল সেগুলো কূপ ও হ্যাচারি সংকটের কারণে রক্ষা করা সম্ভব হয়নি। সেজন্য ডিম সংগ্রহ বাড়ানো কিংবা রেণু উৎপাদনে সংকট মোকাবেলায় সরকারিভাবে বিশেষ কিছু পদক্ষেপ নেয়া জরুরি হয়ে পড়েছে।’