তৃণমূল পর্যায়ের স্বাস্থ্যসেবা কেন্দ্র থেকে শুরু করে বড় হাসপাতালগুলোয় সৌরবিদ্যুৎ ব্যবহারের মাধ্যমে স্বাস্থ্য খাতকে এ উদ্যোগের অগ্রভাগে রাখতে চায় সরকার। স্বাস্থ্য প্রতিমন্ত্রী ড. এম এ মুহিত বলেছেন, স্বাস্থ্য খাতে নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ সরবরাহ শুধু সাধারণ সেবা নয়, এটি অপরিহার্য প্রয়োজন এবং সরাসরি স্বাস্থ্য নিরাপত্তার সঙ্গে জড়িত।
আজ সকালে বাংলাদেশ চীন মৈত্রী সম্মেলন কেন্দ্রে চলমান সোলার এক্সপোয় ‘সরকারি খাতে ভবনের ছাদে সৌরবিদ্যুৎ সম্প্রসারণে দৃষ্টান্ত স্থাপন’ শীর্ষক প্যানেল আলোচনায় এসব কথা বলেন তিনি। সরকারের বিদ্যুৎ বিভাগ ও ইনফ্রাস্ট্রাকচার ডেভেলপমেন্ট কোম্পানি লিমিটেড (ইডকল) এ আলোচনার আয়োজন করে।
স্বাস্থ্য প্রতিমন্ত্রী বলেন, সারা দেশে তৃণমূল পর্যায়ে সরকারের প্রায় ১৫ হাজার স্বাস্থ্যসেবা কেন্দ্র রয়েছে। এছাড়া জেলা সদর হাসপাতাল, মেডিকেল কলেজ ও বিশেষায়িত প্রতিষ্ঠান মিলিয়ে বড় স্বাস্থ্য অবকাঠামো রয়েছে। হাসপাতালের বেশির ভাগ কার্যক্রম দিনের ব্যস্ত সময়ে চলে, যা সৌরবিদ্যুৎ উৎপাদনের সময়ের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ। অস্ত্রোপচার কক্ষ, জরুরি সেবা, নিবিড় পরিচর্যা কেন্দ্র এবং টিকার সংরক্ষণব্যবস্থা সচল রাখতে ডিজেল নির্ভরতা কমিয়ে পরিবেশবান্ধব সৌরবিদ্যুৎ ব্যবহারে সরকার বদ্ধপরিকর।
তিনি বলেন, আগামী ছয় মাস থেকে এক বছরের মধ্যে সব স্বাস্থ্য অবকাঠামোর ভবনগত অবস্থা ও জ্বালানির চাহিদা যাচাই করা হবে। একইসঙ্গে হাসপাতালগুলোয় সৌরবিদ্যুৎ প্রকল্পে বিনিয়োগের জন্য বেসরকারি উদ্যোক্তাদের আহ্বান জানান তিনি।
প্রতিমন্ত্রী বলেন, হাসপাতাল এক দিনের জন্যও বন্ধ রাখা সম্ভব নয়। তাই এসব প্রতিষ্ঠানে বিদ্যুৎ বিল পরিশোধের নিশ্চয়তা রয়েছে। তবে বিনিয়োগকারীদের নিয়মিত রক্ষণাবেক্ষণ নিশ্চিত করতে হবে, অগ্নিকাণ্ড এড়াতে সনদপ্রাপ্ত যন্ত্রাংশ ব্যবহার করতে হবে এবং প্রত্যন্ত এলাকার সৌর প্যানেল চুরি বা ক্ষতির হাত থেকে রক্ষায় নিরাপত্তাব্যবস্থা রাখতে হবে।
আলোচনায় প্রধানমন্ত্রীর প্রতিমন্ত্রী পদমর্যাদার উপদেষ্টা মাহ্দী আমিন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে পরিবেশবান্ধব জ্বালানি সম্প্রসারণের পরিকল্পনা তুলে ধরেন। তিনি বলেন, দেশে স্কুল, কলেজ, মাদ্রাসা ও বিশ্ববিদ্যালয় মিলিয়ে লক্ষাধিক শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান রয়েছে। আগামী ছয় মাসের মধ্যে কোন কোন প্রতিষ্ঠানের ছাদ সৌরবিদ্যুৎ স্থাপনের উপযোগী এবং কোথায় অতিরিক্ত জমি রয়েছে, তা যাচাই করে চূড়ান্ত তালিকা করা হবে।
মাহ্দী আমিন বলেন, দেশের ৫০টির বেশি সরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের মধ্যে ৩০টিরও বেশি বিশ্ববিদ্যালয়ে সৌরবিদ্যুৎ প্রকল্প বাস্তবায়নের কাজ প্রক্রিয়াধীন রয়েছে। তিনি বলেন, এ খাতে স্বনির্ভর হতে হলে যন্ত্রাংশ ও উপকরণ তৈরির স্থানীয় শিল্প গড়ে তুলতে হবে। দেশের তরুণ জনগোষ্ঠীকে কাজে লাগিয়ে সৌরবিদ্যুৎ খাতের দক্ষ কর্মী তৈরি করতে শিক্ষাব্যবস্থাকেও এ পরিবর্তনের সঙ্গে যুক্ত করা হচ্ছে।
বরেন্দ্র বহুমুখী উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের (বিএমডিএ) চেয়ারম্যান কৃষিবিদ মো. হাসান জাকির তুহিন জানান, আগামী এক বছরের মধ্যে বরেন্দ্র অঞ্চলের প্রায় ১৭ হাজার সেচ পাম্পকে সৌরবিদ্যুতের আওতায় আনা হবে। শুষ্ক মৌসুমের বাইরে পাম্পগুলো অব্যবহৃত থাকার সময় এসব সৌর প্যানেল থেকে জাতীয় গ্রিডে ৪৫০ থেকে ৮০০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ সরবরাহ করা সম্ভব হবে। এতে বছরে প্রায় ১৫০ কোটি টাকার বিদ্যুৎ বিল সাশ্রয় হবে।
সরকারি অবকাঠামোয় সৌরবিদ্যুৎ উৎপাদনের সম্ভাবনা তুলে ধরে ইডকলের নবায়নযোগ্য জ্বালানি বিভাগের প্রধান এনামুল করিম পাভেল বলেন, সরকারি ভবনগুলোর ছাদ থেকে প্রায় ২ হাজার মেগাওয়াট সৌরবিদ্যুৎ উৎপাদন সম্ভব। সরকার এরই মধ্যে অধ্যাদেশ জারি করে এ খাতের নীতিমালা সহজ করেছে। এছাড়া পরিচালন ব্যয়ভিত্তিক মডেলের আওতায় বেসরকারি বিনিয়োগকারীদের জন্য শতভাগ অর্থ পরিশোধের নিশ্চয়তা ও সহজ শর্তে দীর্ঘমেয়াদি অর্থায়নের ব্যবস্থা করা হচ্ছে।
বেসরকারি উদ্যোক্তাদের পক্ষে সোল্যারিকের পরিচালক প্রকৌশলী নাজনীন আক্তার বলেন, দীর্ঘমেয়াদি বিনিয়োগ সুরক্ষায় ঘন ঘন পরিবর্তন না করে স্থিতিশীল ও বিনিয়োগবান্ধব নীতিমালা নিশ্চিত করতে হবে। দিনের বেলায় সৌরবিদ্যুতের সর্বোচ্চ উৎপাদনের সময়ে লোডশেডিংয়ের ঝুঁকি এড়ানো এবং আন্তর্জাতিক তহবিল আনার ক্ষেত্রে ব্যাংক গ্যারান্টির শর্ত সহজ করার ওপরও তিনি গুরুত্ব দেন।
অনুষ্ঠানের প্যানেল আলোচনায় আরো বক্তব্য দেন বিদ্যুৎ বিভাগের সচিব মিরানা মাহরুখ। বাংলাদেশ পল্লী বিদ্যুতায়ন বোর্ডের (আরইবি) চেয়ারম্যান মেজর জেনারেল মো. মাহবুবুল হক আলোচনা সঞ্চালনা করেন।
অনুষ্ঠানে দেশী-বিদেশী বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের প্রতিনিধি, সৌরবিদ্যুৎ খাতের উদ্যোক্তা ও ব্যবসায়ী, সরকারি-বেসরকারি খাতের শীর্ষ কর্মকর্তা, বিনিয়োগকারী এবং নবায়নযোগ্য জ্বালানি বিশেষজ্ঞসহ বিভিন্ন পেশার প্রতিনিধিরা উপস্থিত ছিলেন।










