রাজশাহী দুগ্ধ ও গবাদি উন্নয়ন খামারের সম্পদের পরিমাণ প্রায় হাজার কোটি টাকার, কিন্তু এ বিশাল সম্পদের পাহারাদার মাত্র একজন। তার সঙ্গে দৈনিক মজুরিভিত্তিক তিন শ্রমিক দিয়ে খামারের একটি অংশ পাহারা দেয়া গেলেও বিশাল চারণভূমি রয়ে গেছে অরক্ষিত। এ সুযোগে সীমানাপ্রাচীরের ১৮টি স্থানের ইট খুলে নিয়ে গেছে দুর্বৃত্তরা। এসব ফোকর দিয়ে বহিরাগতরা অবাধে প্রবেশ করছে চারণভূমিতে। বেড়া দিয়ে কোনো রকমে ফোকরগুলো আটকে রাখা হয়েছে। তা সত্ত্বেও বহিরাগতরা খামারে ঢুকে ঘাস কেটে নিয়ে যাচ্ছে। সঙ্গে মালপত্রও চুরি হচ্ছে।
আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর একাধিক সূত্র বলছে, বিশাল খামার এলাকার দক্ষিণে পদ্মা নদী। আর পদ্মার ওপারে ভারতীয় সীমান্ত। খামার থেকে গোদাগাড়ী মডেল থানা ২০ কিলোমিটার দূরে। পাশের প্রেমতলি পুলিশ তদন্ত কেন্দ্রের দূরত্বও ১২ কিলোমিটার। রাতের বেলা খামারে সেভাবে পাহারা বসানো যাচ্ছে না। এরই সুযোগ নিচ্ছে মাদক চোরাচালানিসহ অপরাধীরা।
খামারসংশ্লিষ্টরা বলছেন, উপজেলার রাজাবাড়ীতে রাজশাহী-চাঁপাইনবাবগঞ্জ মহাসড়কের এক পাশে অবস্থান মূল গো-খামার। মহাসড়কের বিপরীত দিকে চারণভূমি। সব মিলিয়ে প্রায় ১৩২ একরের বিশাল এলাকাজুড়ে গড়ে উঠেছে খামারটি। রয়েছে হাজার কোটি টাকার সম্পদ। চারজন মিলে কেবল গো-খামার ও ঘাসের খেত পাহারা দেন পালা করে। দিনের আলোয় কোনোরকমে সামলে নিলেও রাতে পুরোটাই হয়ে পড়ে অরক্ষিত। চারণভূমি পাহারার মতো লোকবল নেই। ফলে সেটি একেবারেই অরক্ষিত।
খামারের নিরাপত্তায় জনবল নিয়োগের অনুরোধ জানিয়েছে কর্তৃপক্ষ। একই সঙ্গে ক্যাম্পসহ সশস্ত্র আনসার সদস্য মোতায়েনের আবেদনও পাঠানো হয়েছে প্রাণিসম্পদ অধিদপ্তরে। ২০২০ সালের ৮ নভেম্বর এ আবেদন পাঠান খামার ব্যবস্থাপক মহাম্মদ আব্দুল হামিদ। এতে উল্লেখ করা হয়, কর্মকর্তা-কর্মচারীদের বেতন-ভাতার প্রায় ২০ লাখ টাকা আসে খামারে। দুধ, ঘাস, গোবর এবং বাতিলকৃত গবাদিপশু বিক্রির প্রায় ২৫ লাখ টাকা জমা হয় ট্রেজারিতে। পুরো আর্থিক লেনদেনে নিরাপত্তাহীনতায় থাকেন খামারসংশ্লিষ্টরা।
তাছাড়া দাপ্তরিক কাজ ও গো-খাদ্য টেন্ডারসহ বিভিন্ন নিলাম হয় এখানেই। ওই সময় বহিরাগতরা খামার চত্বরে প্রবেশ করে বিশৃঙ্খল পরিস্থিতি সৃষ্টি করে। এতে হুমকির মুখে পড়েন খামারের কর্মকর্তা-কর্মচারীরা। থানা ও ফাঁড়ি দূরে হওয়ায় কোনো ঘটনার খবর পেয়ে পুলিশ পৌঁছার আগেই অপরাধীরা বেরিয়ে যায়। এমন ঘটনা ঘটছে অহরহ। থানায় অভিযোগ দিয়েও প্রতিকার মেলে না।
খোঁজ নিয়ে জানা যায়, রাজশাহী দুগ্ধ ও গবাদি উন্নয়ন খামার প্রতিষ্ঠা করা হয় ১৯৬৮ সালে। তখন প্রতিষ্ঠানটির নাম ছিল এস্টাবলিস্টমেন্ট অব ডেইরি অ্যান্ড ক্যাটল ব্রিডিং ফার্ম। ১৯৮৪ সালে খামারটি বর্তমান নাম পায়। ওই সময় খামারে পাহারাদারের পদ ছিল তিনটি। ১৯৯২ সালে পাহারাদার ইসাহাক আলী খান মারা যান। তখন পদ নেমে আসে দুটিতে। এরপর ২০১৪ সালে অবসরে যান আরেক পাহারাদার লুত্ফর রহমান। সেই পদে নতুন করে আর লোকবল নিয়োগ হয়নি। ফলে স্থায়ী পাহারাদার নেমে আসে একজনে। জানা গেছে, দুটি প্রকল্প রাজস্ব খাতে গেলেও সেখান থেকে পাহারাদার পদে জনবল পায়নি রাজশাহীর গো-খামার। ফলে দৈনিক মজুরিভিত্তিক তিনজন শ্রমিক লাগানো হয়েছে খামার পাহারায়। যদিও পালাক্রমে খামার পাহারায় অন্তত নয়জন লোকের দরকার।
খামারের তথ্য বিশ্লেষণে জানা যায়, তিনজন কর্মকর্তা, ২৫ জন কর্মচারী এবং ২৫ জন দৈনিক হাজিরাভিত্তিক শ্রমিক মিলিয়ে খামারে এখন কর্মরত ৫৩ জন। এর মধ্যে স্থায়ী বা রাজস্ব খাতে ৪৯ পদের বিপরীতে কর্মরত ২৫ জন। এ খাতের বিভিন্ন ক্যাটাগরির ২৪টি পদ শূন্য। দীর্ঘদিন নতুন স্থায়ী জনবল নিয়োগ নেই।
অন্যদিকে দৈনিক হাজিরাভিত্তিক ২৯ পদের বিপরীতে কর্মরত ২৫। এ খাতের পদ খালি তিনটি। ১৯৯৬ সালের পর থেকে দৈনিক হাজিরাভিত্তিক শ্রমিক নিয়োগও বন্ধ। মাঝে আধুনিকীকরণ প্রকল্প থেকে ছয়জন এবং দ্বিতীয় প্রাণিসম্পদ উন্নয়ন প্রকল্প থেকে ৩৩ জন জনবল এসেছে খামারে। যদিও অস্থায়ী এ রাজস্ব খাতের পদ খালি ৪৮টি।
খামারের দৈনিক মজুরিভিত্তিক শ্রমিক হিসেবে ১৯৮৪ সালে যোগদান করেন আসলাম উদ্দিন। তিনি বলেন, প্রায় ১৬ বছর ধরে তিনি খামারের স্থায়ী পাহারাদার। ভোর ৬টা থেকে দুপুর ২টা পর্যন্ত একজন পাহারা দেন।
আরেকজন পাহারা দেন বেলা ২টা থেকে রাত ১০টা পর্যন্ত। বাকি দুজন রাত ১০টা থেকে ভোর ৬টা পর্যন্ত পাহারায় থাকেন। দিনের বেলা বাইসাইকেলে পুরো এলাকায় নজরদারি করা যায়, কিন্তু রাতে হেঁটেই পাহারা দিতে হয়। এটি খুবই কষ্টসাধ্য। মাঝেমধ্যে পাহারাদারের দায়িত্ব পালন করেন আরেক দৈনিক মজুরিভিত্তিক শ্রমিক রবীন্দ্রনাথ সরকার।
দুগ্ধ ও গবাদি উন্নয়ন খামার শ্রমিক ট্রেড ইউনিয়নের সাবেক সাধারণ সম্পাদক বলেন, ‘খামারে স্থায়ী পাহারাদারের পদ মাত্র দুটি। একজন অবসরে গেছেন। রয়েছেন আরেকজন। তার সঙ্গে তিনজন দৈনিক মজুরিভিত্তিক শ্রমিক পাহারাদারের কাজ করেন। তারা কেবল খামার চত্বরই পাহারা দেন। আগে চারণভূমিতেও দুজন পাহারাদার ছিলেন। লোকবল সংকট থাকায় এখন নেই।’
এ বিষয়ে রাজশাহী দুগ্ধ ও গবাদি উন্নয়ন খামারের উপপরিচালক ডা. আতিকুর রহমান বলেন, ‘খামার এবং গো-চারণভূমি দুটি এলাকায়। সীমিত জনবল দিয়ে খামার ও ঘাসের খেত পাহারা দেয়া হচ্ছে কোনো রকমে, কিন্তু লোকবল সংকটে গো-চারণভূমি পাহারা দেয়া যাচ্ছে না। ফলে সেখানকার সীমানাপ্রাচীরের ১৮টি স্থানের ইট খুলে নিয়ে গেছে দুর্বৃত্তরা। এসব ফোকর দিয়ে বহিরাগতরা অবাধে প্রবেশ করে চারণভূমিতে। বেড়া দিয়ে কোনো রকমে ফোকরগুলো আটকে রাখা হয়েছে। তা সত্ত্বেও বহিরাগতরা খামারে ঢুকে ঘাস কেটে নিয়ে যাচ্ছে। বিভিন্ন মালও চুরি হচ্ছে। এসব অপরাধ আগের চেয়ে কিছুটা কমলে জনবল সংকটে তা নির্মূল করা যায়নি। জনবল নিয়োগসহ আনসার ক্যাম্প স্থাপন করা গেলে অনেকাংশে খামারের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা যাবে।’










