শিক্ষকদের উদাসীনতাকেই এর জন্য দায়ী করছেন অভিভাবকরা। একইভাবে পাশের চান্দুয়া-সমসকাটি বালিকা বিদ্যালয়েও সবাই অকৃতকার্য হয়েছে। এ বছর যশোর বোর্ডের ১১টি প্রতিষ্ঠানে পাসের হার শূন্য। গত এক যুগে এমন প্রতিষ্ঠানের সংখ্যা অনেক। বছরের পর বছর এ ব্যর্থতা চললেও বোর্ডের দৃশ্যমান ব্যবস্থা না থাকায় শিক্ষা ব্যবস্থার জবাবদিহিতা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে।
সরজমিনে দেখা গেছে, বাইরে থেকে হেলাঞ্চি কৃষ্ণবাটি বালিকা বিদ্যালয়ের লাল আর ধূসর রঙের চারতলা ভবন দেখে যে কারো মনে হবে, এটি আধুনিক বিদ্যাপীঠ। প্রায় ৩ কোটি টাকা ব্যয়ে নির্মিত এ ভবন দাঁড়িয়ে আছে শিক্ষাদানের এক বিশাল প্রতিশ্রুতি নিয়ে। কিন্তু এর ভেতরের দৃশ্য একেবারেই উল্টো। শ্রেণীকক্ষগুলো যেন একেকটি সুনসান নীরবতার প্রতীক। জানা গেছে, প্রতিষ্ঠানটিতে পাঠদানের জন্য সরকারি বেতন-ভাতা তুলছেন নয়জন শিক্ষক। অথচ মাধ্যমিকে শিক্ষার্থীর সংখ্যা ৩০ জনেরও কম। এবার এসএসসি পরীক্ষায় এ বিদ্যালয় থেকে অংশ নিয়েছিল একজন পরীক্ষার্থী। কিন্তু সদ্য প্রকাশিত ফলাফলে দেখা গেছে, সেই পরীক্ষার্থীও অকৃতকার্য হয়েছে।
এর কারণ হিসেবে বিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ বরাবরের মতোই ঢাল বানাচ্ছে শিক্ষার্থীদের। প্রতিষ্ঠানটির ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষক আব্দুর রহমান বলেন, ‘আশপাশে আরো দুটি প্রতিষ্ঠান থাকাতে এখানে কেউ ভর্তি হয় না। আর যারা ভর্তি হয় তারাও নিয়মিত আসে না। তাই এ পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছে।’ তবে অভিভাবক ও স্থানীয়দের অভিযোগ, শিক্ষকদের উদাসীনতা ও নিয়মিত ক্লাস না করানোর সঙ্গে স্বেচ্ছাচারিতার কারণে ফলাফলে বিদ্যালয়টির এ অবস্থা।
নাম প্রকাশ না করার শর্তে বিদ্যালয়টির পাশের কয়েকজন দোকানি জানান, হেলাঞ্চি কৃষ্ণবাটি বালিকা বিদ্যালয়ের আধা কিলোমিটার দূরে হেলাঞ্চি কৃষ্ণবাটি মাধ্যমিক বিদ্যালয়। সেখানে আধুনিক কোনো ভবন নেই। ভাঙাচোরা টিনের ছাউনি আর আধাপাকা ভবন। তবুও শিক্ষার্থীরা ওই স্কুলমুখী। কারণ ওই স্কুলের পড়াশোনার মান ভালো।
জানা গেছে, ২০২৫ সালে হেলাঞ্চি কৃষ্ণবাটি বালিকা বিদ্যালয় থেকে এসএসসিতে অংশ নেয় পাঁচজন। এর আগের বছরগুলোতেও চার-পাঁচজন করে অংশ নিয়েছে। এছাড়া বিদ্যালয়টির প্রতিটি শ্রেণীতে বর্তমানে চার থেকে সর্বোচ্চ ১০ জন পর্যন্ত পড়াশোনা করছে। বিদ্যালয়টির এ অবস্থা সম্পর্কে স্থানীয় কয়েকজনের দাবি, বিগত সময়ে বিদ্যালয়টিতে পড়াশোনার চেয়ে রাজনীতি চলেছে বেশি। অনেক শিক্ষক ও কর্মচারী বিগত সরকারের স্থানীয় এমপি ও শীর্ষনেতাদের কর্মী ছিলেন। তারা সভা-সমাবেশ নিয়ে ব্যস্ত থাকতেন। নিয়মিত পাঠদান না হওয়াতে শিক্ষার্থীরা এ বিদ্যালয়বিমুখ হয়ে পড়েছে।
চাকচিক্য ভবন না থাকলেও শূন্য পাসের দশা একই উপজেলার ভবদহ পাড়ের চান্দুয়া-সমসকাটি মাধ্যমিক বালিকা বিদ্যালয়েও। ফাঁকা বিলের ভেতরে স্থাপিত বিদ্যালয়টির মাঠে থই থই করছে পানি। বিদ্যালয়ে ১৪ জন শিক্ষক থাকলেও পড়াশোনা করে ৫০ জন শিক্ষার্থী। এবার এসএসসি পরীক্ষায় তিনজন অংশ নিয়েছিল, তবে উত্তীর্ণ হয়নি কেউ।
শতভাগ ফেলের বিষয়ে বিদ্যালয়টির প্রধান শিক্ষক সুজিত বালা বলেন, ‘বিদ্যালয় থেকে এবার তিনজন এসএসসি পরীক্ষা দিয়েছিল। তাদের মধ্যে একজন নিয়মিত ও দুজন অনিয়মিত শিক্ষার্থী। তাদের কেউ পাস করতে পারেনি।’ তিনি আরো বলেন, ‘বিদ্যালয়ে ১৪ জন শিক্ষক ও ছয়জন কর্মচারী কর্মরত আছেন। এখানে শিক্ষক-কর্মচারীর অভাব নেই। বছরের বেশির ভাগ সময় স্কুল মাঠে পানি জমে থাকে। অনেক সময় পানি শ্রেণীকক্ষে জমে থাকে।’ বিদ্যালয়ের এ পরিস্থিতিতে অভিভাবকরা এখানে সন্তান পাঠাতে চান না বলে দাবি করেন তিনি।
শুধু এ দুই বিদ্যালয় নয়; এবার যশোর মাধ্যমিক ও উচ্চ মাধ্যমিক শিক্ষা বোর্ডের অধীনে শতভাগ ফেল করা প্রতিষ্ঠানের সংখ্যা ১১। গত এক যুগে বোর্ডটিতে ৫০টির বেশি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে পাসের হার শূন্য ছিল। বোর্ড কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, এসএসসি ও এইচএসসি মিলিয়ে এ সংখ্যা শতাধিক।
অনুসন্ধানে দেখা গেছে, এসব প্রতিষ্ঠানের কয়েকটির অবকাঠামো অত্যন্ত নাজুক হলেও অনেক প্রতিষ্ঠানেই সরকারি অনুদানে গড়ে উঠেছে বহুতল ভবন। শিক্ষক-কর্মচারীদের নিয়মিত বেতন-ভাতা দেয়া হলেও শিক্ষার মানোন্নয়নে তাদের ভূমিকা যেন অদৃশ্য।
অভিযোগ রয়েছে, শিক্ষকদের উদাসীনতা ও অপেশাদার আচরণের কারণে অভিভাবকরা এখন আর তাদের সন্তানদের এসব প্রতিষ্ঠানে ভর্তি করাতে চান না। ফলে দিন দিন শিক্ষার্থী সংকটে ভুগছে প্রতিষ্ঠানগুলো।
বার বার শূন্য পাসের তালিকায় নাম উঠলেও যশোর শিক্ষা বোর্ড কর্তৃপক্ষ এখন পর্যন্ত এসব প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে কোনো দৃশ্যমান ব্যবস্থা নেয়ার নজির নেই। মাঝেমধ্যে শোকজ করা হলেও পরবর্তী সময়ে ব্যবস্থা নেয়নি একটি প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধেও। ফলে প্রতি বছর একই ঘটনার পুনরাবৃত্তি ঘটছে।
এ বিষয়ে সচেতন নাগরিক কমিটি (সনাক) যশোরের সভাপতি ও শিক্ষাবিদ পাভেল চৌধুরী বলেন, ‘এটা আসলে অবাক করার বিষয়। বছরের পর বছর পড়িয়ে একটি প্রতিষ্ঠানে যখন কেউ পাস না করে, তখন শিক্ষকদের নৈতিকতা নিয়েও প্রশ্ন ওঠে। এর বড় কারণ হলো শিক্ষা খাতে জবাবদিহিতা নেই। এখানে শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নিলেই যে সমস্যার সমাধান হবে, এমনটি নয়। তবে সুষ্ঠু শিক্ষা ব্যবস্থা দরকার।’ শিক্ষাদানের কাঠামো পরিবর্তনের পরামর্শ দেন এ শিক্ষাবিদ।
ফল খারাপ করা বিদ্যালয়গুলোর বিষয়ে জানতে চাইলে যশোর শিক্ষা বোর্ডের সচিব প্রফেসর আব্দুল মতিন বণিক বার্তাকে বলেন, ‘শতভাগ অনুত্তীর্ণ প্রতিষ্ঠানগুলোর একাডেমিক দুর্বলতা কিংবা শিক্ষকদের গাফিলতির প্রমাণ পাওয়া গেলে বিধি অনুযায়ী ব্যবস্থা নেয়া হবে। বিষয়টি এবার গুরুত্বের সঙ্গে দেখছে শিক্ষা বোর্ড। প্রয়োজনে সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানের স্বীকৃতি বাতিলের বিষয়ও বিবেচনা করা হবে।’










