ঘনবসতিপূর্ণ এলাকায় কয়লা ব্যবহার করে বিদ্যুৎকেন্দ্র তৈরির উদ্যোগ নিয়েছে এমন দেশগুলোর তালিকায় এশিয়ার শীর্ষে রয়েছে বাংলাদেশ। অঞ্চলভিত্তিক জরিপে বাণিজ্যিক নগরী চট্টগ্রাম রয়েছে এ তালিকার সবার ওপরে। ফিনল্যান্ডভিত্তিক সংস্থা সেন্টার ফর রিসার্চ অন এনার্জি অ্যান্ড ক্লিন এয়ারের (সিআরইএ) একটি প্রতিবেদনে এসব তথ্য উঠে এসেছে।
ভবিষ্যতে দেশের অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড বিস্তৃত হবে এমন পরিকল্পনা সামনে রেখে দেড় ডজন কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের অনুমোদন দেয়া হয়। কিন্তু পরিবেশের ওপর জীবাশ্ম জ্বালানির ভয়াবহ প্রভাবের কথা বিবেচনায় নিয়ে দীর্ঘদিন ধরেই এসব প্রকল্প থেকে বেরিয়ে আসার সুপারিশ করছে বিভিন্ন দেশী ও আন্তর্জাতিক সংস্থা। নানা গবেষণায়ও উঠে আসছে পরিবেশের ওপর এসব বিদ্যুৎকেন্দ্রের প্রভাবের বিষয়গুলো। ফলে এরই মধ্যে সরকার কিছু প্রকল্প বাতিল করারও সিদ্ধান্ত নিয়েছে বলে জানা গেছে।
‘বায়ুর মান, স্বাস্থ্য ও পরিবেশের ওপর বাংলাদেশের চট্টগ্রাম অঞ্চলে প্রস্তাবিত কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের ক্ষতিকর প্রভাব’ শীর্ষক এক গবেষণাপত্র সম্প্রতি প্রকাশ করেছে সিআরইএ। চট্টগ্রাম অঞ্চলের কক্সবাজার এলাকায় আটটি বিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মাণের যে প্রস্তাব করা হয়েছে, তার সম্ভাব্য ক্ষতিকর দিক তুলে ধরা হয়েছে প্রতিবেদনে। এতে বলা হয়, এশিয়ার যে ১০টি ঘনবসতিপূর্ণ এলাকায় কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মাণের প্রস্তাব রয়েছে তার তিনটি অঞ্চলই বাংলাদেশে। ৮ হাজার ৭২০ মেগাওয়াট সক্ষমতার এসব বিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মিত হলে কক্সবাজার ও মিরসরাই দূষণের হটস্পটে পরিণত হবে। এসব বিদ্যুৎকেন্দ্র বাস্তবায়ন হলে পরিবেশ বিপর্যয়ের পাশাপাশি প্রাণহানিও ঘটবে মারাত্মক হারে।
সংস্থাটি উদ্বেগ প্রকাশ করে বলছে, পৃথিবীর কোথাও এতগুলো বিদ্যুৎকেন্দ্র একসঙ্গে এত কাছাকাছি নির্মাণের উদ্যোগ নেয়া হয়নি। যেসব এলাকায় এসব বিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মাণের প্রস্তাব করা হয়েছে, সেখানে বহু মানুষের বসবাস। বিশেষত চট্টগ্রাম অঞ্চলে প্রতি বর্গমিটারে ৭১৪ জন মানুষ বসবাস করছে। ফলে তা স্থানীয়দের জীবন হুমকির মুখে ফেলে দেবে।
যদিও সরকার সম্প্রতি দূষণের কথা বিবেচনায় নিয়ে কয়লাভিত্তিক ১০টি প্রকল্প বাদ দেয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছে। যার মধ্যে চট্টগ্রাম অঞ্চলে প্রস্তাবিত বেশ কয়েকটি মেগা প্রকল্পসহ মুন্সীগঞ্জের ৫২২ মেগাওয়াট, ঢাকার ২৮২ মেগাওয়াট, গাইবান্ধার ১ হাজার ২০০ মেগাওয়াট, পটুয়াখালীর ১ হাজার ৩২০ মেগাওয়াট ক্ষমতাসম্পন্ন প্রকল্পও রয়েছে। একটি সূত্র জানিয়েছে, এসডিজি বাস্তবায়ন ও নবায়নযোগ্য জ্বালানির ব্যবহার বাড়ানোর অংশ হিসেবে এসব প্রকল্পের বদলে পরিচ্ছন্ন জ্বালানিতে বিনিয়োগ করার কথা বলছে সরকার।
এ প্রসঙ্গে বাংলাদেশ পরিবেশ আন্দোলনের (বাপা) সাধারণ সম্পাদক শরিফ জামিল বণিক বার্তাকে বলেন, ঘনবসতির দেশে কয়লাভিত্তিক কোনো প্রকল্পই ভালো নয়। অন্য দেশে যত ক্ষতি হবে তার চেয়ে বেশি ক্ষতি হবে আমাদের দেশে। পানি, বায়ু দূষিত হলে স্বাস্থ্যহানি হবে। ২০৫০ সাল নাগাদ সরকার জিরো কার্বন নিঃসরণের কথা বলেছে। সেটি হয়তো সম্ভবও। তবে কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্র থেকে বেরিয়ে আসার জন্য একটা সুনির্দিষ্ট রোডম্যাপ প্রয়োজন। আমরা চাই না আমাদের দেশে জীবাশ্ম জ্বালানিভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের প্রয়োজনীয়তা থাকুক। বিশ্বের বহু দেশ বেরিয়ে আসছে, আমাদেরও বেরিয়ে আসা প্রয়োজন।
সিআরইএ বলছে, তুরস্কের কাহারামানমেরাছ এলাকায় সাত হাজার মেগাওয়াট কয়লাভিত্তিক প্রকল্প বাস্তবায়নের কাজ চলছে। ঘনবসতির কথা বিবেচনা করলে এর আশপাশ এলাকায় খুবই নগণ্যসংখ্যক মানুষ বসবাস করে। কিন্তু বাংলাদেশের প্রস্তাবিত বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলোর ক্ষেত্রে তা দেখা যায়নি।
সংস্থাটি বিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মাণের ক্ষতিকর প্রভাবের কথা উল্লেখ করে জানিয়েছে, চট্টগ্রাম অঞ্চলে প্রস্তাবিত এসব বিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মিত হলে সেখানে প্রতি বছর যে পরিমাণ বায়ুদূষণকারী পদার্থ নিঃসৃত হবে তা বছরে আনুমানিক ৬৫০ জন মানুষের মৃত্যুর কারণ হতে পারে। বায়ুদূষণের কারণে শ্বাসকষ্টজনিত সমস্যায় প্রতি বছর হাসপাতালে ভর্তি হতে হবে ১ হাজার ২০০ মানুষকে। এছাড়া প্রতি বছর অন্তত এক হাজার অপরিণত শিশুর জন্ম হবে। যাদের মধ্যে ৩০০ শিশু শ্বাসকষ্টের সমস্যায় আক্রান্ত হবে।
কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের ক্ষতিকর প্রভাব তুলে ধরে গবেষণায় বলা হয়েছে, চট্টগ্রামে বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলো বাস্তবায়ন হলে বছরে ১ হাজার ৬০০ কেজির কাছাকাছি পারদ ও ছয় হাজার টনের মতো ফ্লাই অ্যাশ বাতাসে ছড়াবে। বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলোর নিঃসৃত পারদ ৪০ শতাংশ এলাকার ভূমি ও মিঠাপানি দূষিত করবে।
বাংলাদেশ পরিবেশ আইনবিদ সমিতির (বেলা) প্রধান নির্বাহী সৈয়দা রিজওয়ানা হাসান বণিক বার্তাকে বলেন, বাংলাদেশের মতো ঘনবসতিপূর্ণ একটি দেশে যেখানে প্রচুর সূর্যের আলো আছে, সেখানে কয়লা বিদ্যুৎকেন্দ্রের কোনো প্রয়োজন নেই। সরকার বিষয়টি বুঝতে পেরে পরিবেশগত ঝুঁকি বিবেচনায় নিয়ে বেশ কয়েকটি কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্র বন্ধ করে দিচ্ছে। এসব প্রকল্পে দুর্নীতির সুযোগ থাকার বিষয়টি উল্লেখ করে তিনি বলেন, কয়লা ও নিউক্লিয়ার প্রকল্পগুলো কিছু দুর্নীতির সুযোগ করে দেয়। নবায়নযোগ্য জ্বালানিতে তেমন সুযোগ নেই। বিশ্বের কয়লা উৎপাদনকারী দেশগুলো নবায়নযোগ্য জ্বালানিতে ঝুঁকছে, ফলে তাদের কয়লা বিক্রির জন্য একটা বাজার প্রয়োজন। তারা এখন আমাদের মতো দেশগুলো ব্যবহার করছে।
বিশ্লেষকরা বলছেন, কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মাণে দেশীয় বিনিয়োগের পাশাপাশি বিদেশী বিনিয়োগও বেড়ে চলেছে। চীন, জাপান, ভারত এমনকি মালয়েশিয়ার মতো দেশ এখন কয়লায় বিনিয়োগ করতে চায়। কয়লায় বিপুল পরিমাণ বিনিয়োগ হলেও অর্থনীতিতে দীর্ঘমেয়াদে এর প্রভাব নেতিবাচক। কয়লা প্রকল্পে কর্মসংস্থান হলেও পরিবেশের বিপর্যয়, স্বাস্থ্যহানি, জীববৈচিত্র্য ধ্বংস হবে। এসবের আর্থিক মূল্যও কম নয়। ফলে এসব বিষয় বিবেচনায় নিতে হবে।
সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের (সিপিডি) নির্বাহী পরিচালক ফাহমিদা খাতুন বণিক বার্তাকে বলেন, জীবাশ্ম জ্বালানির ব্যবহার থেকে বিশ্বের বিভিন্ন দেশ এখন সরে এসে ক্লিন এনার্জিতে বিনিয়োগ করছে। আমরাও সে পথে হাঁটতে পারি। উন্নয়নের ক্ষেত্রে এসব প্রকল্প সাময়িক লাভবান হলেও দীর্ঘমেয়াদে ক্ষতি রয়েছে। বিশেষত পরিবেশের ওপর কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের মারাত্মক প্রভাব রয়েছে। এসব কেন্দ্র স্বাস্থ্যঝুঁকিসহ জীববৈচিত্র্য ব্যাপকভাবে ধ্বংস করবে। ফলে নবায়নযোগ্য জ্বালানির দিকে এগিয়ে যাওয়ার পরামর্শ দেন তিনি।










