উপকূলীয় জেলেদের সম্পর্কে কোনো তথ্য নেই সরকারি দপ্তরে। লাখ লাখ জেলে মৎস্য শিকারে নিয়োজিত থাকলেও তাদের নেই কোনো নিরাপত্তা। দুর্ঘটনার পর ট্রলার কিংবা জেলেদের উদ্ধারে সরকারি কোনো তৎপরতা দেখা যায় না। কোনো ধরনের নিরাপত্তা ছাড়াই জেলেরা বিপুল পরিমাণ মাছ শিকার করে প্রতিদিন দেশের চাহিদা পূরণ ছাড়াও রফতানি বাণিজ্যে বিশেষ ভূমিকা রাখছেন। অথচ উপকূলীয় এসব জেলে থাকেন অরক্ষিত-অবহেলিত। তাদের লাখ লাখ মাছ ধরা ট্রলার ও জাহাজের নেই কোনো নিবন্ধন। সঠিক পরিসংখ্যান নিয়েও রয়েছে ধোঁয়াশা। 

মার্কেন্টাইল মেরিন ডিপার্টমেন্টের (নৌ-বাণিজ্য দপ্তর) চট্টগ্রামের তথ্য মতে, ২০২০ সালে এ দপ্তর থেকে রেজিস্ট্রেশন নিয়েছে ফিশিং জাহাজ ২৬৪টি ও ফিশিং বোট ১১ হাজার ৬০৯টি, ২০২১ সালে রেজিস্ট্রেশন নিয়েছে ফিশিং জাহাজ ২৬৪ ও ফিশিং বোট ১১ হাজার ৯২৪টি, ২০২২ সালে ফিশিং জাহাজ ২৬৬টি ও ফিশিং বোট ১২ হাজার ১০৮টি। তিন বছরে এ দপ্তর থেকে রেজিস্ট্রেশন নিয়েছে ৩৬ হাজার ৪৩৫টি ফিশিং জাহাজ ও ট্রলার। এর বাইরে কোনো তথ্য নেই তাদের কাছে। 

জেলেদের সঙ্গে আলাপ করে জানা গেছে, বর্ষাকালে প্রায়ই দুর্ঘটনায় পড়ে অসংখ্য জেলে মারা যান। বর্ষা মৌসুমে দুর্ঘটনার ভয় থাকলেও শীতকালে দুর্ঘটনার ঝুঁকি থাকে কম। তখন বেড়ে যায় ভারতীয় জলদস্যুর আগ্রাসন। সুন্দরবনসংলগ্ন এলাকায় দেশী জলদস্যু নির্মূল ও দস্যুতা ছেড়ে সুপথে ফিরে আসে র‍্যাবের সহায়তায়। এখন ভারতীয় জলদস্যুদের অত্যাচার বেড়েছে। ভারতীয় জলদস্যুরা বাংলাদেশের জলসীমায় প্রবেশ করে বিভিন্ন এলাকা থেকে নৌকা ও জাল লুট করে নিয়ে যায় বলে জেলেরা দাবি করেন। 

ভারতীয় জলদস্যুরা বাংলাদেশের জলসীমানায় প্রবেশ করে মাছ ধরার পাশাপাশি জেলেদের মারধর করে তাদের শিকার করা মাছ ও জাল-ট্রলারসহ সবকিছু লুটপাট করে নিয়ে যায়। প্রতিবাদ করলে চালানো হয় নির্যাতন। কোস্টগার্ডের জনবল কম থাকায় পুরো এলাকা তারা নিরাপদ রাখতে পারেন না। 

এসব বিষয়ে আলাপকালে বাংলাদেশ মৎস্য উন্নয়ন করপোরেশনের ব্যবস্থাপক (পরিকল্পনা) মো. শামসুজ্জামান বলেন, ‘ভারতীয় জেলেরা বাংলাদেশের জলসীমায় প্রবেশ করে মাছ ধরা ও জেলেদের জিম্মি করে মাছ ও জাল লুটের অভিযোগ আমাদের কাছেও আসে। তবে এর সত্যতা কতটুকু বলা মুশকিল। কারণ সমুদ্র উপকূলে এর খোঁজ নেয়ার জন্য কোস্টগার্ড ও নৌবাহিনী কাজ করে। তারাই এ বিষয়ে সঠিক তথ্য দিতে পারবে।’  

বর্ষা মৌসুমে বরিশালসহ উপকূলীয় এলাকায় মাছ শিকারে গিয়ে গত সাত বছরে বরিশাল বিভাগে ৬০৯ দুর্ঘটনায় ২৫৯ জেলের মৃত্যু হয়েছে। এ ঘটনায় নিখোঁজ রয়েছেন ১৭২, আহত হয়েছেন ১ হাজার ১০৬ জেলে। এই তথ্যের সত্যতা নিশ্চিত করেছেন বরিশাল মৎস্য অধিদপ্তরের উপপরিচালক আনিছুর রহমান তালুকদার। 

বরিশাল বিভাগীয় মৎস্য অধিদপ্তর সূত্র জানায়, ২০১৬-২২ সালের সেপ্টেম্বর মাস পর্যন্ত বরিশাল উপকূলীয় অঞ্চল থেকে মাছ শিকারে যাওয়া জেলে ট্রলার দুর্ঘটনার কবলে পড়ে ৬০৯টি। এর মধ্যে ২০১৬ সালে ৮৫টি দুর্ঘটনায় নিহত হন ৭৭ জন, আহত হয়েছেন ১৭২ আর নিখোঁজ রয়েছেন ১০ জন। এর মধ্যে শুধু ভোলা জেলায় দুর্ঘটনাকবলিত হয়েছে ৮২টি ট্রলার, নিহত হয়েছেন ৭৩ জন, আহত ১৭১ আর নিখোঁজ রয়েছেন ছয়জন। বরগুনা জেলায় তিনটি ট্রলার দুর্ঘটনায় নিহত হয়েছেন চার, নিখোঁজ রয়েছেন চার জেলে। এই ঘটনায় আহতের কোনো তথ্য মেলেনি। 

সরকারি নিয়মানুযায়ী এসব ট্রলার ও জেলে সম্পর্কে তথ্য রাখার কথা মার্কেন্টাইল মেরিন ডিপার্টমেন্টের। ওই দপ্তরের চট্টগ্রাম ছাড়া উপকূলের কোথাও আর কোনো অফিস নেই। চট্টগ্রামে থাকা সদর দপ্তর থেকে সারা দেশের জেলে ট্রলার ও জেলেদের রেজিস্ট্রেশন দেয়াসহ সবকিছু তাদের দেখভালের কথা। 

বরগুনা জেলা জেলে ট্রলার মালিক অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি গোলাম মোস্তফা চৌধুরী জানান, সমুদ্রগামী ট্রলারগুলোর রেজিস্ট্রেশন দেয় মার্কেন্টাইল মেরিন ডিপার্টমেন্ট, কিন্তু তারা কখনোই ট্রলার নিখোঁজ কিংবা জেলেদের মৃত্যুর ব্যাপারে খোঁজখবর নেয় না। পাথরঘাটা ট্রলার শ্রমিক ইউনিয়নের সভাপতি দুলাল মাস্টার বলেন, ‘ট্রলারডুবি কিংবা জেলে নিখোঁজের ঘটনায় আজ পর্যন্ত সরকারি কোনো দপ্তরের লোকজন আমাদের কাছে কিছু জানতে চায়নি।’ 

চট্টগ্রামে থাকা মার্কেন্টাইল মেরিন ডিপার্টমেন্টের (নৌ-বানিজ্য দপ্তর) প্রিন্সিপাল অফিসার ও রেজিস্ট্রার অব বাংলাদেশ শিপস ক্যাপ্টেন সাব্বির মাহমুদ বলেন, ‘নিয়ম অনুযায়ী সাগরে কোনো ট্রলার নিমজ্জিত হলে তাৎক্ষণিক মার্কেন্টাইল মেরিন ডিপার্টমেন্টকে জানাতে হয়। কিন্তু ট্রলার মালিকরা কখনোই আমাদের খবর জানান না। কারণ নিমজ্জিত ট্রলারের রেজিস্ট্রেশন বাতিল করে দেয়া হয়। নতুন ট্রলার তৈরির পর নতুন করে রেজিস্ট্রেশন নিতে হয়। এসব ঝামেলা এড়াতে নতুন ট্রলারকেই পুরনো ট্রলারের রেজিস্ট্রেশন দিয়ে পরিচালনা করা হয়। আমাদের সমস্যা হচ্ছে ম্যাজিস্ট্রেসি ক্ষমতা নেই যে কারণে অনিবন্ধিতদের ধরতেও পারছি না। এখন আমরা চেষ্টা করছি যাতে সব মৎস্য জাহাজ ও ট্রলার রেজিস্ট্রেশনের আওতায় আনা যায়। সে লক্ষ্যে আমরা এরই মধ্যে কাজ শুরু করে দিয়েছি।’  

বর্তমানে সাগরে মাছ ধরা ট্রলারের প্রকৃত সংখ্যা কত তা নিয়েও রয়েছে জটিলতা। সমুদ্র পরিবহন অধিদপ্তর, বিআইডব্লিউটিসি এবং মৎস্য উন্নয়ন করপোরেশন সূত্রে পাওয়া তথ্যানুযায়ী, উপকূলীয় এলাকায় লক্ষাধিকের বেশি ট্রলার মাছ ধরার কাজে নিয়োজিত। ২০২১ সালে রেজিস্ট্রেশন নিয়েছে ফিশিং জাহাজ ২৬৪ ও ফিশিং বোড ১১ হাজার ৯২৪টি। ২০২২ সালে ফিশিং জাহাজ ২৬৬ ও ফিশিং বোট ১২ হাজার ১০৮টির। তিন বছরে ৩৬ হাজার ৪৩৫টি ট্রলার ও জাহাজ রেজিস্ট্রেশন নিয়েছে। 

ট্রলার নির্মাণের পর সাগরে মাছ ধরতে নামার আগে রেজিস্ট্রেশন করানো এবং প্রতি বছর পরিদর্শন রিপোর্ট নেয়া বাধ্যতামূলক হলেও তা মানছে না কেউ। মার্কেন্টাইল মেরিনের চট্টগ্রাম অফিসের একজন কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে জানান, রেজিস্ট্রেশন বাধ্যতামূলক হলেও মাঠ পর্যায়ে গিয়ে দেখাশোনা করার মতো প্রয়োজনীয় লোকবল না থাকায় জটিলতার সৃষ্টি হচ্ছে। প্রায়ই উপকূল থেকে মাছ ধরা ট্রলার নিখোঁজ হওয়ার পর তাদের ঠিকানা হয় প্রতিবেশী দেশ ভারতের কারাগার। তাদের দেশে ফিরিয়ে আনার জন্য ধরনা দিতে হয় বিভিন্ন মানবাধিকার সংগঠন ও বেসরকারি সংস্থার কাছে। এ ব্যাপারে সরকারের তেমন কোনো তৎপরতা থাকে না।