নির্বাচনী আমেজে সিটি করপোরেশনের মশক নিধন কার্যক্রম ও বর্জ্য ব্যবস্থাপনার ধীরগতিতে রাজধানীতে বেড়েছে কিউলেক্স মশার উপদ্রব। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, দ্রুত মশক নিয়ন্ত্রণে কার্যকর উদ্যোগ না নিলে পরিস্থিতি খারাপের দিকে যাবে।
শীতে বৃষ্টি না থাকায় রাজধানীতে মশার উপদ্রব ব্যাপক হারে বেড়েছে। বিশেষ করে কিউলেক্স প্রজাতির মশার আধিক্যে বিকাল থেকে গভীর রাত পর্যন্ত নগরবাসীর ভোগান্তি বাড়িয়েছে।
সরজমিনে রাজধানীর কারওয়ান বাজার, মিরপুর, মোহাম্মদপুর, হাতিরঝিল, মগবাজার ও বনশ্রী এলাকা ঘুরে দেখা গেছে, ফুটপাতকেন্দ্রিক ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানগুলোর আশপাশে জমে আছে আবর্জনা, পচা পানি ও দুর্গন্ধযুক্ত বর্জ্য। কলার খোসা, প্লাস্টিকের মোড়কসহ বিভিন্ন ধরনের ময়লা-আবর্জনা খোলা জায়গায় পড়ে থাকতে দেখা যায়। অনেক এলাকায় ড্রেন ও নালায় জমে থাকা পানি পরিষ্কার না হওয়ায় তা মশার প্রজনন ক্ষেত্রে পরিণত হয়েছে বলে স্থানীয়রা অভিযোগ করেন।
কারওয়ান বাজারের ফুটপাত ব্যবসায়ী হাবিব বলেন বলেন, ‘মাসে এক-দুবার ওষুধ ছিটানো হয়, যা প্রয়োজনের তুলনায় অপ্রতুল। বিকাল থেকেই মশার উপদ্রব বাড়তে থাকে, সন্ধ্যার পর মশার কয়েল জ্বালিয়েও স্বস্তি মেলে না।’
মোহাম্মদপুরের করিম হোসেন বাসিন্দা জানান, দিনে কিছুটা সহনীয় থাকলেও বিকাল থেকে মশার উপদ্রব বেড়ে যায়। শীতকাল হওয়ায় ফ্যান ব্যবহার কম করায় ঘরের ভেতর মশার উৎপাত বেশি মনে হয়।
দক্ষিণখান এলাকার কয়েকজন বাসিন্দার অভিযোগ, নিয়মিত বর্জ্য অপসারণ না হওয়ায় বাসাবাড়ির পাশে ডোবা ও জলাবদ্ধতা তৈরি হচ্ছে, যা মশা বাড়ার অনুকূল পরিবেশ তৈরি করছে।
হাতিরঝিলে সন্ধ্যার পর পরিস্থিতি তীব্র আকার ধারণ করে বলে জানিয়েছেন পথচারীরা। পরিবার নিয়ে ঘুরতে আসা এক দর্শনার্থীরা জানান, মশার কারণে বসে থাকা দায় হয়ে পড়ে।
হকারদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, পানি ও আশপাশের পরিবেশ অপরিষ্কার থাকায় মশার আধিক্য বেশি; ধূপ ও কয়েল জ্বালিয়ে ব্যবসা করতে হয়।
হাতিরঝিলের আশপাশে মগবাজার, বনশ্রী, বাংলামোটরসহ বিভিন্ন এলাকার কয়েকজন বাসিন্দার সঙ্গে কথা হয় বণিক বার্তার প্রতিবেদকের। তারা জানিয়েছেন, বেশ কয়েকদিন ধরে মশার উপদ্রব বেড়ে গেছে। দিনের বেলাতেই মশার উপদ্রবে টেকা দায় হয়ে পড়েছে। সন্ধ্যার আগেই বাসাবাড়ির সব জানালা দরজা বন্ধ করে রাখতে হয়। এছাড়া মশার উপদ্রব কমাতে কয়েল এবং স্প্রে সার্বক্ষণিক ব্যবহার করতে হয়। এতে স্বাস্থ্যঝুঁকি থাকলেও কিছু করার নেই বলে জানান তারা। মশার উপদ্রবে ছেলে-মেয়েরা পড়ালেখাতেই বসতে পারে না।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, ডেঙ্গুর প্রকোপ আপাতত কম থাকলেও কিউলেক্স মশার আধিক্য জনজীবন ব্যাহত করছে। এ প্রসঙ্গে কীটতত্ত্ববিদ কবিরুল বাশার বণিক বার্তাকে বলেন, ‘এ সময় সাধারণত কিউলেক্স মশার উপদ্রুব বাড়ে। বর্তমানে নালা ডোবা শুকিয়ে যাওয়ায় কিউলেক্স মশার প্রজননহার কয়েক গুণ বেড়ে গেছে। সিটি করপোরেশনগুলোকে দ্রুত মশক নিধনে ব্যবস্থা নিতে হবে। নয়তো মার্চের মাঝামাঝি পর্যন্ত মশা বাড়তেই থাকবে। বর্তমান পরিস্থিতি আরো ভয়াবহ আকার ধারণ করবে।’
নির্বাচন-সংক্রান্ত ব্যস্ততার কারণে কয়েক দিনের সাময়িক স্থবিরতায় রাজধানীতে মশার উপদ্রব কিছুটা বেড়েছে বলে জানিয়েছেন ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের প্রশাসক মাহমুদুল হাসান। তিনি বণিক বার্তাকে বলেন, ‘শাহবাগসহ বিভিন্ন এলাকায় চলাচলের সময় আমিও ব্যক্তিগতভাবে মশার উপদ্রব বৃদ্ধি অনুভব করেছি। মাঝখানে নির্বাচনের কারণে মশক নিধন কর্মীদের মুভমেন্ট কম ছিল, ফলে তিন-চারদিনের একটি গ্যাপ বা স্থবিরতা তৈরি হয়। এ কারণেই মূলত উপদ্রব কিছুটা বেড়েছে বলে মনে হচ্ছে।’
তিনি বলেন, ‘শনিবার সকাল থেকেই আমরা ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের সব এলাকায় বড় পরিসরে প্রোগ্রাম শুরু করেছি। আমি নিজে সকালে বিভিন্ন এলাকায় উপস্থিত থেকে এ কার্যক্রম তদারকি করেছি। এতে একই সঙ্গে বর্জ্য ব্যবস্থাপনা এবং মশক নিয়ন্ত্রণ এ দুটি বিষয়ের ওপরই সমান গুরুত্ব দেয়া হচ্ছে।’
তিনি আরো বলেন, ‘একদিনে তো পুরো শহর বা সব এলাকা কাভার করা সম্ভব হয় না। সাধারণত আমরা তিনদিনের রোটেশনে কাজ করি। নির্বাচনের কারণে যে গ্যাপটুকু তৈরি হয়েছিল, আশা করছি আগামী তিন-চারদিনের মধ্যে তা কাটিয়ে ওঠা সম্ভব হবে। চলতি সপ্তাহের মধ্যেই সব এলাকায় নতুন করে কার্যক্রম জোরদার হবে এবং মশার উপদ্রব কমে আসবে।’









