সেলফোন সেবা দিতে অপারেটরদের নেটওয়ার্ক টাওয়ার বা বেজ ট্রান্সসিভার স্টেশন (বিটিএস) মূলত অপটিক্যাল ফাইবার ও মাইক্রোওয়েভ লিংক সংযোগের মাধ্যমে যুক্ত থাকে। টুজি ও থ্রিজির তুলনায় ফোরজিতে ডাটা ট্রান্সফারের গতি কয়েক গুণ বেশি। দ্রুতগতির ডাটা সংযোগের জন্য মাইক্রোওয়েভের চেয়ে ফাইবারের ওপরই নির্ভর করতে হয় অপারেটরদের। যদিও বাংলাদেশে ফোরজি বিটিএসে অপটিক্যাল ফাইবার সংযোগের হার এ অঞ্চলের দেশগুলোর তুলনায় অনেক কম। যার প্রভাব পড়ছে ফোরজি সেবার মানেও।
বাংলাদেশ টেলিযোগাযোগ নিয়ন্ত্রণ কমিশনের (বিটিআরসি) এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, শ্রীলংকা, নেপাল, মালয়েশিয়া, ইন্দোনেশিয়া ও কম্বোডিয়ায় অপারেটরদের ফোরজি বিটিএস বা নেটওয়ার্ক সাইটের ৩০-৪৫ শতাংশে রয়েছে অপটিক্যাল ফাইবার সংযোগ। অপটিক্যাল ফাইবারের পরিবর্তে মাইক্রোওয়েভের মাধ্যমে যোগাযোগ স্থাপন করার কারণে সেলফোন অপারেটররা কাঙ্ক্ষিত মানের সেবা দিতে পারছে না। সম্প্রতি জাতীয় সংসদের সরকারি প্রতিষ্ঠান কমিটিতে এ প্রতিবেদন উপস্থাপন করেছে বিটিআরসি।
নিয়ন্ত্রক সংস্থাটি জানিয়েছে, সেলফোন অপারেটরদের ট্রান্সমিশন পর্যায়ে ফোরজি সাইট অপটিক্যাল ফাইবারের মাধ্যমে সংযোগ স্থাপনের হার বাড়াতে সব সেলফোন অপারেটর ও ন্যাশনওয়াইড টেলিকমিউনিকেশন অ্যান্ড ট্রান্সমিশন নেটওয়ার্ক (এনটিটিএন) অপারেটরদের সঙ্গে সমন্বয়ের উদ্যোগ নেয়া হচ্ছে। সংশ্লিষ্ট সব অপারেটরের মধ্যে পারস্পরিক সমস্যার সমাধানে একাধিক সভার আয়োজন করা হয়েছে।
প্রতিবেদনের তথ্য অনুযায়ী, কভিড মোকাবেলায় বিশ্বব্যাপী চরম স্থবিরতার দরুন চাহিদার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণভাবে দেশব্যাপী নেটওয়ার্কের মানোন্নয়ন কাঙ্ক্ষিত মাত্রায় উন্নীত করতে অপারেটরদের যথেষ্ট বেগ পেতে হয়েছে। ফলে সাম্প্রতিক সময়ে অনাকাঙ্ক্ষিত হারে কলড্রপ, মোবাইল ইন্টারনেটের ধীরগতি, দুর্বল নেটওয়ার্ক সমস্যা প্রকট হয়েছে।
ফোরজি সাইটে ফাইবার অপটিক সংযোগ হারে পিছিয়ে থাকার বিষয়টি সঠিক বলে জানিয়েছেন বিটিআরসির চেয়ারম্যান শ্যাম সুন্দর সিকদার। তিনি বণিক বার্তাকে বলেন, দেশে সেলফোন অপারেটরদের সাইটে ফাইবার সংযোগ তুলনামূলক কম। সাইট পর্যায়ে অপটিক্যাল ফাইবারের সংযোগ বাড়ানোর জন্য সংশ্লিষ্ট অপারেটরদের তাগিদ দেয়া হয়েছে।
বিটিআরসির প্রতিবেদনে বলা হয়, নতুন তরঙ্গ, টাওয়ার শেয়ারিংয়ের আওতায় প্রত্যন্ত এলাকায় নতুন সাইট স্থাপন, অপটিক্যাল ফাইবার অবকাঠামোর বিস্তৃতি, ফোরজি উপযোগী ডিভাইসের ব্যবহার বৃদ্ধিসহ সামগ্রিক টেলিযোগাযোগ ইকোসিস্টেম উন্নয়নে বিভিন্ন উদ্যোগ নেয়া হয়েছে। এতে সেবার মানোন্নয়ন ঘটবে বলে প্রত্যাশা সংস্থাটির।
তরঙ্গস্বল্পতাকেও মানসম্মত টেলিযোগাযোগ সেবা প্রদানের পথে অন্তরায় হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে নিয়ন্ত্রক সংস্থাটির প্রতিবেদনে। এতে বলা হয়, বাংলাদেশের প্রতি মিলিয়ন গ্রাহকের বিপরীতে অপারেটরদের অনুকূলে বরাদ্দকৃত তরঙ্গ এশিয়া প্যাসিফিক অঞ্চলের দেশগুলোর মধ্যে সর্বনিম্ন। বতর্মানে গ্রাহকদের ভয়েস ও ডাটা ব্যবহার চাহিদা ও আকাঙ্ক্ষা বৃদ্ধি পেয়েছে, আবার প্রত্যাশা ও প্রাপ্তির মধ্যকার ব্যবধানও প্রতিনিয়ত বাড়ছে।
উল্লেখ্য, বর্তমানে দেশে এনটিটিএন লাইসেন্সধারী প্রতিষ্ঠানের সংখ্যা ছয়টি। এর মধ্যে তিনটি বেসরকারি ও তিনটি সরকারি প্রতিষ্ঠান রয়েছে। ২০০৯ সালে লাইসেন্স দেয়া হয় ফাইবার অ্যাট হোম ও সামিট কমিউনিকেশনস লিমিটেডকে। আর ২০১৪ সালে রাষ্ট্রায়ত্ত তিন প্রতিষ্ঠান বাংলাদেশ রেলওয়ে, বাংলাদেশ টেলিকমিউনিকেশনস কোম্পানি লিমিটেড (বিটিসিএল) ও পাওয়ার গ্রিড কোম্পানি অব বাংলাদেশ (পিজিসিবি) লিমিটেডকে এনটিটিএন লাইসেন্স দেয় বিটিআরসি। ২০১৯ সালে লাইসেন্স দেয়া হয় বেসরকারি খাতের আরো একটি প্রতিষ্ঠান বাহন লিমিটেডকে।
লাইসেন্স ছাড়া অপটিক্যাল ফাইবার নেটওয়ার্ক উন্নয়ন, নির্মাণ, পরিচালনা ও রক্ষণাবেক্ষণের ক্ষেত্রে বিধিনিষেধ রয়েছে। এনটিটিএন লাইসেন্সধারী প্রতিষ্ঠান নিয়ন্ত্রক সংস্থার নির্ধারিত ট্যারিফের ভিত্তিতে টেলিযোগাযোগ খাতের অন্য প্রতিষ্ঠানগুলোকে সেবা দিতে পারে।
এনটিটিএন ও ইনফ্রাস্ট্রাকচার শেয়ারিং নীতিমালা অনুযায়ী, দেশে ফাইবার অপটিক নেটওয়ার্ক তৈরি ও তা ব্যবসায়িকভাবে ভাড়া প্রদানের জন্য এনটিটিএন লাইসেন্স নেয়ার বাধ্যবাধকতা রয়েছে। বাংলাদেশ টেলিযোগাযোগ আইন, ২০১১-এর ধারা ৪০ অনুযায়ী, বিটিআরসির অনুমোদন ছাড়া কোনো প্রতিষ্ঠান দেশে টেলিযোগাযোগ সেবা দিতে পারে না। সরকারের পূর্ব অনুমোদন সাপেক্ষে সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানকে এ অনুমতি দিতে পারে কমিশন।
জানা গেছে, স্বাভাবিকভাবে অপটিক্যাল ফাইবারের আয়ুষ্কাল ১৫ বছর। এ সময়ের পর ফাইবার পরিবর্তন করতে হয়। এছাড়া ফাইবার কাটা পড়লে তা মেরামত ও রক্ষণাবেক্ষণের বিষয়টিও জড়িত। প্রতি কিলোমিটার অপটিক্যাল ফাইবার নেটওয়ার্ক তৈরিতে আনুমানিক ব্যয় ১৫-২০ লাখ টাকা। এ খাত থেকে আয়ের বিষয়টি নির্ভর করে ডাটা প্রবাহের ওপর।
এদিকে, দ্রুত নেটওয়ার্ক সম্প্রসারণ ও মানসম্পন্ন সেলফোন সেবা নিশ্চিতে ২০১৮ সালের নভেম্বরে চার প্রতিষ্ঠানকে টেলিযোগাযোগ টাওয়ার ব্যবস্থাপনার লাইসেন্স দেয় সরকার। প্রতিষ্ঠানগুলো হলো ইডটকো বাংলাদেশ কো. লিমিটেড, টিএএসসি সামিট টাওয়ারস লিমিটেড, কীর্তনখোলা টাওয়ার বাংলাদেশ ও এবি হাইটেক কনসোর্টিয়াম লিমিটেড। এর মধ্যে কমিশনের কাছ থেকে নেয়া অনাপত্তিপত্রের মাধ্যমে ২০১৩ সাল থেকে কার্যক্রম চালু রয়েছে ইডটকোর। তবে চুক্তিসহ অন্যান্য জটিলতায় লাইসেন্স দেয়ার দুই বছরেও স্থবির হয়ে ছিল খাতটি। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, ডাটাভিত্তিক সেবার ক্রমবর্ধমান চাহিদার পরিপ্রেক্ষিতে আগামীতে এ খাতে কয়েক হাজার টাওয়ার নির্মাণের প্রয়োজন হবে।










