কোরবানির পশুর চামড়া নিয়ে গত বছরের মতো অনাকাঙ্ক্ষিত পরিস্থিতি এড়াতে এবার সরকার নানা পদক্ষেপ নিয়েছিল। কোরবানির আগে সরকার চামড়ার দামও নির্ধারণ করে দেয়। ব্যবসায়ীরাও চামড়া কিনতে উদ্বুদ্ধ হন। ফলে বেশি দামে চামড়া কিনে বিপাকে পড়েছেন দিনাজপুরের ব্যবসায়ীরা।

ঢাকার আড়ত ও ট্যানারি মালিকদের কাছে সরকার নির্ধারিত মূল্যে চামড়া বিক্রি করতে না পেরে ব্যাপক লোকসানের মুখে পড়ার আশঙ্কা করছেন তারা। দিনাজপুরের ব্যবসায়ীদের কাছে বর্তমানে ৭০ হাজারের মতো চামড়া রয়েছে।

এবারের ঈদুল আজহায় লবণজাত প্রতি বর্গফুট চামড়া ৪০-৪৫ টাকায় বিক্রির লক্ষ্যে চামড়া কিনেছিলেন দিনাজপুরের ব্যবসায়ীরা। এখন সেই চামড়া বিক্রির জন্য ঢাকায় পাঠানোর কথা। কিন্তু বিক্রির সময় ঢাকার আড়তদাররা দাম বলছেন প্রতি বর্গফুট ২৫-৩০ টাকা। এ দামে বিক্রি করলে পথে বসা ছাড়া উপায় থাকবে না তাদের।

জেলা চামড়া ব্যবসায়ী মালিক গ্রুপের তথ্যমতে, ২০১০ সালের দিকে জেলায় চামড়া ব্যবসায় যুক্ত ছিলেন এক হাজারেরও অধিক ব্যবসায়ী। পাশাপাশি মৌসুমি ব্যবসায়ীরাও সক্রিয় ছিলেন। ক্রমেই লোকসান করতে করতে এখন ব্যবসা ধরে রেখেছেন মাত্র ৩০-৩৫ জন। অনেকেই ব্যবসা ছেড়ে হয়েছেন শ্রমিক। জীবিকা নির্বাহের তাগিদে অন্য পেশায় গিয়েছেন কেউ কেউ।

শহরের রামনগর এলাকায় চামড়া ব্যবসায়ী মালিক সমিতির মার্কেটে গিয়ে দেখা যায়, সমিতির সামনে বসে অলস সময় পার করছেন চামড়া ব্যবসায়ীরা। তারা জানান, মৌসুমের এ সময়ে কথা বলার সময় থাকত না তাদের। বিভিন্ন ব্যবসায়ীর কাছে মজুদ থাকা চামড়া আসত এখানে, সেই চামড়া প্রক্রিয়াজাত করে পাঠানো হতো ঢাকায়।

কয়েকটি গুদাম ঘুরে দেখা যায়, চামড়ায় পুনরায় লবণ দেয়ার কাজ চলছে। চামড়া ব্যবসায়ী রায়হান আলম বলেন, প্রায় এক মাস হয়ে গেছে, আড়াই হাজার চামড়া লবণ দিয়ে রেখেছি। অল্প কিছুদিনের মধ্যে ঢাকায় চামড়া পাঠাতে না পারলে নতুন করে লবণ দিতে হবে। এ বছর বেশি দামে চামড়া কিনেছি। বাজারে এখন প্রতি পিছ চামড়ার বাজারদর চলছে ৩০০-৫০০ টাকা। যেভাবে খরচ হয়েছে, এ দামে বিক্রি করলে পুঁজিই থাকে না।

প্রায় ১০ বছর ধরে চামড়ার ব্যবসা করছেন আব্দুর রাহমান। ঢাকার চামড়া আড়ত মালিকদের কাছে তার পাওনা রয়েছে প্রায় ১২ লাখ টাকা। গত বছর তেমন একটা চামড়া কেনা হয়নি। এ বছর সরকারি ঘোষণার পর বিভিন্নজনের কাছ থেকে ধারদেনা করে ব্যবসায় বিনিয়োগ করেছেন।

ব্যবসায়ী শুকুর আলী বলেন, সর্বোচ্চ এক সপ্তাহের মধ্যে মজুদ চামড়া বিক্রি করতে না পারলে মাটিতে পুঁতে ফেলা ছাড়া উপায় থাকবে না।

জেলা চামড়া ব্যবসায়ী মালিক গ্রুপের সাংগঠনিক সম্পাদক শরিফুল ইসলাম বলেন, ‘টাকা পড়ে আছে ঢাকার আড়তদারদের কাছে। ব্যবসাটা ধরে রাখতেও পারছি না আবার ছাড়তেও পারছি না। মামলা করে টাকা আদায় করার অবস্থাও নেই আমাদের। কারণ আমরা যখন পণ্য দিই, আমাদের কোনো ডকুমেন্ট দেয়া হয় না। আড়তদার শুধু একটা স্লিপ ধরিয়ে দেন। এ ব্যবসা চলে সম্পূর্ণ বিশ্বাসের ওপর। ঢাকাসহ বিভিন্ন আড়তদার ও ট্যানারি মালিকদের কাছে জেলার ব্যবসায়ীদের পাওনা রয়েছে প্রায় ১০ কোটি টাকা। বকেয়া আদায় নেই, উপরন্তু ধারদেনা করে এবারো চামড়া কেনা হয়েছে। দাম না থাকায় পথে বসবার উপক্রম অনেকের। এবার জেলার ব্যবসায়ীদের প্রায় ৭০ হাজার কোরবানির চামড়া অবিক্রীত রয়েছে।

জানতে চাইলে দিনাজপুর জেলা প্রশাসক খালেদ মোহাম্মদ জাকী বলেন, বিষয়টি অবগত হয়েছি। চামড়া ব্যবসায়ীদের সমস্যার কথা জানিয়ে প্রশাসনের পক্ষ থেকে বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ে বিষয়টি অবহিত করা হবে।