তবে ১৫০ শয্যায় উন্নীত হলেও এখনো পূর্ণাঙ্গ ইনডোর চিকিৎসাসেবা চালু হয়নি। ফলে হাসপাতালটি এখনো মূলত আউটডোর সেবায়ই সীমাবদ্ধ।
হাসপাতালটিতে মাত্র পাঁচজন স্থায়ী চিকিৎসক থাকায় সংযুক্তির মাধ্যমে ১৬ জন চিকিৎসককে পদায়ন করা হয়েছে। এতে আউটডোরে চিকিৎসা সুবিধা বাড়লেও ইনডোরে চিকিৎসাসেবা চালু করা যায়নি। ২৪ ঘণ্টার জরুরি বিভাগ চালু থাকলেও প্রয়োজনীয় চিকিৎসক, জনবল ও চিকিৎসা সহায়ক সুবিধার অভাবে রোগী ভর্তি রেখে চিকিৎসাসেবা দেয়া সম্ভব হচ্ছে না। দীর্ঘদিনের জনবল সংকট ও চিকিৎসক ধরে রাখতে না পারার প্রভাব পড়ছে সার্বিক চিকিৎসাসেবায়। এতে রেলওয়ের কর্মকর্তা-কর্মচারী, তাদের পরিবার ও সাধারণ রোগীদের একটি বড় অংশ কাঙ্ক্ষিত সেবা থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন।
স্বাস্থ্য বিভাগের তথ্যমতে, ২০২৫ সালের এপ্রিলে রেলপথ মন্ত্রণালয় ও স্বাস্থ্যসেবা বিভাগের মধ্যে সমঝোতা স্মারক স্বাক্ষরের পর রেলওয়ে বক্ষব্যাধি হাসপাতালটিকে সাধারণ রোগীদের জন্য উন্মুক্ত করে নাম পরিবর্তন করে রাখা হয় চট্টগ্রাম রেলওয়ে জেনারেল হাসপাতাল। ৯১ শয্যার এ হাসপাতালকে ১৫০ শয্যায় উন্নীত করা হয়। সমঝোতা স্মারকে হাসপাতালটিকে ধাপে ধাপে পূর্ণাঙ্গ জেনারেল হাসপাতালে রূপান্তরের পরিকল্পনা ছিল। তবে এক বছরের বেশি সময় পার হলেও সে লক্ষ্য বাস্তবায়ন হয়নি।
হাসপাতালটি সর্বসাধারণের চিকিৎসাসেবা উন্মুক্ত করে দেয়ায় মাত্র ১০ টাকায় টিকিট কেটে বহির্বিভাগে শিশু বিভাগ, অর্থোপেডিকস, চক্ষু, দন্ত্য, গাইনি ও অবস, মেডিসিন, কার্ডিওলজি, চর্মরোগসহ বিভিন্ন রোগের চিকিৎসা দেয়া হয়। পাশাপাশি আল্ট্রাসনোগ্রাফি, ডেন্টাল
পরীক্ষা, রক্তের সিবিসি, এক্স-রেসহ বেশ কয়েকটি পরীক্ষা কম খরচে করার সুযোগ রয়েছে। কিন্তু নানা সংকট ও অনিয়মের কারণে সব পরীক্ষা ও ল্যাবের কার্যক্রম পূর্ণাঙ্গভাবে পরিচালনা করা যাচ্ছে না।
বর্তমানে হাসপাতালের বহির্বিভাগে হৃদরোগে একজন, অর্থোপেডিকসে এক, মেডিসিনে চার, শিশু বিভাগে দুই, চক্ষু বিভাগে এক, ডেন্টালে এক, গাইনি ও প্রসূতি বিভাগে দুই, জরুরি বিভাগে তিন ও বক্ষব্যাধি বিভাগে একজনসহ মোট ১৬ জন চিকিৎসক কর্মরত। তারা সবাই স্বাস্থ্য অধিদপ্তর থেকে সংযুক্তিতে পদায়িত। অন্যদিকে রেলের নিজস্ব স্থায়ী চিকিৎসক আছেন মাত্র পাঁচজন। এছাড়া সংযুক্তিতে পদায়িত দুজন সিনিয়র নার্সসহ হাসপাতালে মোট পাঁচজন নার্স কর্মরত।
হাসপাতালের বিভাগীয় জনবলসংক্রান্ত তথ্য পর্যালোচনা করে দেখা গেছে, পঞ্চম থেকে নবম গ্রেড পর্যন্ত ১০টি চিকিৎসক পদে মোট ১৪ জন চিকিৎসক থাকার কথা। সেখানে মোট পাঁচজন স্থায়ী পদে কর্মরত। অন্যদিকে সিনিয়র স্টাফ নার্সের ছয়টি পদের বিপরীতে মাত্র একজন কর্মরত। সিস্টার ইনচার্জ, মেডিকেল টেকনোলজিস্ট, ফার্মাসিস্ট, জুনিয়র নার্স, স্যানিটারি পরিদর্শক, পরিচ্ছন্নতাকর্মী, মেডিসিন ক্যাশিয়ার, আয়াসহ ৪৩ ধরনের পদে মোট অনুমোদিত জনবল ৩৪৩ জন। এর মধ্যে স্থায়ীভাবে কর্মরত ১৯৩ জন এবং ১৫০টি পদ শূন্য। জনবল সংকট সামাল দিতে আউটসোর্সিংয়ের মাধ্যমে আরো ৩১ জনকে নিয়োগ দিয়ে কার্যক্রম পরিচালনা করছে কর্তৃপক্ষ। তবে এ জনবল কাঠামোর মধ্যে চট্টগ্রাম রেলওয়ে জেনারেল হাসপাতালের পাশাপাশি রেলওয়ে নিয়ন্ত্রিত ১০ শয্যার হালিশহর বন্দর ইয়ার্ড হাসপাতাল ও লাকসাম হাসপাতালও অন্তর্ভুক্ত।
হাসপাতালটির বিভাগীয় চিকিৎসা কর্মকর্তা ডা. তাহামিনা ইয়াসমিন বণিক বার্তাকে বলেন, ‘বহির্বিভাগে নিয়মিত বিভিন্ন রোগের চিকিৎসাসেবা দেয়া হচ্ছে। স্বাস্থ্য বিভাগের সঙ্গে সমঝোতার পর চিকিৎসক ও নার্স পদায়নে স্বাস্থ্য অধিদপ্তর কাজ করছে। এরই মধ্যে প্যাথলজি বিভাগ এবং ২৪ ঘণ্টার জরুরি সেবা চালু হয়েছে। তবে জনবল ও লজিস্টিক সুবিধার ঘাটতির কারণে এখনো ইনডোর চিকিৎসাসেবা চালু করা সম্ভব হয়নি। প্রয়োজনীয় নিয়োগ ও অন্যান্য কার্যক্রম শুরুর পরিকল্পনা রয়েছে। বরাদ্দ বাড়লে ধাপে ধাপে হাসপাতালটিকে পূর্ণাঙ্গ চিকিৎসাসেবার আওতায় আনা হবে।’
তিনি আরো বলেন, ‘স্বাস্থ্য বিভাগ থেকে বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক পদায়ন করা হচ্ছে। তবে তাদের বদলি ও প্রত্যাহারের বিষয়টি মন্ত্রণালয়ের এখতিয়ারভুক্ত। হাসপাতালটির নিজস্ব চিকিৎসকের সংকট রয়েছে। পূর্ণাঙ্গভাবে পরিচালনার জন্য আরো বড় পরিসরে উদ্যোগ নিতে হবে। স্বাস্থ্য অধিদপ্তর ও রেলওয়ে কর্তৃপক্ষের সমন্বয়ে এসব সমস্যা সমাধান করা হবে।’
হাসপাতালে গিয়ে দেখা যায়, বহির্বিভাগে টিকিট কেটে রোগীরা বিভিন্ন বিভাগে চিকিৎসার জন্য যাচ্ছে। তবে রোগীর সংখ্যা তুলনামূলক কম। বেশির ভাগ রোগীই এসেছে স্বল্প মূল্যের কিছু পরীক্ষা-নিরীক্ষা করার জন্য। হাসপাতালের বিভিন্ন ওয়ার্ড ও শয্যার বড় একটি অংশ ফাঁকা দেখা যায়। ইনডোর চিকিৎসা পুরোপুরি চালু না থাকায় রোগী ভর্তির কার্যক্রমও সীমিত রয়েছে। তবে জটিল রোগের চিকিৎসার জন্য বেশির ভাগ রোগীই চট্টগ্রাম মেডিকেলে যায় বলে জানান বহির্বিভাগে চিকিৎসা নিতে আসা রোগীরা।
ছেলে ইব্রাহিম খলিলের (৪) গত কয়েক দিন জ্বর থাকায় বহির্বিভাগের চিকিৎসকের পরামর্শে রক্ত, এক্স-রে ও ইউরিন টেস্টের জন্য হাসপাতালের বাইরে চেয়ারে বসে ছিলেন বাবা মো. হাফিজুর রহমান। তিনি বণিক বার্তাকে বলেন, ‘ছেলে অসুস্থ হওয়ায় চিকিৎসার জন্য এসেছি। বহির্বিভাগে কিছু পরীক্ষার জন্য বলেছে। সিরিয়ালের জন্য বসে আছি। এখানে পরীক্ষার ফি অনেক কম। তবে দুপুরের পরে এখানে তেমন কোনো সেবা পাওয়া যায় না। সেজন্য বড় সমস্যা হলে চট্টগ্রাম মেডিকেলে যেতে হয়। জরুরি বিভাগে চিকিৎসাসেবা সেভাবে পাওয়া যায় না। বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক না থাকায় হাসপাতালে ছোটখাটো চিকিৎসাই বেশি হয়।’
এছাড়া হাসপাতালটির অপারেশন থিয়েটারও (ওটি) এখনো চালু হয়নি। ফলে কোনো ধরনের অস্ত্রোপচার করা যাচ্ছে না। সাধারণ রোগীদের জন্য সরকারি ওষুধের নিয়মিত সরবরাহ নিশ্চিত করা যায়নি। হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, ওটি চালু, ইনডোর সেবা সম্প্রসারণ, প্রয়োজনীয় জনবল নিয়োগ ও চিকিৎসা সরঞ্জাম সরবরাহ নিশ্চিত করতে স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ে চাহিদাপত্র পাঠানো হয়েছে। এসব সুবিধা চালু না হওয়ায় ১৫০ শয্যায় উন্নীত হওয়া সত্ত্বেও হাসপাতালটি এখনো মূলত বহির্বিভাগ ও সীমিত জরুরি চিকিৎসাসেবার মধ্যেই সীমাবদ্ধ রয়েছে।
বাংলাদেশ রেলওয়ে পূর্বাঞ্চলের মহাব্যবস্থাপক মোহাম্মদ সুবক্তগীন বণিক বার্তাকে বলেন, ‘রেলওয়ে ও স্বাস্থ্য বিভাগ হাসপাতালটির বরাদ্দও বাড়িয়েছে। বহির্বিভাগের সেবা পূর্ণাঙ্গভাবে চালু আছে। তবে ইনডোর সেবা চালু করতে আরো সময় লাগবে। কয়েক মাসের মধ্যে হাসপাতালটি পূর্ণাঙ্গভাবে চালু করা সম্ভব হবে বলে আশা করা হচ্ছে। তখন রোগী ভর্তি ও প্রয়োজনীয় যন্ত্রপাতি সংযোজনের মাধ্যমে কম খরচে বিভিন্ন পরীক্ষা-নিরীক্ষার সুযোগ বাড়বে।’
হাসপাতালটি পূর্ণাঙ্গভাবে চালু করতে প্রয়োজনীয় সব ধরনের পদক্ষেপ নেয়া হবে বলে জানিয়েছেন চট্টগ্রাম বিভাগীয় স্বাস্থ্য পরিচালক ডা. ফজলে রাব্বি। তিনি বণিক বার্তাকে বলেন, ‘শতবর্ষী হাসপাতালটি সাধারণ মানুষের জন্য উন্মুক্ত করার পর গত এক বছরে চিকিৎসক পদায়ন ও বিভিন্ন পরীক্ষা-নিরীক্ষা চালুর উদ্যোগ নেয়া হয়েছে। বর্তমানে বহির্বিভাগের সেবা চালু রয়েছে এবং ইনডোর সেবা চালুর প্রক্রিয়া চলছে।’









