মৌসুমি বায়ু সক্রিয় থাকায় দেশের কয়েকটি জেলায় ভারি বৃষ্টি হয়েছে। এর মধ্যে গতকাল সর্বোচ্চ বৃষ্টিপাত রেকর্ড করা হয়েছে সিলেটে, ২১৪ মিলিমিটার। এছাড়া টানা বৃষ্টিতে চট্টগ্রাম, নোয়াখালী, ফেনী ও কুমিল্লার নিম্নাঞ্চল প্লাবিত হয়েছে। পানিবন্দি কয়েক লাখ মানুষ। বৃষ্টিপাত অব্যাহত থাকায় চট্টগ্রামে পাহাড়ধসের আশঙ্কা করছেন সংশ্লিষ্টরা। বিস্তারিত প্রতিনিধিদের পাঠানো খবরে—
চট্টগ্রাম: মৌসুমি বায়ুর সক্রিয়তার কারণে টানা বৃষ্টিতে ডুবে গেছে নগরীর বেশির ভাগ অঞ্চল। চট্টগ্রামের বিভিন্ন উপজেলা শহরেও দেখা গেছে জলাবদ্ধতা। বৃষ্টিপাত আরো দুদিন অব্যাহত থাকতে পারে বলে জানিয়েছে আবহাওয়া অফিস। টানা বর্ষণে চট্টগ্রামে পাহাড়ধসের পাশাপাশি ভূমিধস হতে পারে বলেও আশঙ্কা করা হচ্ছে। এ অবস্থায় পাহাড়ে বসবাসকারীদের সরিয়ে নিতে তিনদিন ধরে মাইকিং করছে স্থানীয় প্রশাসন।
টানা বৃষ্টিপাতের কারণে নগরীর নিম্নাঞ্চলে জলাবদ্ধতার সৃষ্টি হয়েছে। নগরীর পাঁচলাইশ, কাতালগঞ্জ, চকবাজার, বাদুরতলা, বহদ্দারহাট, মুরাদপুর, শোলকবহর, ২ নম্বর গেট, হালিশহর, বাকলিয়া, আগ্রাবাদসহ বিভিন্ন এলাকার সড়ক পানিতে তলিয়ে গেছে। অনেক নিচু এলাকার বাসাবাড়িতে জলাবদ্ধতা দেখা গেছে। ডুবে গেছে অনেক দোকানপাট।
পতেঙ্গা আবহাওয়া অফিসের আবহাওয়া পূর্বাভাস কর্মকর্তা মো. জহিরুল ইসলাম বণিক বার্তাকে জানান, মঙ্গলবার সন্ধ্যা ৬টা পর্যন্ত গত ২৪ ঘণ্টায় ১১৯ মিলিমিটার বৃষ্টিপাত হয়েছে। আগামী ৪৮ ঘণ্টায় চট্টগ্রামে ভারি থেকে অতিভারি বৃষ্টিপাতের সম্ভাবনা রয়েছে। তবে চট্টগ্রামে পাহাড়ধসের ঘটনা ঘটতে পারে। এছাড়া চট্টগ্রাম সমুদ্রবন্দরকে ৩ নম্বর সতর্ক সংকেত দেখাতে বলা হয়েছে। আগামী ৪৮ ঘণ্টা পর থেকে আবহাওয়া কিছুটা ভালো হতে পারে। বৃষ্টিও কমে আসবে। দক্ষিণাঞ্চল ও তৎসংলগ্ন এলাকায় অবস্থানরত লঘুচাপটি বর্তমানে মধ্যাঞ্চল ও তৎসংলগ্ন এলাকায় অবস্থান করছে। উত্তর বঙ্গোপসাগর, বাংলাদেশের উপকূলীয় এলাকা এবং সমুদ্রবন্দরের ওপর দিয়ে দমকা ও ঝড়ো হাওয়া বয়ে যেতে পারে।
ফেনী: ফুলগাজী ও পরশুরাম উপজেলার নিম্নাঞ্চল প্লাবিত হয়েছে। অন্তত ৭০টি গ্রামের রাস্তাঘাট, বাড়িঘর প্লাবিত হয়েছে। প্রায় ১৬ হাজার মানুষ পানিবন্দি। প্রশাসনের পক্ষ থেকে শুকনো খাবার বিতরণ চলমান। সর্বশেষ গতকাল বিকাল পর্যন্ত মুহুরী, কহুয়া ও সিলোনিয়া নদীর পানি বিপৎসীমার ৫৫ সেন্টিমিটার ওপর দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছিল। ফুলগাজী ও পরশুরামে নদী রক্ষা বাঁধে ভাঙনের কারণে তিন দফায় বন্যার কবলে পড়েছে নদীতীরবর্তী এলাকার বাসিন্দারা।
পরশুরাম উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা আফরোজা হাবিব জানান, পরশুরাম উপজেলায় বন্যায় আগেই বাঁধের ১২টি স্থানে ভাঙনের সৃষ্টি হয়েছিল। কয়েকদিনের বৃষ্টি এবং ভাঙনের স্থান দিয়ে উজান থেকে নেমে আসা ঢলের কারণে পরশুরাম পৌরসভা এবং তিনটি ইউনিয়নের প্রায় ৪০টি গ্রাম বন্যায় প্লাবিত হয়েছে। এসব গ্রামের প্রায় ১০ হাজার পরিবার পানিবন্দি।
ফুলগাজী উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা তানিয়া ভূঁইয়া জানান, মুহুরী, সিলোনিয়া, কহুয়া নদীর পানি বেড়ে উপজেলার ফুলগাজী ইউনিয়নের, মুন্সিরহাট ইউনিয়নের, আমজাদহাট ইউনিয়নের ৩০টি গ্রাম প্লাবিত হয়েছে। পানিবন্দি হয়েছে প্রায় ছয় হাজার পরিবার।
নোয়াখালী: ভারি বর্ষণে জলাবদ্ধা দেখা দিয়েছে নোয়াখালীতে। এতে ঘরবন্দি হয়ে পড়েছে লক্ষাধিক মানুষ। পানিতে নিমজ্জিত হয়েছে বাজারঘাট, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, সড়ক, কৃষিজমি ও মাছের ঘের। জেলার পাঁচটি উপজেলার শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বন্ধ ঘোষণা করেছে প্রশাসন। জলাবদ্ধতা স্থায়ী হওয়ায় বাড়ছে জনদুর্ভোগ। পানি নিষ্কাশনে পানি উন্নয়ন বোর্ডসহ প্রশাসনের তেমন কোনো উদ্যোগ চোখে পড়েনি।
খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, জেলা সদর, বেগমগঞ্জ, সুবর্ণচর, কবিরহাট ও কোম্পানীগঞ্জ উপজেলার বেশির ভাগ এলাকায় জলাবদ্ধতা দেখা দিয়েছে। আমনের ক্ষতি হয়েছে। তলিয়ে গেছে বীজতলা। সুবর্ণচর ও সদর উপজেলায় শরৎকালীন সবজি পানিতে নিমজ্জিত হয়েছে। জলাবদ্ধতার কারণে জেলার সদর, বেগমগঞ্জ, সুবর্ণচর, কবিরহাট ও কোম্পানীগঞ্জ উপজেলার সব শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান সাময়িক বন্ধ ঘোষণা করেছে প্রশাসন।
জেলা প্রশাসক দেওয়ান মাহাবুবুর রহমান জানান, জলাবদ্ধতা নিরসনে প্রশাসনের পাশাপাশি পানি উন্নয়ন বোর্ড কাজ করছে। পানি সরে গেলে পুনরায় শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলো খুলে দেয়া হবে।
সিলেট: মৌসুমি বায়ুর প্রভাবে সিলেটেও বৃষ্টিপাত হচ্ছে। গতকাল বিকাল ৩টা পর্যন্ত ২১৪ মিলিমিটার বৃষ্টিপাত হয়েছে, যা দেশের মধ্যে সর্বোচ্চ। সিলেট আবহাওয়া অফিস এ তথ্য জানিয়েছে।
সিলেট পানি উন্নয়ন বোর্ড সূত্রে জানা গেছে, বৃষ্টিপাত বাড়ায় নদ-নদীর পানিও বেড়েছে। এর মধ্যে কুশিয়ারা নদীর ফেঞ্চুগঞ্জ পয়েন্টে পানি বিপৎসীমার ওপর দিয়ে প্রবাহিত হতে শুরু করেছে। নদীর ওই পয়েন্টে গতকাল সন্ধ্যা ৬টায় পানি বিপৎসীমার ৫০ সেন্টিমিটার ওপর দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছিল। এছাড়া সুরমা, সারিঘাট, ধলাই নদের পানিও বেড়েছে। তবে সেগুলোর পানি বিপৎসীমা অতিক্রম না করলেও কাছাকাছি পৌঁছেছে।
কুমিল্লা: টানা বৃষ্টি ও উজানের পানিতে চৌদ্দগ্রাম প্লাবিত হয়েছে। পৌরসভাসহ উপজেলার ১৩ ইউনিয়নের প্রায় ৫০ হাজার মানুষ পানিবন্দি হয়ে পড়েছে। বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েছে আঞ্চলিক সড়ক যোগাযোগ। পানি প্রবেশ করেছে উপজেলা পরিষদ ও স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে। বন্ধ রয়েছে চিকিৎসাসেবা। ভেসে গেছে মাছের ঘের, দীঘি ও পুকুর।
উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মোহাম্মদ রহমত উল্লাহ বলেন, ‘টানা বৃষ্টি ও উজানের পানির কারণে জলাবদ্ধতা দেখা দিয়েছে। উপজেলা পরিষদ এলাকায় পানি প্রবেশ করায় নাগরিক সেবা বন্ধ রয়েছে। পৌরসভা এলাকায় পানি নিষ্কাশন করতে পৌরসভার কর্মকর্তা-কর্মচারীরা মাঠে কাজ করছেন।










