ধীরগতি আর কয়েক দফা বন্ধ থাকায় খুব বেশি অগ্রগতি হয়নি খুলনার ভৈরব সেতু নির্মাণকাজে। যোগাযোগ ব্যবস্থার উন্নয়নে ২০২১ সালে নির্মাণ শুরু হলেও এখন পর্যন্ত কাজের অগ্রগতি হয়েছে ১৪ শতাংশ। সেতুর ৩০টি পিয়ারের (কাঠামো) মধ্যে মাত্র নয়টিতে থমকে রয়েছে নির্মাণকাজ। এছাড়া ৩০৮টি সার্ভিল পাইলের মধ্যে নির্মাণ হয়েছে ৪৬টি। ২০২২ সালের ২৫ নভেম্বর কাজ শেষ হওয়ার কথা ছিল। তবে তা শেষ না হওয়ায় সময় বাড়ানো হয় চলতি বছরের ৩০ জুন পর্যন্ত। দ্বিতীয় মেয়াদেও কাজ শেষ না হওয়ায় তৃতীয় দফায় আরো দুই বছর সময় বাড়ানো হয়েছে।
প্রকল্প সূত্রে জানা গেছে, ২০১৯ সালের ১৭ ডিসেম্বর জাতীয় অর্থনৈতিক পরিষদের নির্বাহী কমিটির (একনেক) সভায় প্রকল্পটি পাস হয়। ১ দশমিক ৩১৬ কিলোমিটার দৈর্ঘ্যের সেতুটি নির্মাণে ব্যয় ধরা হয়েছে ৬১৭ কোটি ৫৩ লাখ টাকা। এর মধ্যে মূল সেতু নির্মাণে ব্যয় হবে প্রায় ৩০৩ কোটি টাকা। জমি অধিগ্রহণে ব্যয় ধরা হয়েছে ২৮১ কোটি টাকা। বাকি টাকা সেতুসংশ্লিষ্ট কাজে ব্যয় হবে। ২০২০ সালের ২৭ জুলাই নির্মাণকাজের দরপত্র আহ্বান করে সড়ক ও জনপথ (সওজ) বিভাগ। প্রক্রিয়া শেষে ২০২০ সালের ১২ নভেম্বর সরকারি ক্রয়সংক্রান্ত মন্ত্রিসভা কমিটি অনুমোদন দেয়। ২০২০ সালের ২৬ নভেম্বর ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানকে কার্যাদেশ দেয়া হয়। কার্যাদেশ পাওয়ার ছয় মাস পর অর্থাৎ ২০২১ সালের ২৪ মে কাজ শুরু করে ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান।
প্রকল্পের নকশা অনুযায়ী, সেতুতে পিয়ার বসবে ৩০টি। এর মধ্যে শহর অংশের কুলিবাগান থেকে রেলগেট পর্যন্ত ১-১৪ নম্বর পিয়ার এবং দিঘলিয়া প্রান্তে ১৭-২৮ নম্বর পিয়ার বসবে। রেলগেট প্রান্তে নদের পাড় থেকে ৪২ মিটার ভেতরে ১৫ নম্বর এবং দিঘলিয়া প্রান্তে নদের পাড় থেকে ১৮ মিটার ভেতরে ১৬ নম্বর পিয়ার বসবে। নতুন প্রস্তাবে মূল সেতু কংক্রিটের পরিবর্তে হবে আর্চ স্টিলের। এরই মধ্যে সংশোধিত নকশা তৈরির কাজ সম্পন্ন করেছে সড়ক বিভাগ। চূড়ান্ত অনুমোদনের জন্য এটি সড়ক পরিবহন ও সেতু মন্ত্রণালয়ে পাঠানো হয়েছে।
সওজ বিভাগ বলছে, সেতুটি এখন ১০০ মিটারের পরিবর্তে ১৬০ মিটার কংক্রিটের এবং ৭ দশমিক ৩ মিটারের পরিবর্তে ১০ দশমিক ২ মিটার প্রশস্ত করার প্রস্তাবনা হয়েছে। সংশোধিত প্রস্তাবনায় সেতুর প্রশস্ততা বাড়ানো হলে পাশাপাশি দুটি গাড়ি ক্রস করতে পারবে। তবে প্রকল্পটি সংশোধিত কিংবা প্রকল্পের নকশায় পরিবর্তন আনা হলেও প্রকল্পের ব্যয় বৃদ্ধি পাবে না। জমি অধিগ্রহণের উদ্বৃত্ত অর্থ দিয়েই সংশোধিত প্রকল্পের ব্যয় মেটানো হবে।
এদিকে নির্মাণকাজের ধীরগতিতে ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন নদের দুই পারের মানুষ। ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের গাফিলাতিকেই দুষছেন তারা। শহরাংশের অধিগ্রহণকৃত জমির ওপর থেকে স্থাপনা অপসারণ কাজ চলছে ধীরগতিতে। এ অংশে রেলের জায়গার কোনো সুরাহা হয়নি। ফলে প্রকল্পের মেয়াদ দুই বছর বাড়লেও ২০২৬ সালের ৩০ জুনের মধ্যে কাজ শেষ হওয়া নিয়েও শঙ্কা প্রকাশ করেছেন তারা। তবে সওজ বিভাগের কর্মকর্তারা বলছেন, সব জটিলতা নিরসন করে দুই বছরের মধ্যেই কাজ শেষ করা হবে।
ধীরগতির বিষয়ে ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান কর্তৃপক্ষ বলছে, এখনো ভূমি অধিগ্রহণ শেষ হয়নি। এছাড়া নির্মাণসামগ্রীর দাম বাড়াসহ বিভিন্ন সংকটে তারা কাজ করতে পারছে না।
ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান ওয়াহিদ কনস্ট্রাকশনের ব্যবস্থাপক এসএম নাজমুল বণিক বার্তাকে বলেন, ‘প্রকল্পের কাজ শুরুর পর থেকে জমি ঠিকভাবে বুঝিয়ে দেয়া হয়নি। এখনো আমরা জমি বুঝে পাইনি শহর প্রান্তে। ফলে আমরা ঠিকভাবে কাজ করতে পারছি না। সেই সঙ্গে সব ধরনের নির্মাণসামগ্রীর দাম বেড়েছে। তবে নতুন নির্ধারিত সময়ে আমরা সেতু নির্মাণ শেষ করতে পারব।’
এ প্রসঙ্গে খুলনা সওজ বিভাগের নির্বাহী কর্মকর্তা আনিসুজ্জামান মাসুদ বণিক বার্তাকে বলেন, ‘ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানকে আমরা তাগিদ দিচ্ছি কাজের গতি বাড়াতে। সেতু প্রকল্পের জমি অধিগ্রহণ নিয়ে কিছু জটিলতা ছিল। দিঘলিয়া প্রান্তে আমরা ঠিকাদার প্রতিষ্ঠানকে জমি বুঝিয়ে দিয়েছি। আর শহর প্রান্তে আমরা জমি বুঝে পাওয়ার জন্য শিগগিরই উচ্ছেদ অভিযান শুরু করব। রেলওয়ের সঙ্গে আমাদের জমি হস্তান্তর কার্যক্রমও অনেকটা এগিয়েছে।’
ভূমি অধিগ্রহণসহ অন্যান্য জটিলতা কাটিয়ে প্রকল্পের কাজের গতি বাড়ানোর আশ্বাস দিয়েছেন খুলনার জেলা প্রশাসক খন্দকার ইয়াসির আরেফিন। বণিক বার্তাকে তিনি বলেন, ‘রেলওয়ের সঙ্গে জমি হস্তান্তর চুক্তি আর শহর প্রান্তের ভূমি অধিগ্রহণ নিয়ে জটিলতা ছিল। সেসব জটিলতা কাটানোর জন্য আমরা কয়েকটি সভা করেছি। আশা করছি দ্রুতই এসব জটিলতা নিরসন হবে।’










