এক আইনজীবীকে জরিমানার আদেশ নিয়ে আপিল বিভাগে সুপ্রিম কোর্ট আইনজীবী সমিতির সভাপতি ব্যারিস্টার এএম মাহবুব উদ্দিন খোকনের বক্তব্যের একপর্যায়ে প্রধান বিচারপতি জুবায়ের রহমান চৌধুরীসহ পূর্ণাঙ্গ বেঞ্চ এজলাস ছেড়ে গেছেন। গতকাল দুপুরে আপিল বিভাগের আদালত কক্ষে এ ঘটনা ঘটে।
প্রধান বিচারপতির নেতৃত্বাধীন পাঁচ সদস্যের আপিল বেঞ্চে ছিলেন বিচারপতি মো. রেজাউল হক, বিচারপতি এসএম এমদাদুল হক, বিচারপতি ফারাহ মাহবুব এবং বিচারপতি মো. হাবিবুল গণি।
পরে এ বিষয়ে ব্যারিস্টার মাহবুব উদ্দিন খোকন সাংবাদিকদের বলেন, ‘এক আইনজীবীকে ৫ লাখ টাকা জরিমানা করা হয়েছে। আমি প্রধান বিচারপতির উদ্দেশে বিনয়ের সঙ্গে বললাম, “আপনি প্রধান বিচারপতি হওয়ার পর আসলে মামলা শুনানি করা যাচ্ছে না আগের মতো। এ কারণে ল-ইয়ারদের ইনকাম কমে গেছে। একজন জুনিয়র ল-ইয়ারকে ৫ লাখ টাকা কস্ট দেয়াটা অনেক বেশি হয়ে গেছে। উনাকে মাফ করে দেন।” তখন প্রধান বিচারপতি বললেন যে আমি চিফ জাস্টিস হওয়ার পর কি ল-ইয়ারদের ইনকাম কমে গেছে? আমি তখন বললাম, ইনকাম ওই সেন্সে কমে গেছে—বোঝাতে চেয়েছি আগে আপিল বিভাগে ১১ জন বিচারপতি ছিল। তিনটা বেঞ্চ ছিল। এখন একটা বেঞ্চ।’
মাহবুব উদ্দিন খোকন আরো বলেন, ‘একটা মামলা স্টে হলে...সেখানে শুনানি করতে পারছি না। এমনকি চেম্বার আদালতে স্টে করছে, তা হিয়ারিং করতে এক বছর লাগে। ওখানে কোনো মেনশন করা যায় না কেন এই মামলাটা ওপরে ছিল (কজলিস্টে), নিচে গেল কেন এবং যেহেতু একটা বেঞ্চ, মানুষ দীর্ঘদিন থেকে ন্যায়বিচার পাচ্ছে না, মামলা শুনানি করতে পারছে না। মামলা হলে আইনজীবীদের ইনকাম হবে। কম হোক, বেশি হোক। আমি খুব বিনয়ের সঙ্গে বললাম।’
পরে নিজ কার্যালয়ে এ বিষয়ে ব্রিফিং করেন অ্যাটর্নি জেনারেল মো. রুহুল কুদ্দুস কাজল। তিনি বলেন, ‘প্রধান বিচারপতি বিচারিক শৃঙ্খলা, সততা প্রাধান্য দেন। কোনো প্রতারণা যদি দেখেন, তা সিরিয়াসলি ডিল করেন।’
২০১৩ সালে একজন কাজি নিয়োগ থেকে শুরু হওয়া ঘটনা উল্লেখ করে রুহুল কুদ্দুস বলেন, ‘যেখানে মামলার বাদী পাঁচটি রিট দায়ের করেছেন একই আদেশ চ্যালেঞ্জ করে।...পাঁচটি রিট দায়ের করেছেন অথচ পূর্বে রিজেক্ট হওয়ার আদেশটি পরবর্তী রিটে উল্লেখ করা হয়নি। যে কারণে নারী আইনজীবীকে আপিল বিভাগ ফাইন করেছেন ৫ লাখ টাকা এবং রিট আবেদনকারীকে ৫ লাখ টাকা, যে টাকা সুপ্রিম কোর্টের পক্ষ থেকে ঢাকা শিশু হাসপাতালে জমা দেয়ার কথা বলা হয়েছে। নারী আইনজীবীর বক্তব্য অনুযায়ী, মামলায় সিনিয়র আইনজীবী ছিলেন এএম মাহবুব উদ্দিন খোকন। সকালে যখন আদেশ হয়, তখন নারী আইনজীবী আমার পাশে বসে আদেশটি শুনেছেন; মাহবুব উদ্দিন উপস্থিত ছিলেন না।’
ওই মামলায় সকাল সোয়া ৯টার দিকে আদেশ হয় বলে জানান অ্যাটর্নি জেনারেল রুহুল কুদ্দুস কাজল। তিনি বলেন, ‘আর এ ঘটনার (এজলাস ত্যাগ) অবতারণা হচ্ছে ১২টা ৩৫ সময়।...অন্য একটি মামলার সময় মাহবুব উদ্দিন খোকন ওই প্রসঙ্গে (খরচা আরোপ) বললেন যে “একজন আইনজীবীকে আপনারা ফাইন করেছেন।” এর পরিপ্রেক্ষিতে তখন প্রধান বিচারপতি বলেন, “দেখেন, আমরা সবকিছুতে দেখে–শুনে একটা আদেশ দিয়েছি, আমাদের আদেশ আমরা পরিবর্তন করব না। কারণ, ওনাদের (আদালত) বক্তব্য অনুযায়ী সিরিয়াস ফ্রড করা হয়েছে। আদালতের সঙ্গে প্রতারণা এমনকি সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগের ইতিপূর্বের আদেশও ফ্রড করা হয়েছে।” এ পরিস্থিতিতে বললেন, “আপনি (মাহবুব উদ্দিন খোকন) এটা বলবেন না।”’
অ্যার্টনি জেনারেল রুহুল কুদ্দুস বলেন, ‘তখন অত্যন্ত অপ্রত্যাশিতভাবে মাহবুব উদ্দিন খোকন বলে ফেললেন যে ‘আপনি প্রধান বিচারপতি হওয়ার পরে আইনজীবীদের ইনকাম কমে গেছে।’ বিষয়টি প্রধান বিচারপতি একটু লাইটলি নিলেন। তারপরে বললেন, ‘আপনি (মাহবুব উদ্দিন খোকন) কি এটা মিন করেন? মাহবুব উদ্দিন খোকন অনেকটা সেই একই কথা বলার যখন চেষ্টা করেন, তখন প্রধান বিচারপতি বলেছেন যে ‘আপনি (খোকন) যে কথাটা বলেছেন, সেটা অ্যাবসলিউটলি আদালত অবমাননার শামিল। যেহেতু আপনি এত বড় একটা কথা বলেছেন, আমি আজকে আর আদালতের কার্যক্রমে অংশগ্রহণ করব না।’ এ কথা বলে উনি (প্রধান বিচারপতি) উঠে (এজলাস থেকে) গেছেন।’










