এ ঘটনায় অভিযুক্ত দুজনকে গ্রেফতার করা হয়েছে। হত্যাকাণ্ড গোপন রাখতে ডাকাতির ঘটনা সাজানোর চেষ্টা করেন অপরাধীরা। গতকাল দুপুরে নিজ কার্যালয়ে রংপুর মেট্রোপলিটন পুলিশের কমিশনার মোহাম্মদ আবদুল মাবুদ এক প্রেস ব্রিফিংয়ে এসব তথ্য জানান।

গ্রেফতারকৃতরা হলেন নগরীর মাছুয়াপাড়া এলাকার কানুদাসের ছেলে মুগ্ধ দাস (২৩) ও বিনয়চন্দ্র দাসের ছেলে সিদ্ধার্থ দাস (১৯)।

পুলিশ কমিশনার মোহাম্মদ আবদুল মাবুদ জানান, গত বৃহস্পতিবার শেষ রাতের দিকে মুগ্ধ ও সিদ্ধার্থ পাশের বিল্ডিংয়ের ওপর দিয়ে গণপতিদের ছাদে আসেন। তারা ছাদে বসে ইয়াবা সেবন করছিলেন। শব্দ পেয়ে গণপতি ছাদে গিয়ে তাদের ইয়াবা সেবন করা দেখে ফেলেন। এ বিষয়ে তাদের জিজ্ঞাসা করলে পরিচয় গোপন রাখার জন্য গণপতির গলায় থাকা গামছা দিয়েই পেঁচিয়ে তাকে হত্যা করা হয়। তার চিৎকার শুনে সিঁড়ি দিয়ে ওঠার সময় প্রীতিলতা চক্রবর্তীকেও গামছা পেঁচিয়ে হত্যা করা হয়। এরপর মায়ের চিৎকারে এগিয়ে আসা মেয়ে প্রার্থী চক্রবর্তীকেও একই গামছা ও রশি পেঁচিয়ে হত্যা করা হয়। গ্রেফতারকৃতরা জানিয়েছেন, প্রার্থীকে হত্যা করতে বেগ পেতে হয় তাদের। নিথর হতে তার ৪-৫ মিনিট লাগে। সে সময় মুগ্ধ ও সিদ্ধার্থ রশি দিয়ে তার গলা ও মুখ পেঁচিয়ে ধরে। শেষে ঘুমন্ত অবস্থায় শিশু প্রিয়মকে কাপড় পেঁচিয়ে ও বালিশ চাপা দিয়ে হত্যা করা হয়।

তিনি আরো জানান, হত্যাকাণ্ডের পর অভিযুক্তরা বাসার একটি বাথরুমে গোসল করেন। ডাইনিং টেবিলে বসে খেজুর ও অবশিষ্ট ইয়াবা সেবন করেন। এরপর জুমার নামাজের সময় রাস্তাঘাট ফাঁকা হলে তারা কিছু স্বর্ণালংকার নিয়ে বাসা থেকে বের হয়ে যান। পরে সেগুলো পাশের একটি মন্দিরের পেছনে পরিত্যক্ত জায়গায় লুকিয়ে রাখেন। গ্রেফতারকৃতদের তথ্যের ভিত্তিতে সব আলামত জব্দ করা হয়েছে।

পুলিশ কমিশনার জানান, তদন্তকে ভিন্ন খাতে প্রবাহিত করার জন্য অভিযুক্তরা ঘরের জিনিসপত্র এলোমেলো করে রাখেন, যাতে পুলিশ এটিকে ডাকাতি বলে মনে করে। এছাড়া আঙুলের ছাপ যাতে না থাকে সেজন্য বাসার দুটি মোবাইল ফোন ডিটারজেন্ট মিশ্রিত পানিতে ভিজিয়ে রাখা হয় বলেও জানান তিনি।

এর আগে গত শনিবার রাত ১১টার দিকে রংপুর নগরীর মাছুয়াপাড়ার একটি বাসা থেকে গণপতি চক্রবর্তী জুয়েল (৬৫), তার স্ত্রী প্রীতিলতা চক্রবর্তী বালা (৫০), স্নাতকোত্তর শ্রেণীর শিক্ষার্থী মেয়ে আগামী চক্রবর্তী প্রার্থী (২৫) ও পঞ্চম শ্রেণী পড়ুয়া ছেলে আয়ুস চক্রবর্তী প্রিয়মের (১২) মরদেহ উদ্ধার করে পুলিশ।

স্থানীয়দের বরাতে জানা যায়, স্কুলশিক্ষকের বাসাটি বেশ কিছুদিন ধরে বাইরে থেকে তালাবদ্ধ অবস্থায় ছিল। দীর্ঘ সময় কোনো সাড়াশব্দ না পেয়ে ও ভেতর থেকে দুর্গন্ধ আসায় স্থানীয়দের মনে সন্দেহের সৃষ্টি হয়। পরে পুলিশে খবর দিলে তালা ভেঙে ঘরের ভেতর থেকে চারজনের মরদেহ উদ্ধার করা হয়। এদের মধ্যে শিক্ষক গণপতি চক্রবর্তী জুয়েলের মরদেহ দোতলার ছাদ, সিঁড়ি থেকে স্ত্রী প্রীতিলতা চক্রবর্তী বালা, কারমাইকেল কলেজে পড়ুয়া মেয়ে প্রার্থী চক্রবর্তী ও ঘরের খাটের নিচ থেকে ছেলে রংপুর জিলা স্কুলের পঞ্চম শ্রেণীর ছাত্র প্রিয়ম চক্রবর্তীর মরদেহ উদ্ধার করা হয়।

জানা গেছে, স্কুলশিক্ষক গণপতি চক্রবর্তী জুয়েল গত বছরের ডিসেম্বরে শিক্ষকতা পেশা থেকে অবসরে যান। এরপর তিনি রংপুর সমবায় মার্কেটে একটি হোমিওপ্যাথি চেম্বারে নিয়মিত চিকিৎসাসেবা দিতেন। তার নিজ গ্রামের বাড়ি রংপুরের মিঠাপুকুর উপজেলার মির্জাপুর এলাকায়।