মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধ পরিস্থিতির অভিঘাতে বাংলাদেশের তরলীকৃত পেট্রোলিয়াম গ্যাসের (এলপিজি) আমদানির উৎসে বড় পরিবর্তন এসেছে। এক বছর আগেও দেশের এলপিজি আমদানি ছিল মূলত উপসাগরীয় দেশগুলোর ওপর নির্ভরশীল। সে সময় মোট আমদানির ৪১ শতাংশের বেশি আসত ওমান থেকে। এছাড়া ইরাক, সৌদি আরব ও সংযুক্ত আরব আমিরাতও ছিল এলপিজি আমদানির অন্যতম উৎস। তবে মধ্যপ্রাচ্যে যুদ্ধ ছড়িয়ে পড়ার পর এ চিত্র পাল্টে গেছে। উপসাগরীয় দেশগুলোর পরিবর্তে বাংলাদেশের এলপিজি আমদানির প্রধান উৎস হয়ে উঠেছে যুক্তরাষ্ট্র। চলতি বছরের সেপ্টেম্বর পর্যন্ত মোট আমদানির প্রায় ৮৫ শতাংশই এসেছে দেশটি থেকে।

বাংলাদেশ এনার্জি রেগুলেটরি কমিশনের (বিইআরসি) তথ্য অনুযায়ী, চলতি বছরের সেপ্টেম্বর পর্যন্ত যুক্তরাষ্ট্রের বাইরে মালয়েশিয়া থেকে এসেছে মোট এলপিজি আমদানির ৩ শতাংশ এবং আফ্রিকার দুই দেশ ডেমোক্রেটিক রিপাবলিক অব কঙ্গো ও রিপাবলিক অব কঙ্গো থেকে প্রায় ৭ শতাংশ। অর্থাৎ মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধ পরিস্থিতিতে এলপিজি আমদানির প্রচলিত উৎসগুলো থেকে সরে এসে বাংলাদেশ এখন অনেকাংশেই নির্ভরশীল হয়ে পড়েছে দূরবর্তী যুক্তরাষ্ট্রের ওপর।

অথচ ২০২৫ সালের সেপ্টেম্বর পর্যন্ত দেশের এলপিজি আমদানির প্রধান উৎস ছিল ওমান। সে সময় মোট আমদানির ৪১ শতাংশের বেশি এসেছিল দেশটি থেকে। এছাড়া যুক্তরাষ্ট্র থেকে ২৭ দশমিক ৪ শতাংশ, ইরাক থেকে ২১ শতাংশ, মালয়েশিয়া থেকে ৫ শতাংশ, সৌদি আরব থেকে ৪ শতাংশ এবং সংযুক্ত আরব আমিরাত থেকে ২ শতাংশ এলপিজি আমদানি হয়েছিল। এক বছরের ব্যবধানে আমদানির উৎসে এ বড় পরিবর্তন দেশের জ্বালানি সরবরাহ ব্যবস্থায় নতুন ভূরাজনৈতিক ঝুঁকির বিষয়টিও সামনে এনেছে।

বিইআরসির তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫-২৬ অর্থবছরে দেশে প্রায় ১৭ লাখ ৪৩ হাজার টন এলপিজি আমদানি হয়েছে। দেশের এলপিজি বাজারের প্রায় ৯৯ শতাংশই বেসরকারি অপারেটরদের নিয়ন্ত্রণে। আগের অর্থবছরেও এ হার ছিল প্রায় একই। আমদানিনির্ভর এ বাজারে আন্তর্জাতিক সরবরাহ ব্যবস্থায় বিঘ্ন কিংবা আমদানি ব্যয় বাড়ার প্রভাব সরাসরি পড়ে দেশের বাজারে। ২০২৪-২৫ অর্থবছরেও বেসরকারি খাতের ওপর আমদানিনির্ভরতা ছিল প্রায় একই রকম।

দূরবর্তী দেশ থেকে এলপিজি আমদানি বাড়লেও এখন পর্যন্ত দেশের বাজারে পণ্যটির দাম নির্ধারণে এর কোনো প্রভাব পড়েনি বলে জানিয়েছেন বাংলাদেশ এনার্জি রেগুলেটরি কমিশনের (বিইআরসি) কর্মকর্তারা। তবে দীর্ঘমেয়াদে পরিবহন ব্যয় ও সময় বৃদ্ধির প্রভাব এলপিজির দামে পড়বে কিনা, তা খতিয়ে দেখছেন তারা।

বিষয়টি নিয়ে জানতে চাইলে বিইআরসির চেয়ারম্যান জালাল আহমেদ বণিক বার্তাকে বলেন, ‘এলপিজি আমদানির উৎস দেশ বদলে গেছে। কয়েক মাস ধরে এ পরিবর্তন ঘটছে। আগে উপসাগরীয় দেশ ওমান থেকে ৪১ শতাংশ এলপিজি আমদানি হতো। অথচ এক বছর ধরে দেশটি থেকে কোনো এলপিজি আসেনি। দূরবর্তী দেশ থেকে আমদানির কারণে জাহাজ ভাড়া ও পরিবহন সময়ের বিষয়টি সামনে এসেছে। আমরা এসব বিষয় বিবেচনায় নিচ্ছি।’

দেশে এলপিজির দাম নির্ধারণ করা হয় মূলত সৌদি আরামকোর ঘোষিত চুক্তিমূল্যের (সৌদি সিপি) ভিত্তিতে। প্রতি মাসে প্রোপেন ও বিউটেনের পৃথক মূল্য ঘোষণা করে প্রতিষ্ঠানটি। এ দুই উপাদানের মূল্যকে ভিত্তি ধরে এর সঙ্গে আমদানি ব্যয়, পরিবহন খরচসহ ভোক্তাপর্যায়ে পৌঁছানো পর্যন্ত যাবতীয় ব্যয় হিসাব করে এলপিজির দাম নির্ধারণ করে বাংলাদেশ এনার্জি রেগুলেটরি কমিশন (বিইআরসি)।

চলতি বছরের ফেব্রুয়ারির শেষ দিকে ইরানকে কেন্দ্র করে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের সামরিক সংঘাত ছড়িয়ে পড়লে মধ্যপ্রাচ্যের জ্বালানি সরবরাহে অস্থিরতা তৈরি হয়। হরমুজ প্রণালিতে নিরাপত্তা ঝুঁকি, জাহাজ চলাচলে বিঘ্ন এবং বীমা ও পরিবহন ব্যয় বেড়ে যাওয়ায় বিকল্প উৎস খুঁজতে শুরু করেন আমদানিকারকরা। মধ্যপ্রাচ্য থেকে এলপিজি সংগ্রহ কঠিন হয়ে পড়ায় বাংলাদেশের ব্যবসায়ীরা যুক্তরাষ্ট্র থেকে আমদানি বাড়ান।

মধ্যপ্রাচ্যের তুলনায় যুক্তরাষ্ট্র থেকে পণ্য পরিবহনের দূরত্ব অনেক বেশি। ফলে জাহাজের ভাড়া, পরিবহন সময়, বীমা ও অন্যান্য লজিস্টিক ব্যয় বেড়ে যাওয়ার প্রভাব দেশের বাজারে রয়েছে বলে মনে করেন ব্যবসায়ীরা। এমনকি বিপুল পরিমাণ এলপিজির একক উৎস দেশ হয়ে পড়ায় সরবরাহ ব্যবস্থাপনায় ঝুঁকিও দেখছেন অনেকেই।

বিষয়টি নিয়ে জানতে চাইলে ফ্রেশ এলপি গ্যাসের চিফ মার্কেটিং অফিসার (সিএমও) আবু সাঈদ রাজা বণিক বার্তাকে বলেন, ‘যুদ্ধের কারণে জ্বালানি পণ্যের বাজার ও সরবরাহ ব্যবস্থায় বড় পরিবর্তন এসেছে। বাংলাদেশের এলপিজি আমদানির উৎসও বদলে গেছে। বর্তমানে ৮৫ শতাংশ এলপিজি আসছে যুক্তরাষ্ট্র থেকে। এতে আপত্তির কিছু নেই। তবে দুটি বড় সমস্যা তৈরি হয়েছে। প্রথমত, যুক্তরাষ্ট্র থেকে এলপিজি আসতে ৪৫-৫০ দিন লাগছে, যেখানে মধ্যপ্রাচ্য থেকে সর্বোচ্চ ১৫ দিন লাগত। দীর্ঘ পরিবহন সময়ের কারণে ঋণপত্র খুলে ব্যবসায়ীদের অর্থ আটকে থাকছে। দ্বিতীয়ত, একটি দেশের ওপর অতিরিক্ত নির্ভরশীলতা সরবরাহ ঝুঁকি বাড়াচ্ছে। কোনো কারণে একটি জাহাজ আটকে গেলেও পুরো সরবরাহ ব্যবস্থায় এর প্রভাব পড়তে পারে।’

যুদ্ধের প্রভাবে বিশ্বব্যাপী জ্বালানি সরবরাহে সংকট তৈরি হয়, যার অভিঘাত পড়ে বাংলাদেশেও। জ্বালানি তেলের সংকট অনেকটা কাটলেও এলপিজির বাজারে এখনো অস্থিরতা রয়ে গেছে। আমদানির পরিমাণে বড় ধরনের পরিবর্তন না এলেও সরবরাহ ও মূল্য নিয়ে সংকট কাটেনি। বিশেষ করে গত সেপ্টেম্বর ও অক্টোবরে দেশের বিভিন্ন এলাকায় ১২ কেজির এলপিজি সিলিন্ডার নির্ধারিত দামের চেয়ে ৪০০-৬০০ টাকা বেশি দামে বিক্রির অভিযোগ ওঠে। কোথাও কোথাও বাড়তি দাম দিয়েও সিলিন্ডার পাননি ভোক্তারা।

জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) তথ্য অনুযায়ী, চলতি বছর আগস্টে দেশে ১ লাখ ৫৭ হাজার ৭৬০ টন এলপিজি আমদানি হয়। সেপ্টেম্বরের প্রথম ২২ দিনেই আমদানি হয় ১ লাখ ১৮ হাজার ৭৪২ টন। বিইআরসির হিসাবে, দেশে প্রতি মাসে এলপিজির চাহিদা প্রায় ১ লাখ ৪২ হাজার থেকে দেড় লাখ টন। অর্থাৎ আমদানি ও চাহিদার পরিসংখ্যানে বড় ধরনের ঘাটতি না থাকলেও খুচরা বাজারে সংকট তৈরি হয়েছিল।

খাতসংশ্লিষ্টদের মতে, আন্তর্জাতিক বাজারে উচ্চ মূল্য, জাহাজ ভাড়া ও আমদানি ব্যয় বৃদ্ধির পাশাপাশি আমদানিকারক, পরিবেশক ও খুচরা বিক্রেতা পর্যায়ে সরবরাহ ব্যবস্থাপনার দুর্বলতাও সংকটকে বাড়িয়ে তুলছে। কিছু অপারেটর বাড়তি আমদানি ব্যয়ের সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে দাম সমন্বয়ের অপেক্ষায় বাজারে সরবরাহ কমিয়ে দিয়েছিল বলেও অভিযোগ রয়েছে।

এরই মধ্যে গত ২ নভেম্বর বিইআরসি নভেম্বরের জন্য ১২ কেজি এলপিজি সিলিন্ডারের দাম ২ হাজার ৬০ টাকা নির্ধারণ করেছে। আগের মাসে এ দাম ছিল ১ হাজার ৮৩৭ টাকা। অর্থাৎ এক মাসের ব্যবধানে ১২ কেজির সিলিন্ডারের দাম বেড়েছে ২২৩ টাকা। আন্তর্জাতিক বাজারে সৌদি আরামকোর কন্ট্রাক্ট প্রাইস (সৌদি সিপি) বৃদ্ধির সঙ্গে আমদানি ব্যয়ের প্রভাবও এ মূল্য সমন্বয়ে প্রতিফলিত হয়েছে।

দেশের বাজারে ৯৮ শতাংশ এলপিজি সরবরাহ করে বেসরকারি অপারেটররা। তারাই মূলত পণ্যটি আমদানি ও সরবরাহের কাজে নিয়োজিত রয়েছে। রেগুলেটরি কমিশন শুধু দাম ঘোষণা করছে। মধ্যপ্রাচ্য ও উপসাগরীয় উৎস থেকে এলএনজি আমদানি বন্ধ হয়ে যাওয়ায় পণ্যটির আমদানি ব্যয় কিংবা কোনো সংকট দেখছে না বেসরকারি অপারেটররা। তাদের ভাষ্য, বিশ্বের যেকোনো বাজারে এলপিজির দাম কাছাকাছি পর্যায়ে। শুধু জাহাজ ভাড়ার ক্ষেত্রে পরিবর্তন হচ্ছে। যুক্তরাষ্ট্রের বাজার থেকে নিরবচ্ছিন্নভাবে এলপিজি আনা গেলে তাতে কোনো ক্ষতি নেই। বরং পরিস্থিতিটা স্থিতিশীল হওয়া দরকার।

এলপিজি ব্যবসায়ীদের সংগঠন এলপিজি অপারেটরস অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (লোয়াব) সভাপতি মোহাম্মদ আমিরুল হক বণিক বার্তাকে বলেন, ‘আগে মধ্যপ্রাচ্য থেকে যে এলপিজি আমদানি হতো, তার বড় অংশ এখন আসছে যুক্তরাষ্ট্র থেকে। উৎস পরিবর্তনে সমস্যা নেই। গুরুত্বপূর্ণ হলো পণ্য দেশে পৌঁছাতে কত সময় লাগছে। পর্যাপ্ত অবকাঠামো থাকলে এটিও সমস্যা হতো না। বিগত সরকার প্রয়োজনীয় অবকাঠামো গড়ে তুলতে পারেনি, বেসরকারি খাতকেও সে সুযোগ দেয়নি। ফলে বৈশ্বিক সরবরাহ ব্যবস্থার পরিবর্তনের প্রভাব আমাদেরও মোকাবেলা করতে হচ্ছে। তবে বিশ্ববাজারে এলপিজির দামে উৎসভেদে খুব বেশি পার্থক্য নেই।’

জ্বালানি বিশেষজ্ঞদের মতে, আমদানিনির্ভরতা ও বেসরকারি খাতের ওপর অতিরিক্ত নির্ভরশীলতা দেশের এলপিজি বাজারের বড় দুর্বলতা। বছরে প্রায় ১৭-১৮ লাখ টন চাহিদার বিপরীতে সরকারি সরবরাহ খুবই কম। ফলে বড় কোনো আমদানিকারকের কার্যক্রম ব্যাহত হলে বাজারে সংকটের ঝুঁকি তৈরি হয়। এ ঝুঁকি কমাতে আমদানির উৎসে বৈচিত্র্য, দীর্ঘমেয়াদি সরবরাহ চুক্তি ও পর্যাপ্ত মজুদ সক্ষমতা গড়ে তোলা প্রয়োজন। ব্যবসায়ীদের মতে, বড় জাহাজ থেকে এলপিজি খালাসের উপযোগী টার্মিনাল ও সংরক্ষণাগার নির্মাণ করা গেলে পরিবহন ব্যয় কমবে। বর্তমানে ছোট জাহাজে আমদানির কারণে প্রতি টনে ব্যয় বেশি পড়ছে।