টানা কয়েক দিনের শ্রমিক আন্দোলন, বিক্ষোভ, সংঘর্ষ ও সড়ক অবরোধের পর গতকাল স্বাভাবিক ছিল দেশের পোশাক শিল্প অধ্যুষিত অঞ্চল। ঢাকার মিরপুর, সাভার, আশুলিয়া, টঙ্গী, নারায়ণগঞ্জ, গাজীপুর ও ময়মনসিংহের কোথাও শ্রমিক বিক্ষোভ কিংবা নতুন করে কোনো অপ্রীতিকর ঘটনার খবর পাওয়া যায়নি। গতকাল সাপ্তাহিক ছুটির কারণে এসব শিল্পাঞ্চলের প্রায় ৭০-৮০ শতাংশ পোশাক কারখানা বন্ধ ছিল বলে জানা গেছে। উৎপাদনের চাপ থাকায় বেশকিছু কারখানায় কাজ চলেছে সীমিত পরিসরে। বিপ্লব ও সংহতি দিবস উপলক্ষে আজও পোশাক কারখানা বন্ধ রাখার ঘোষণা রয়েছে। তবে কাজের চাপ বেশি থাকায় অতিরিক্ত সময়ের ভিত্তিতে ২০-৩০ শতাংশ কারখানা চালু রয়েছে। এদিকে পরিস্থিতি স্বাভাবিক থাকলেও শিল্পাঞ্চলের গুরুত্বপূর্ণ পয়েন্টগুলোয় সতর্ক অবস্থানে দায়িত্ব পালন করছেন আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যরা।
এ বিষয়ে গাজীপুর শিল্পাঞ্চল পুলিশের পুলিশ সুপার মোহাম্মদ আমজাদ হোসাইন জানান, গতকাল সাপ্তাহিক ছুটির কারণে অধিকাংশ কারখানা বন্ধ ছিল। তবে কাজের চাপ বেশি থাকায় কিছু কারখানায় অতিরিক্ত সময়ের ভিত্তিতে উৎপাদন কার্যক্রম চালানো হয়েছে। কোথাও কোনো শ্রমিক বিক্ষোভ বা অপ্রীতিকর ঘটনার খবর পাওয়া যায়নি। শিল্পাঞ্চলের সার্বিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী সতর্ক অবস্থানে ছিলেন।
তিনি আরো জানান, আজ ৭ নভেম্বর, বিপ্লব ও সংহতি দিবস উপলক্ষে বিজিএমইএর পক্ষ থেকে পোশাক কারখানা বন্ধ রাখার ঘোষণা রয়েছে। তবে অর্ডার বেশি থাকা কারখানাগুলো চালু মালিক পক্ষ রাখতে পারে। তাই শিল্পাঞ্চলে নিরাপত্তা বাহিনীর সদস্যরাও দায়িত্ব পালন করছেন।
গাজীপুর সিটি করপোরেশনের ভোগড়া চৌধুরীবাড়ী এলাকার স্টাইলিশ গার্মেন্টসের চেয়ারম্যান সালাউদ্দিন চৌধুরী বণিক বার্তাকে জানান, আন্দোলনের কারণে গত কয়েকদিন কারখানায় কাজ বন্ধ থাকায় গতকাল ছুটির দিনও বেশকিছু কারখানা খোলা ছিল। শ্রমিকরা শান্তিপূর্ণভাবে কাজ করতে পেরেছে। বায়ারদের ইমার্জেন্সি শিপমেন্ট ঠিক রাখার জন্য আমরা ওভারটাইম ভিত্তিতে কিছু কাজ করিয়ে নিয়েছি। তবে কাজ করার সময় কোনো ধরনের অপ্রীতিকর ঘটনা হয়নি বলে জানান এ শিল্পোদ্যোক্তা।
এদিকে আন্দোলনের সময় নিহত পোশাক শ্রমিক তৌফিক হোসেনের রুহের মাগফিরাত কামনায় গতকাল বিকালে গাজীপুরের চান্দনা চৌরাস্তা এলাকায় মিলাদ ও দোয়া মাহফিল অনুষ্ঠিত হয়েছে।
দোয়া মাহফিল শেষে অ্যাডভোকেট আলী নাছের খান বলেন, ‘শ্রমিকদের ন্যায্য মজুরির বিষয়ে সরকার এখনো সুনির্দিষ্ট ঘোষণা দেয়নি। নিহত তৌফিক হোসেনের মৃত্যুর ঘটনায় জড়িতদের দ্রুত বিচারের আওতায় আনা, তার স্মরণে সংশ্লিষ্ট সড়কের নামকরণ এবং আন্তর্জাতিক শ্রম সংস্থার (আইএলও) কনভেনশন অনুযায়ী তার পরিবারকে ক্ষতিপূরণ দেয়ার দাবি জানান তিনি।
এদিকে সাভার ও আশুলিয়ারও বেশকিছু গার্মেন্ট চালু ছিল। সেসব কারখানায় শ্রমিকদের কর্মচাঞ্চল্য দেখা গেছে। গতকাল এ অঞ্চলে শতাধিক কারখানা চালু ছিল বলে জানিয়েছেন শিল্প পুলিশ-১-এর এসপি মমিনুল ইসলাম ভূঁইয়া। তিনি বলেন, ‘শুক্রবার সপ্তাহিক ছুটির দিন হওয়ায় অধিকাংশ কারখানা এমনিতেই বন্ধ ছিল। আমাদের কাছে থাকা তথ্যে শতাধিক কারখানায় কাজ হয়েছে। শনিবারও এমন সংখ্যক কারখানা চালু থাকবে। তবে রোববার থেকে পুরোদমে সব কারখানা চালু হবে।’
তিনি আরো বলেন, ‘আমাদের নজরদারি অব্যাহত আছে। আগামী কয়েকদিন গুরুত্বপূর্ণ পয়েন্টে আমাদের অতিরিক্ত পুলিশ সদস্য মোতায়েন থাকবে।’
সাভারের আল মুসলিম গ্রুপের জেনারেল ম্যানেজার আবু রায়হান বলেন, ‘সম্প্রতি শ্রমিক অসন্তোষে অন্যদের মতো আমাদেরও ক্ষতি হয়েছে। তবু আমরা চেষ্টা করেছি কাজ চালিয়ে যেতে। আজকেও কিছু কিছু ফ্লোরে কাজ হয়েছে। আগামীকাল থেকে পুরোদমে কাজ শুরু হবে।’
এ সময় তিনি বলেন, ‘আমরা আমাদের শ্রমিকদের সর্বোচ্চ প্রাপ্য দিই। আমাদের শ্রমিকরা আন্দোলনে কোনো সময় যোগ দেননি। কিন্তু অন্যদের কারণে প্রভাব আমাদের ওপরও পড়েছে। এর ক্ষতি পোষাতে আমাদের অনেক সময় লাগবে।’
পোশাক শ্রমিকদের ন্যূনতম মাসিক মজুরি ১২ হাজার ৫০০ টাকা থেকে বাড়িয়ে ৩০ হাজার টাকা নির্ধারণের দাবিতে ১ নভেম্বর থেকে বিভিন্ন শিল্প এলাকায় আন্দোলন শুরু হয়। কয়েক দিনের মধ্যে গাজীপুরের কোনাবাড়ী, কাশিমপুর, সফিপুর, মৌচাক, পল্লী বিদ্যুৎ, চন্দ্রা, টঙ্গী ও ঢাকার মিরপুর, সাভার ও আশুলিয়ার বিভিন্ন এলাকায় তা ছড়িয়ে পড়ে। একপর্যায়ে ঢাকা-টাঙ্গাইল, ঢাকা-ময়মনসিংহ, ঢাকা-পাটুরিয়া মহাসড়কের বিভিন্ন স্থানে অবরোধ, কারখানায় ভাংচুর ও অগ্নিসংযোগের ঘটনা ঘটে। শ্রমিকদের সঙ্গে আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সংঘর্ষে আহত হন শ্রমিক ও পুলিশ সদস্যরা। আন্দোলনের মধ্যে গাজীপুরে শ্রমিক তৌফিক হোসেনের মৃত্যুর ঘটনাও শিল্পাঞ্চলে উত্তেজনা বাড়ায়।
(প্রতিনিধিদের পাঠানো খবর থেকে সংকলিত প্রতিবেদন)










