১৯৭৫ সালের ৩ নভেম্বর সামরিক অভ্যুত্থানে গৃহবন্দি হন মেজর জেনারেল জিয়াউর রহমান। চারদিন পর ৭ নভেম্বর ঢাকা সেনানিবাসে সৈনিক বিদ্রোহের মধ্য দিয়ে মুক্ত হয়ে পুনরায় সেনাপ্রধানের দায়িত্ব পান তিনি। এরপর সামরিক আইন প্রশাসনের সর্বোচ্চ পদে আসীন হন এবং ১৯৭৭ সালের এপ্রিলে রাষ্ট্রপতির দায়িত্ব গ্রহণ করেন। রাষ্ট্রক্ষমতা অর্জনের পর সামরিক পরিচয়ের বাইরে নিজের রাজনৈতিক অবস্থান গড়ে তোলার উদ্যোগ নেন তিনি। কৃষি ও গ্রামীণ উন্নয়ন, খাল খনন, স্বনির্ভর বাংলাদেশ কর্মসূচি এবং দেশব্যাপী সফরের মাধ্যমে সাধারণ মানুষের সঙ্গে সরাসরি যোগাযোগ বাড়ান। বহুদলীয় রাজনৈতিক কার্যক্রম পুনরায় চালু, নির্বাচন আয়োজন এবং বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি) গঠনের মধ্য দিয়ে সংগঠিত রাজনৈতিক জনভিত্তি প্রতিষ্ঠা করেন। ৭ নভেম্বরের সৈনিক বিদ্রোহ থেকে শুরু হওয়া এ ঘটনাপ্রবাহেই সেনা কর্মকর্তা থেকে রাষ্ট্রক্ষমতার কেন্দ্রে এবং পরবর্তী সময়ে রাজনৈতিক নেতা হিসেবে জিয়াউর রহমানের উত্থান ঘটে।
১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট শেখ মুজিবুর রহমানকে সপরিবারে হত্যার পর রাষ্ট্রক্ষমতায় আসেন খন্দকার মোশতাক আহমদ। একই মাসের ২৫ আগস্ট সেনাপ্রধান নিযুক্ত হন জিয়াউর রহমান। তবে সেনাবাহিনীর ভেতর আগস্টের হত্যাকাণ্ডে জড়িত কর্মকর্তাদের অবস্থান এবং সামরিক নেতৃত্বের কর্তৃত্ব নিয়ে অসন্তোষ বাড়ছিল। এরই মধ্যে ৩ নভেম্বর ব্রিগেডিয়ার খালেদ মোশাররফের নেতৃত্বে আরেকটি অভ্যুত্থান সংঘটিত হয়। খালেদ মোশাররফ ও তার সহযোগীরা ঢাকা সেনানিবাস এবং রাজধানীর অধিকাংশ গুরুত্বপূর্ণ এলাকার নিয়ন্ত্রণ নেন। ঢাকার আকাশে যুদ্ধবিমান ওড়ানো হয়। খন্দকার মোশতাকের কাছে চারটি দাবি উত্থাপন করেন খালেদ মোশাররফ। এর মধ্যে ছিল জিয়াউর রহমানকে সরিয়ে তাকে সেনাপ্রধান নিয়োগ, আগস্টের অভ্যুত্থানে জড়িতদের নিয়মিত সামরিক শৃঙ্খলার অধীনে আনা এবং মোশতাকের প্রতি অনুগত ট্যাংক বাহিনীকে নিরস্ত্র করা। অভ্যুত্থানের শুরুতেই জিয়াউর রহমানকে গৃহবন্দি করা হয়। এরপর কয়েক দিনের আলোচনার মধ্যে খালেদ মোশাররফ সেনাপ্রধানের দায়িত্ব পান। অন্যদিকে ৬ নভেম্বর খন্দকার মোশতাকের স্থলাভিষিক্ত হয়ে রাষ্ট্রপতির দায়িত্ব নেন প্রধান বিচারপতি আবু সাদাত মোহাম্মদ সায়েম।
এ সময় পরিস্থিতি আরো জটিল হয়ে ওঠে ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগারে চার জাতীয় নেতাকে হত্যার ঘটনায়। ৩ নভেম্বর সৈয়দ নজরুল ইসলাম, তাজউদ্দীন আহমদ, এম মনসুর আলী ও এএইচএম কামারুজ্জামানকে হত্যা করা হয়। একের পর এক অভ্যুত্থান ও হত্যাকাণ্ডে দেশের রাজনৈতিক ও সামরিক পরিস্থিতি চরম অনিশ্চয়তার মধ্যে পড়ে।
৩ নভেম্বরের অভ্যুত্থানের পর সেনাবাহিনীর নিম্নপদস্থ সদস্যদের মধ্যে অসন্তোষ দ্রুত ছড়িয়ে পড়ে। ৫ নভেম্বর থেকেই বিভিন্ন সেনানিবাসে বিদ্রোহের আহ্বানসংবলিত প্রচারপত্র বিতরণ করছিল জাতীয় সমাজতান্ত্রিক দল (জাসদ) এবং তাদের সামরিক সংগঠনের নেতাকর্মীরা। বিপ্লবী সৈনিক সংস্থার নামে প্রচারিত এসব পত্রে সাধারণ সেনাসদস্যদের কর্মকর্তাদের ক্ষমতার লড়াইয়ের হাতিয়ার না হওয়ার আহ্বান জানানো হয়। একই সঙ্গে সামরিক বাহিনীর ‘শ্রেণীবিন্যাস ও বৈষম্যের’ বিরুদ্ধে সংগঠিত হওয়ার কথা বলা হয়। অবসরপ্রাপ্ত লেফটেন্যান্ট কর্নেল আবু তাহের বিদ্রোহের অন্যতম সংগঠক ছিলেন। ৭ নভেম্বর ভোরে ঢাকা সেনানিবাসে সাধারণ সৈনিকদের বিদ্রোহ শুরু হয়। খালেদ মোশাররফের নেতৃত্বাধীন সামরিক কর্তৃত্ব ভেঙে পড়ে। বিদ্রোহের মধ্যে খালেদ মোশাররফ নিহত হন। গৃহবন্দিদশা থেকে মুক্ত হন জিয়াউর রহমান এবং পুনরায় সেনাপ্রধানের দায়িত্ব নেন।
৩ থেকে ৭ নভেম্বরের মধ্যে সেনানিবাসে ব্যাপক বিশৃঙ্খলা ও সেনা কর্মকর্তা হতাহতের ঘটনা ঘটে। জাতীয় অধ্যাপক ড. মাহবুব উল্লাহ্ বণিক বার্তাকে বলেন, ‘ওই সময় সেনাবাহিনীর ভেতরে জাতীয় সমাজতান্ত্রিক দলের (জাসদ) প্রভাব বিস্তারের প্রচেষ্টাও সক্রিয় ছিল। জাসদের সহযোগী সংগঠন বিপ্লবী সৈনিক সংস্থা সেনাসদস্যদের মধ্যে সংগঠিত হচ্ছিল। তাদের স্লোগান ছিল, “সিপাহি সিপাহি ভাই ভাই, সেনা অফিসারদের রক্ত চাই”। এ ধরনের স্লোগান সেনাবাহিনীর শৃঙ্খলা ও কাঠামোর জন্য মারাত্মক হুমকি তৈরি করেছিল। এর ফলে কয়েকজন সামরিক কর্মকর্তা নিহত হন। এমন পরিস্থিতিতে ৬ নভেম্বর মধ্যরাতে ঢাকা সেনানিবাসে সৈনিক বিদ্রোহ শুরু হয়। সৈনিকরা জিয়াউর রহমানকে গৃহবন্দিত্ব থেকে মুক্ত করেন এবং তাকে রাষ্ট্রের দায়িত্ব গ্রহণের আহ্বান জানান। জিয়াউর রহমান প্রথমে পরিস্থিতি বুঝতে তার ঘনিষ্ঠজনদের সঙ্গে আলোচনা করেন। জাসদের পক্ষ থেকে তাকে শহীদ মিনারে গিয়ে তাদের সঙ্গে একাত্মতা প্রকাশের আহ্বান জানানো হয়েছিল। তাদের উদ্দেশ্য ছিল জিয়াউর রহমানের জনপ্রিয়তা ও ব্যক্তিত্বকে ব্যবহার করে রাষ্ট্রক্ষমতায় প্রভাব বিস্তার করা। কিন্তু জিয়াউর রহমান সেই পথে যাননি।’
নভেম্বরের সংকটপূর্ণ সময়ে জিয়াউর রহমান মানুষের কাছে আস্থার প্রতীক হয়ে ওঠেন জানিয়ে তিনি আরো বলেন, ‘তার মুক্তির মধ্য দিয়ে সেনাবাহিনীতে নতুন পরিস্থিতি তৈরি হয় এবং রাজপথে সৈনিক ও সাধারণ মানুষের অংশগ্রহণে যে অভ্যুত্থান সংঘটিত হয়, তা দেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায় হয়ে থাকে। ১৯৭১ ও ১৯৭৫—এ দুই সংকটকালে জিয়াউর রহমানের ভূমিকার মধ্যে একটি মিল রয়েছে—তিনি এমন সময়ে সামনে এসেছিলেন, যখন দেশের মানুষ দিশা খুঁজছিল।’
ঢাকায় মার্কিন দূতাবাস থেকে ওয়াশিংটনে পাঠানো তারবার্তাতেও উঠে আসে ওই সময়কার ঘটনার বিবরণ। বার্তায় বলা হয়, খালেদ মোশাররফের তুলনায় জিয়াউর রহমানের প্রতি সেনাবাহিনীর কর্মকর্তা ও সাধারণ সৈনিকদের মধ্যে ব্যাপক সমর্থন ছিল। খালেদ মোশাররফকে ভারতপন্থী হিসেবে দেখার প্রবণতাও তার বিরুদ্ধে অসন্তোষ বাড়িয়ে দিয়েছিল। ৭ নভেম্বরের বিদ্রোহে মুক্ত হওয়ার পর জিয়াউর রহমান দ্রুত ক্ষমতা কাঠামোর কেন্দ্রে চলে আসেন। মার্কিন রাষ্ট্রদূতের ১০ নভেম্বরের বার্তা অনুযায়ী, ৭ নভেম্বর ভোরে জিয়াউর রহমান, খন্দকার মোশতাক এবং আরো কয়েকজন গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তির মধ্যে বৈঠক হয়। সেখানে মোশতাককে আবার রাষ্ট্রপতির দায়িত্ব নেয়ার প্রস্তাব দেয়া হলেও তিনি তা প্রত্যাখ্যান করেন। শেষ পর্যন্ত বিচারপতি সায়েমকে রাষ্ট্রপতি হিসেবে বহাল রাখার সিদ্ধান্ত হয়।
এর মধ্যে জিয়াউর রহমান সাময়িকভাবে প্রধান সামরিক আইন প্রশাসকের দায়িত্বও পালন করেন। তবে একদিন পরে সেই দায়িত্ব পান রাষ্ট্রপতি সায়েম। জিয়াউর রহমান সেনাপ্রধানের পাশাপাশি উপপ্রধান সামরিক আইন প্রশাসকের দায়িত্ব গ্রহণ করেন। সামরিক আইন প্রশাসনে তার ভূমিকা ক্রমেই গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে।
অন্যদিকে বিদ্রোহে অংশ নেয়া সৈনিকদের সঙ্গে নতুন সামরিক নেতৃত্বের দূরত্বও বাড়ছিল। জাসদের সামরিক সংগঠনগুলোর তৎপরতা নিয়ন্ত্রণে নেয়া হয়। নভেম্বরের শেষ দিকে সেনাবাহিনীতে শৃঙ্খলা পুনঃপ্রতিষ্ঠা করা হয় এবং জাসদের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ সম্পর্কের কারণে দুটি ব্যাটালিয়নকে নিরস্ত্র করা হয়। গ্রেফতার করা হয় কর্নেল তাহেরসহ জাসদ নেতাদের।
জিয়াউর রহমানের রাজনৈতিক উত্থানে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ধাপটি আসে ১৯৭৭ সালের ২১ এপ্রিল। সেদিন বিচারপতি সায়েম রাষ্ট্রপতির দায়িত্ব ছেড়ে দিলে রাষ্ট্রপ্রধানের পদ গ্রহণ করেন তিনি। এর মধ্য দিয়ে ৭ নভেম্বর ১৯৭৫-এ গৃহবন্দিদশা থেকে মুক্ত হওয়ার প্রায় দেড় বছরের মধ্যে সেনাপ্রধান থেকে রাষ্ট্রপতি হয়ে ওঠেন তিনি। তিনি সামরিক পরিচয়ের বাইরে রাজনৈতিক জনভিত্তি বিস্তারের উদ্যোগ জোরদার করেন। ১৯৭৭ সালের ৩০ মে তার প্রতি জনগণের আস্থা যাচাইয়ের জন্য গণভোট অনুষ্ঠিত হয়। একই বছর তিনি ১৯ দফা কর্মসূচি ঘোষণা করেন।
সামরিক নেতৃত্বের বাইরে নিজের রাজনৈতিক অবস্থান সুসংহত করতে জিয়াউর রহমান নির্বাচনী রাজনীতি ও দলীয় সংগঠন গড়ে তোলার দিকে মনোযোগ দেন। ১৯৭৮ সালের ৩ জুন অনুষ্ঠিত রাষ্ট্রপতি নির্বাচনে সরকারি ফল অনুযায়ী প্রায় ৭৭ শতাংশ ভোট পেয়ে নির্বাচিত হন তিনি। এরপর একই বছরের ১ সেপ্টেম্বর বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি) গঠন করেন। বিভিন্ন রাজনৈতিক মতাদর্শের ব্যক্তি ও গোষ্ঠীকে এক প্লাটফর্মে এনে দলটির মাধ্যমে নিজের রাজনৈতিক জনভিত্তি বিস্তারের উদ্যোগ নেন জিয়া। গ্রামীণ উন্নয়ন কর্মসূচি, দেশব্যাপী সফর ও জনসংযোগের মাধ্যমে যে সমর্থন গড়ে তোলার চেষ্টা করেছিলেন, তাকে সাংগঠনিক রূপ দেয়ার ক্ষেত্রেও বিএনপি গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে। ১৯৭৯ সালের ফেব্রুয়ারিতে অনুষ্ঠিত সংসদ নির্বাচনে দলটির সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জনের মধ্য দিয়ে সামরিক নেতৃত্ব থেকে নির্বাচনী ও দলীয় রাজনীতিতে জিয়াউর রহমানের উত্তরণ ঘটে।
জিয়াউর রহমান সামরিক ও বেসামরিক পক্ষের বিভাজন অতিক্রম করে ঐক্যের প্রতীক হিসেবে আবির্ভূত হয়েছিলেন, যে অভিজ্ঞতা রাষ্ট্র পরিচালনা সম্পর্কে তার উপলব্ধির ভিত্তি গড়ে দেয় বলে মনে করেন অর্থনীতিবিদ ও প্রধানমন্ত্রীর অর্থ ও পরিকল্পনা বিষয়ক উপদেষ্টা রাশেদ আল মাহমুদ তিতুমীর। তিনি বণিক বার্তাকে বলেন, ‘প্রায়ই বলা হয়, তিনি সেনানিবাস থেকে উঠে এসেছিলেন। কিন্তু এ বয়ান সংকীর্ণ। তিনি তার নেতৃত্বের বৈধতা সেনানিবাস থেকে নয়, জনগণের আস্থার মধ্য দিয়ে অর্জন করেছিলেন। জিয়াউর রহমান যখন বাংলাদেশের নেতৃত্ব গ্রহণ করেন, তখন দেশ রাজনৈতিক অস্থিরতার পাশাপাশি গভীর অর্থনৈতিক সংকটের মধ্য দিয়ে যাচ্ছিল। মুক্তিযুদ্ধের ধ্বংসযজ্ঞ, ১৯৭৪ সালের দুর্ভিক্ষ, বৈশ্বিক তেল সংকট ও প্রশাসনিক বিপর্যয়ের প্রভাবে অর্থনীতি বিপর্যস্ত হয়ে পড়েছিল। মূল্যস্ফীতি ছিল অনেক বেশি, খাদ্যনিরাপত্তা ছিল তীব্র সংকটে এবং রাষ্ট্রের প্রতি মানুষের আস্থা দুর্বল হয়ে পড়েছিল। তার শাসনামলে অর্থনীতি সেই সংকট কাটিয়ে পুনরুদ্ধারের পথে এগোয় এবং প্রায় ৪ শতাংশ হারে জিডিপি প্রবৃদ্ধি অর্জন করে। যুদ্ধবিধ্বস্ত ও স্বল্পোন্নত একটি দেশের জন্য সেটি ছিল উল্লেখযোগ্য অর্জন।’
রাষ্ট্রক্ষমতার কেন্দ্রে উঠে আসার পর জিয়াউর রহমান অর্থনৈতিক পুনর্গঠন ও গ্রামীণ উন্নয়নকে তার রাজনৈতিক কর্মসূচির অন্যতম ভিত্তি হিসেবে গ্রহণ করেন। কৃষি উৎপাদন বৃদ্ধি, গ্রামীণ কর্মসংস্থান সৃষ্টি, খাদ্যে স্বয়ংসম্পূর্ণতা অর্জন এবং স্থানীয় জনগোষ্ঠীকে উন্নয়ন কার্যক্রমে সম্পৃক্ত করার ওপর বিশেষ গুরুত্ব দেন তিনি। একই সঙ্গে বিভিন্ন উন্নয়ন প্রকল্প পরিদর্শন, গ্রামাঞ্চলে সফর এবং সাধারণ মানুষের সঙ্গে সরাসরি যোগাযোগের মাধ্যমে নিজের রাজনৈতিক অবস্থান সুসংহত করার চেষ্টা করেন। কৃষিনির্ভর অর্থনীতিতে সেচ ব্যবস্থার সম্প্রসারণকে অগ্রাধিকার দেয়া হয়। শুষ্ক মৌসুমে কৃষিজমিতে পানির সরবরাহ নিশ্চিত এবং আবাদি জমির উৎপাদনশীলতা বাড়াতে দেশব্যাপী খাল খনন কর্মসূচি নেয়া হয়। অন্যদিকে গ্রামীণ দরিদ্র জনগোষ্ঠীর কর্মসংস্থানের সুযোগ তৈরি করতে খাদ্যের বিনিময়ে কাজ কর্মসূচি চালু করা হয়। এসব কর্মসূচিতে জিয়াউর রহমান নিজেও সরাসরি অংশ নিতেন।
গ্রামীণ উন্নয়নের পাশাপাশি তিনি অর্থনীতিতে বেসরকারি উদ্যোগ ও বিনিয়োগ উৎসাহিত করার নীতি গ্রহণ করেন। তার শাসনামলে মিশ্র অর্থনীতির ওপর গুরুত্ব দেয়া হয়। শিল্প ও ব্যবসায় বেসরকারি খাতের অংশগ্রহণ বাড়ানো, বিনিয়োগের সুযোগ সম্প্রসারণ এবং অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডে রাষ্ট্রের পাশাপাশি ব্যক্তি উদ্যোগকে সম্পৃক্ত করার চেষ্টা চলে।
১৯৭৭ সালের মে মাসে ঘোষিত ১৯ দফা কর্মসূচিতে জিয়ার উন্নয়ন ভাবনার আরো সুস্পষ্ট প্রতিফলন ঘটে। এতে খাদ্যে স্বয়ংসম্পূর্ণতা, কৃষি ও গ্রামীণ অর্থনীতির উন্নয়ন, কর্মসংস্থান, শিক্ষা, স্বাস্থ্যসেবা, বাসস্থান, নারী ও যুবসমাজের অংশগ্রহণ এবং প্রশাসনিক বিকেন্দ্রীকরণের ওপর গুরুত্ব দেয়া হয়। পরবর্তী সময়ে এ কর্মসূচিই তার রাজনৈতিক কর্মকাণ্ড ও দলীয় সংগঠনের অন্যতম ভিত্তি হয়ে ওঠে। স্থানীয় সরকার ব্যবস্থার মাধ্যমে জনগণের অংশগ্রহণ বাড়ানোরও উদ্যোগ নেয়া হয়। ১৯৭৭ সালের জানুয়ারিতে ইউনিয়ন পরিষদ এবং আগস্টে পৌরসভা নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়। গ্রাম সরকার ধারণার মাধ্যমে গ্রামীণ জনগোষ্ঠীকে সরকারি সিদ্ধান্ত ও উন্নয়ন কর্মকাণ্ডের সঙ্গে যুক্ত করার চেষ্টা করা হয়। এসব উদ্যোগের ফলে স্থানীয় পর্যায়ে রাষ্ট্রীয় প্রশাসন ও সাধারণ মানুষের মধ্যে যোগাযোগের নতুন ক্ষেত্র তৈরি হয়।
১৯৭৮ সালের ১৭ জুন রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের সঙ্গে বৈঠক করেন মার্কিন রাষ্ট্রদূত ডেভিড টি. স্নাইডার। বৈঠকের বিবরণ দিয়ে ১৯ জুন ওয়াশিংটনে পাঠানো বার্তায় রাষ্ট্রদূত জানান, জিয়াউর রহমান ৭ নভেম্বর ১৯৭৫-এর ঘটনাও স্মরণ করেছিলেন। তিনি বলেছিলেন, সেদিন একটি বিধ্বস্ত কার্যালয়ের ভাঙা টেবিলে বসে সহকর্মীদের কাজে নেমে পড়ার নির্দেশ দিয়েছিলেন।
একই বার্তায় রাষ্ট্রদূত স্নাইডার জিয়াউর রহমানের রাজনৈতিক উত্থান সম্পর্কে পর্যবেক্ষণ তুলে ধরেন। জিয়াউর রহমান সামরিক ব্যক্তি হলেও ক্রমেই যে রাজনীতিক হয়ে উঠছিলেন সে কথা উল্লেখ করেছিলেন স্নাইডার। তার মতে, জিয়াউর রহমান দ্রুত রাজনীতি শিখছিলেন এবং সাফল্যও অর্জন করছিলেন।
সামরিক কর্মকর্তা থেকে জিয়াউর রহমানের রাষ্ট্রনেতা হয়ে ওঠার বিষয়ে জানতে চাইলে নিরাপত্তা বিশ্লেষক ও ফাউন্ডেশন ফর স্ট্র্যাটেজিক অ্যান্ড ডেভেলপমেন্ট স্টাডিজের চেয়ারম্যান মেজর জেনারেল (অব.) ফজলে এলাহী আকবর বণিক বার্তাকে বলেন, ‘জিয়াউর রহমানের অন্যতম বড় গুণ ছিল কোন কাজে কাকে দায়িত্ব দিতে হবে, তা বুঝতে পারা। নিজের পুরো শাসনামলে মেধাভিত্তিক নিয়োগের প্রাধান্য দিয়েছিলেন। বিভিন্ন খাত থেকে দক্ষ ও অভিজ্ঞ ব্যক্তিদের বেছে নিয়েছিলেন। যা তার সাফল্যের পেছনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছিল। একইভাবে রাজনীতিতেও বিভিন্ন মতাদর্শের মানুষকে সম্পৃক্ত করার উদ্যোগ নেন তিনি। বহুদলীয় রাজনৈতিক কার্যক্রমের সুযোগ তৈরি করে রাজনৈতিক পরিসর সম্প্রসারণ করেন। প্রশাসন ও রাজনীতিতে বিভিন্ন পক্ষকে সম্পৃক্ত করার এ সক্ষমতা তার অবস্থান প্রতিষ্ঠায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছিল।’










