ভৈরব ও রূপসা নদীর কোলঘেঁষে গড়ে ওঠা দেশের তৃতীয় বৃহত্তম নগরী খুলনা এখন অপরিকল্পিত নগরায়ণের ঝুঁকিতে। নকশা-বহির্ভূত ও অননুমোদিত ভবন নির্মাণের কারণে নগরীতে সড়ক ও খাল সরু হয়ে যাচ্ছে। এতে পানি নিষ্কাশন ব্যবস্থা পুরোপুরি অকেজো হয়ে পড়ার পথে। ড্রেনেজ সংকট ও অগ্নিঝুঁকির ফলে হুমকির মুখে জননিরাপত্তা। নাগরিক নেতাদের মতে, তদারকির অভাব ও দুর্নীতিই এ আত্মঘাতী উন্নয়নের মূল কারণ। অভিযোগ রয়েছে, প্রশাসনের শিথিলতায় বাসযোগ্যতা হারাচ্ছে খুলনা শহর। তবে দুর্নীতিবাজ কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে খুলনা উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ (কেডিএ) কঠোর অবস্থানে রয়েছে বলে জানিয়েছে কর্তৃপক্ষ।

কেডিএ সূত্রে জানা গেছে, আধুনিক খুলনা ও পরিকল্পিত নগরায়ণের প্রতিশ্রুতি নিয়ে ১৯৬১ সালের ২১ জানুয়ারি যাত্রা শুরু করে খুলনা উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ। বর্তমানে এর আয়তন ৮২৪ বর্গকিলোমিটার। এর উত্তর সীমানার মধ্যে রয়েছে নওয়াপাড়া পৌরসভা; পূর্বে অভয়নগর, দিঘলিয়া ও রূপসা উপজেলা; দক্ষিণে মোংলা পোর্ট পৌরসভা; দক্ষিণ-পশ্চিমে বটিয়াঘাটা উপজেলা ও পশ্চিমে ডুমুরিয়া উপজেলার কৈয়াবাজার। এ অধিক্ষেত্রে সংস্থাটি তার অথরাইজড শাখার মাধ্যমে ব্যক্তি মালিকানাধীন, সরকারি, বেসরকারি দপ্তর, সংস্থা ও প্রতিষ্ঠানের ইমারত নির্মাণের নকশা অনুমোদন করে। এছাড়া সংস্থাটি অপরিকল্পিত নগরায়ণ নিয়ন্ত্রণে অননুমোদিত ও খেলাপি নির্মাণ নিয়ন্ত্রণ করে থাকে।

সরজমিনে দেখা যায়, লোকজন নগরের দক্ষিণ ও পশ্চিম দিকের এলাকায় নতুন আবাসন গড়ে তুলেছে। দক্ষিণ প্রান্তে নিরালা আবাসিক এলাকার কোলঘেঁষে নতুন নতুন ভবন মাথা তুলছে। এদিকের জনবসতি রূপসা সেতুমুখী সংযোগ সড়ক বরাবর। সড়কের দক্ষিণ পাশে বটিয়াঘাটা এলাকায়ও নতুন নতুন স্থাপনা গড়ে উঠছে। আবার নিরালার পশ্চিম দিকে খুলনা-সাতক্ষীরা সড়কের বাঁ পাশের নিচু এলাকায়ও ভবনের পর ভবন উঠছে। ফুলতলা-রূপসা সেতু সংযোগ সড়কের পূর্ব পাশ, খুলনা বিশ্ববিদ্যালয়ের উত্তরাংশ, রায়েরমহলের পশ্চিমাংশ, তেলিগাতি-আড়ংঘাটা এলাকার পশ্চিমাংশেও বসতি বাড়ছে।

42

অভিযোগ রয়েছে, সিটি করপোরেশন এলাকায় ভবন নির্মাণে সেটব্যাক অনুযায়ী জমি ছাড়ার নির্দেশনা থাকলেও তা মানা হচ্ছে না। ভবনগুলো বেশির ভাগ ক্ষেত্রে পয়োনিষ্কাশন ব্যবস্থা একেবারেই নেই। অভ্যন্তরীণ সড়কগুলোর বেশির ভাগই অপ্রশস্ত। দখল ও অপরিকল্পিত নির্মাণে নগরের পানি নিষ্কাশন খালগুলোর বেশির ভাগই সংকুচিত এবং বন্ধ হয়ে পানি নিষ্কাশন ব্যবস্থা অকেজো হয়ে পড়ছে।

বৃহত্তর খুলনা উন্নয়ন সংগ্রাম সমন্বয় কমিটির সভাপতি শেখ আশরাফ-উজ্জামান বলেন, ‘খুলনা নগরে নির্মাণাধীন ভবনগুলোর প্রায় ৯০ ভাগই নকশা-বহির্ভূত। অনেকে কোনো ছাড়পত্র ছাড়াই বহুতল ভবন গড়ে তুলছেন। আবার অনেকে অনুমোদিত নকশা অমান্য করে চার তলার অনুমোদন নিয়ে পাঁচ তলা বা তদূর্ধ্ব ভবন নির্মাণ করছেন। ভবনের জন্য নির্ধারিত পার্কিংয়ের জায়গায় গড়ে তোলা হচ্ছে বিভিন্ন ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান। অনেকে প্রথম তলা নিজের ভূমির সীমানার মধ্যে রাখলেও দ্বিতীয় তলা থেকে উপরের অংশ নালা ও ড্রেনের দিকে বাড়িয়ে ভবন তৈরি করছেন। নিয়ন্ত্রণহীনভাবে এসব স্থাপনা গড়ে উঠলেও প্রশাসনের পদক্ষেপ কেবল মাঝেমধ্যে অভিযান পরিচালনা ও কিছু জরিমানা আদায়ের মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকছে।’

নগরীর এ অব্যবস্থাপনা ও সড়ক-খাল সংকুচিত হওয়ার পেছনের কারণ হিসেবে কেডিএকে দায়ী করেছেন খুলনা নাগরিক সমাজের সদস্য সচিব অ্যাডভোকেট বাবুল হাওলাদার। তিনি বলেন, ‘কেডিএর কয়েক দুর্নীতিবাজ কর্মকর্তা আর্থিক সুবিধা নিয়ে এসব বেআইনি কাজের সুযোগ করে দিচ্ছেন। অনেক কর্মকর্তা নিজেরা চাকরি করার পাশাপাশি নিজস্ব ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান খুলে বসেছেন, যার ফাঁদে পড়ে হয়রানির শিকার হচ্ছেন সেবাপ্রত্যাশীরা।’

অ্যাডভোকেট বাবুল হাওলাদার বলেন, ‘অভিযোগ রয়েছে—কেডিএর কতিপয় ইন্সপেক্টরের সহযোগিতায় বিসি কমিটির (বিল্ডিং কনস্ট্রাকশন) সদস্যদের সমন্বয়ে গঠিত সিন্ডিকেটের সঙ্গে যোগসাজশ করেই অবৈধ ও ঝুঁকিপূর্ণ এসব ভবন গড়ে উঠছে। বিসি কমিটির এসব সদস্য দীর্ঘদিন ধরে তাদের বেআইনি কর্মকাণ্ডের মাধ্যমে বিপুল অর্থ, বাড়ি ও গাড়ির মালিক হয়েছেন। এদের অনেকেই বর্তমানে দুর্নীতি দমন কমিশনের (দুদক) নজরদারিতে রয়েছেন।’

শহরের এ অগ্নিঝুঁকি ও অনিয়ম প্রসঙ্গে খুলনা ফায়ার সার্ভিস ও সিভিল ডিফেন্সের সহকারী পরিচালক মাসুদ সরদার বণিক বার্তাকে বলেন, ‘আমরা নগরীর বিভিন্ন এলাকার নকশা-বহির্ভূত অননুমোদিত ও ঝুঁকিপূর্ণ ভবনের তালিকা করে জেলা প্রশাসকের কার্যালয়ে জমা দিই। তারাই এ ব্যাপারে ব্যবস্থা নেবেন। তবে ভবন মালিকদের ভবন নির্মাণে সরকারি নিয়মকানুন ও আইন না মানার প্রবণতাই বড় সমস্যা হয়ে দাঁড়িয়েছে।’

কেডিএ চেয়ারম্যান অ্যাডভোকেট শফিকুল আলম মনা কর্মকর্তা-কর্মচারীদের গাফিলতি ও তদারকের অভাব প্রসঙ্গে জানান, সংস্থায় জনবল সংকট রয়েছে। ফলে নগরজুড়ে নিয়মিত তদারকি চালানো কঠিন হয়ে পড়ে। এতে অনুমোদিত নকশা থেকে বিচ্যুতি নজর এড়িয়ে যায়। নতুন জনবল নিয়োগ দেয়া হলে এ অবস্থার উন্নতি হবে। তিনি আরো জানান, নতুন দায়িত্ব নেয়ার পর থেকে দুর্নীতিবাজ কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে তার কঠোর অবস্থান বজায় রয়েছে। একই সঙ্গে সেবাপ্রত্যাশীদের হয়রানি কমাতে সর্বোচ্চ চেষ্টা চালানো হচ্ছে।