তরলীকৃত পেট্রোলিয়াম গ্যাস (এলপিজি) তৈরিতে অপরিহার্য দুটি কাঁচামাল বিউটেন ও প্রোপেন গ্যাস। আন্তর্জাতিক বাজারে বর্তমানে পণ্য দুটির মূল্য এখন রেকর্ড সর্বোচ্চে। সৌদি আরামকো কোম্পানির মূল্যতালিকা বিশ্লেষণে দেখা যাচ্ছে, গত এক বছরে পণ্য দুটির মূল্য বেড়ে দাঁড়িয়েছে দ্বিগুণেরও বেশি।
পণ্য দুটির মূল্যের এ ঊর্ধ্বগতি বাংলাদেশে এলপিজি বাজারজাতকারী অপারেটরদের উদ্বিগ্ন করে তুলেছে। তারা বলছেন, বর্তমানে বেসরকারি অপারেটরদের বাজারজাতকৃত প্রতি সিলিন্ডার (১২ কেজি) এলপিজি বিক্রি হচ্ছে ১ হাজার ৩৩ টাকায়। বাংলাদেশ এনার্জি রেগুলেটরি কমিশনের (বিইআরসি) সুপারিশে এ মূল্য আরো বাড়ানোর কথা জানানো হয়েছে। বাজারের বর্তমান পরিস্থিতি বলছে, সামনের দিনগুলোয় এলপিজির কাঁচামালের দাম আরো বাড়তে পারে। সেক্ষেত্রে গ্রাহকদের সুলভে এলপিজি সরবরাহ করা তাদের জন্য কঠিন হয়ে পড়বে।
সৌদি আরামকো কোম্পানির মূল্যতালিকা অনুযায়ী বর্তমানে এলপিজির কাঁচামাল হিসেবে ব্যবহূত প্রোপেনের দাম বেড়ে দাঁড়িয়েছে টনপ্রতি ৮০০ ডলার, বিউটেনের মূল্য ৭৯৫ ডলার। যেখানে গত মাসেও উভয় পণ্যেরই টনপ্রতি মূল্য ছিল ৬৬৫ ডলার। গত বছরের একই সময়ের তুলনায় পণ্য দুটির দাম বেড়েছে ১০০ শতাংশেরও বেশি। গত বছরের অক্টোবরে প্রোপেন ও বিউটেনের দাম ছিল টনপ্রতি যথাক্রমে ৩৭৫ ও ৩৮০ ডলার।
বাংলাদেশের অপারেটররা এলপিজি বাজারজাতের জন্য প্রয়োজনীয় বিউটেন ও প্রোপেনের চাহিদা পূরণ করে আমদানির মাধ্যমে। দক্ষিণ এশিয়ার অন্যান্য দেশের মতো এখনো এলপিজির দাম নির্ধারণ হয় সৌদি আরামকো কোম্পানির মূল্যতালিকার ভিত্তিতে।
আন্তর্জাতিক বাজারে প্রায় প্রতিটি জ্বালানি পণ্যেরই দাম এখন অনিয়ন্ত্রিতভাবে বাড়ছে। বিকল্প পণ্যগুলোর দরবৃদ্ধির সঙ্গে সঙ্গে পাল্লা দিয়ে বাড়ছে এলপিজির কাঁচামালের দামও। সংশ্লিষ্টদের ভাষ্যমতে, গ্রাহক পর্যায়ে জ্বালানি পণ্যের মূল্য পরিস্থিতি আন্তর্জাতিক বাজারদরের ওপর পুরোপুরি নির্ভরশীল। সেক্ষেত্রে আন্তর্জাতিক বাজারের অস্থিরতা দেশের বাজারে সংক্রমিত হওয়ার আশঙ্কা শতভাগ। এছাড়া মূল্য নিয়ে বিইআরসি ও অপারেটরদের মধ্যকার টানাপড়েন এ পরিস্থিতিকে আরো ঘোলাটে করে তুলতে পারে।
প্রতি মাসে আন্তর্জাতিক বাজারমূল্যের সঙ্গে সংগতি রেখে সমন্বয় করা হলেও কমিশন নির্ধারিত দামে অসন্তোষ রয়েছে ব্যবসায়ীদের। এর মধ্যেই আবার আন্তর্জাতিক বাজারে পণ্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতি তাদের আরো কঠিন পরিস্থিতির মুখে ঠেলে দেবে বলে দাবি করছেন তারা। এ অবস্থায় আমদানিনির্ভর জ্বালানি পণ্য এলপিজির মূল্য নির্ধারণে আন্তর্জাতিক বাজার পরিস্থিতিকেও বিবেচনায় নেয়া প্রয়োজন বলে মনে করছে সংশ্লিষ্ট ব্যবসায়ীদের সংগঠন এলপিজি অপারেটরস অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশ (লোয়াব)।
লোয়াব সভাপতি ও ইস্ট কোস্ট গ্রুপের চেয়ারম্যান আজম জে চৌধুরী বণিক বার্তাকে বলেন, আন্তর্জাতিক বাজারে সব ধরনের জ্বালানি পণ্যের দাম বেড়েছে। সে ধারাবাহিকতায় এলপিজির কাঁচামালের দামও বাড়বে এটাই স্বাভাবিক। এটি একটি বাস্তবতা। কভিড মহামারীতে ব্যবসা-বাণিজ্য স্থবির হয়ে পড়ায় পণ্যটির দাম কমে গিয়েছিল। এখন সারা বিশ্বে স্থবিরতা কেটে যাচ্ছে। ফলে জ্বালানির চাহিদা বাড়ছে। সেক্ষেত্রে দামটাও আগের জায়গায় ফিরে আসবে। তবে অতিমাত্রায় দাম বাড়লে সেটি দেশের জন্য উদ্বেগের। গ্রাহককেও আন্তর্জাতিক বাজারমূল্যের বিষয়টি বিবেচনায় নিতে হবে। কারণ এটি একটি আমদানিনির্ভর পণ্য।
লোয়াবের তথ্য অনুযায়ী, বর্তমানে দেশে বেসরকারি খাতের ২৭টি কোম্পানি এলপিজি বাজারজাত করছে। এর মধ্যে বসুন্ধরা এলপি গ্যাসের মার্কেট শেয়ার বর্তমানে ২৪-২৫ শতাংশ। এছাড়া ওমেরার মার্কেট শেয়ার ১৪-১৫ শতাংশ। এর বাইরেও বিএম, যমুনা, পেট্রোম্যাক্স, লাফজ, বেক্সিমকো, জি-গ্যাসের উল্লেখযোগ্য হারে অংশীদারিত্ব রয়েছে। অন্যদিকে পণ্যটি বাজারজাতকারী একমাত্র সরকারি কোম্পানি এলপি গ্যাস কোম্পানি লিমিটেডের মার্কেট শেয়ার মাত্র ২ শতাংশ।
আন্তর্জাতিক বাজারে পণ্যটির দাম ওঠানামা হলেও দেশের মূল্য সমন্বয়ের ক্ষেত্রে এবারের প্রেক্ষাপটটি ভিন্ন। এর আগে বিশ্ববাজারে এলপিজির দাম ওঠানামা করলে তার ভিত্তিতে মূল্য সমন্বয় করতেন ব্যবসায়ীরা। বতর্মানে পণ্যটির মূল্য সমন্বয়ের কাজটি করছে নিয়ন্ত্রক সংস্থা বিইআরসি। এক্ষেত্রে অপারেটরদের পণ্যমূল্যের জন্য কমিশন নির্ধারিত মূল্যহার আদেশের জন্য অপেক্ষা করতে হয়।
বর্তমান পরিস্থিতি নিয়ে জানতে চাইলে বসুন্ধরা এলপি গ্যাসের হেড অব সেলস জাকারিয়া জালাল বণিক বার্তাকে বলেন, আন্তর্জাতিক বাজারে এলপিজির কাঁচামালের দরবৃদ্ধিটা আমরা দেখেছি। যেহেতু বর্তমানে কমিশন মূল্য সমন্বয় করছে, আশা করছি তারা বিষয়টি বিবেচনায় নেবে। আর দাম বেড়ে গেলে ভোক্তা পর্যায়ে তার প্রভাব রয়েছে। সেটি একটু উদ্বেগের।
চলতি বছরের ১২ এপ্রিল থেকে এলপিজির মূল্য সমন্বয়ের কাজটি করছে কমিশন। যদিও সংস্থাটির মূল্য নিয়ে ব্যবসায়ীদের অসন্তোষ থাকায় এলপিজির বাজারদরে এর কোনো প্রতিফলন নেই। এ বিষয়ে অপারেটরদের দাবি, বিইআরসি ব্যবসায়ীদের দেয়া প্রস্তাবের বেশকিছু খরচ বিবেচনায় নেয়নি।
বর্তমানে ‘এম মাইনাস অন’ ফর্মুলা ধরে অর্থাৎ সৌদি আরামকোর এক মাস আগে ঘোষিত মূল্যকে ভিত্তি ধরে বাজারে এলপি গ্যাসের দাম সমন্বয় করা হচ্ছে। বিষয়টি নিয়ে আপত্তি তুলে ব্যবসায়ীরা বলছেন, এভাবে মূল্য সমন্বয় করা হলে তাতে সব ধরনের হিসাব যথাযথভাবে উপস্থাপিত হচ্ছে না।
দেশে পাইপলাইনের গ্যাস সংযোগ বন্ধ থাকায় রান্নার জ্বালানি হিসেবে দুই দশক ধরে এলপিজি জনপ্রিয় হয়ে উঠেছে। বর্তমানে ৪০ লাখেরও বেশি পরিবার এলপিজি ব্যবহার করছে। ৯৮ শতাংশ এলপিজি সরবরাহ করছে বেসরকারি অপারেটররা। বাকি ২ শতাংশ সরবরাহ করা হচ্ছে সরকারিভাবে। বসুন্ধরা, ওমেরা, বিএম, যমুনা, ফ্রেশ, বেক্সিমকোর মতো অন্তত ২৭টি অপারেটর বাজারে এলপিজি সরবরাহ করছে। বর্তমানে বার্ষিক ১১ লাখ টন আমদানি হচ্ছে। ২০২৫ সাল নাগাদ পণ্যটির চাহিদা বেড়ে দাঁড়াবে ২৫ লাখ টনে। তবে দেশে এ পরিমাণ চাহিদা পূরণে তেমন কোনো অবকাঠামো নেই।
খাতসংশ্লিষ্ট ও ব্যবসায়ীরা বলছেন, দেশে এলপিজি খাতের অবকাঠামো উন্নয়ন করা গেলে পণ্যটির দাম প্রায় অর্ধেকে নেমে আসবে। তখন দেশের বাজারেও গ্রাহকরা কম মূল্যে এলপিজি পাবে।
খাতসংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, দেশে বিদ্যমান অবকাঠামোয় এলপিজির মজুদক্ষমতা এক লাখ টন। এলপিজি মজুদের জন্য বর্তমানে বড় ধরনের কোনো অবকাঠামো নেই। অন্যদিকে নাব্যতা সংকটে পণ্যটি আমদানিতে বড় ধরনের জাহাজ দেশে আনা যায় না। দ্বিতীয় ধাপে ছোট ছোট জাহাজে করে এলপিজি পরিবহন করতে হয়। এতে খরচ বেড়ে যায়। প্রতিবেশী দেশ ভারতে এলপিজির টনপ্রতি যে দাম পড়ে, তার চেয়ে ৫০-৬০ ডলার বেশি খরচ হয় বাংলাদেশে। মূলত এ খরচ হয় দ্বিতীয় ধাপে ছোট ছোট জাহাজে করে আনার কারণে। এছাড়া পণ্যটি দেশে আনার পর ছোট ছোট ২০টি টার্মিনালের মাধ্যমে সংশ্লিষ্ট কোম্পানির বটলিং প্লান্টে পণ্যটি নিয়ে যাওয়া হয়। এখানে পরিবহন খরচও বেড়ে যায়।
এ বিষয়ে লোয়াব সভাপতি আজম জে চৌধুরীর অভিমত, দেশে গভীর সমুদ্রবন্দর নির্মাণ করা গেলে এবং বড় ধরনের স্টোরেজ ক্যাপাসিটি তৈরি করা গেলে পণ্যটির দাম অর্ধেকে নেমে আসবে। তখন বাজারেও এলপিজির দাম কমে যাবে।
দেশে এলপিজির বাজার প্রসারিত হওয়ার প্রেক্ষাপটে সরকার মহেশখালীর মাতারবাড়ীতে একটি এলপিজি টার্মিনাল নির্মাণ পরিকল্পনা গ্রহণ করেছে। ৩০ হাজার টন মজুদ সক্ষমতার এ টার্মিনাল নির্মাণে ব্যয় ধরা হয়েছে ১৫০ মিলিয়ন ডলার। ২০২৫ সাল নাগাদ এ টার্মিনাল নির্মাণ করা হবে। রাষ্ট্রায়ত্ত সংস্থা বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম করপোরেশন (বিপিসি) এ টার্মিনাল নির্মাণকাজে নিয়োজিত রয়েছে। ধারণা করা হচ্ছে, টার্মিনালটি নির্মাণ করা গেলে দেশে এলপিজির দাম গ্রাহক পর্যায়ে অর্ধেকে নেমে আসবে।
সার্বিক বিষয়ে জানতে চাইলে বিইআরসি চেয়ারম্যান মো. আব্দুল জলিল বণিক বার্তাকে বলেন, আদালতের নির্দেশে এলপিজির মূল্য সমন্বয়ের কাজটি করছে কমিশন। সৌদি আরামকোর ভিত্তিমূল্য ধরেই দেশে এলপিজির মূল্য সমন্বয় করা হচ্ছে। আন্তর্জাতিক বাজারে দাম বাড়লে মূল্য নির্ধারণের ক্ষেত্রে যে প্রক্রিয়া রয়েছে, সেগুলো অনুসরণ করা হবে।










