চলতি বছর দেশে ডেঙ্গু আক্রান্তের হার বেশি দেখা যাচ্ছে সমুদ্র উপকূলবর্তী বরগুনা জেলায়। প্রায় ১২ লাখ মানুষের স্বাস্থ্যসেবার একমাত্র ভরসাস্থল ২৫০ শয্যাবিশিষ্ট বরগুনা জেনারেল হাসপাতাল। উন্নত স্বাস্থ্যসেবার লক্ষ্যে এক যুগ আগে হাসপাতালটি ২৫০ শয্যায় উন্নীত করা হয়। তবে সে অনুপাতে জনবল নিয়োগ করা হয়নি। চিকিৎসক, নার্সসহ মোট কর্মকর্তা-কর্মচারী থাকার কথা ২৩৩ জন। কিন্তু এসব পদের ১১০টিই শূন্য রয়েছে। এ অবস্থায় ডেঙ্গু পরিস্থিতি সামাল দিতে হিমশিম খাচ্ছে স্বাস্থ্য বিভাগ। দ্রুত এসব সংকট নিরসন না হলে পরিস্থিতি আরো খারাপের দিকে যেতে পারে বলে আশঙ্কা করছেন সংশ্লিষ্ট চিকিৎসকরা। অবশ্য পরিস্থিতি মোকাবেলায় আটজন চিকিৎসক ও ১০ জন নার্স পদায়ন করা হয়েছে।
চিকিৎসকরা বলছেন, দেশব্যাপী ছড়িয়ে পড়া ডেঙ্গুর প্রকোপ এখন ভয়াবহ রূপ নিয়েছে বরগুনায়। হু হু করে বাড়ছে ডেঙ্গু রোগীর সংখ্যা। এরই মধ্যে বরগুনাকে ডেঙ্গুর হটস্পট হিসেবে চিহ্নিত করেছে স্বাস্থ্য বিভাগ। তবে হাসপাতালে চিকিৎসক সংকট, অপর্যাপ্ত ওষুধ ও চিকিৎসাসামগ্রীর সংকট পরিস্থিতিকে আরো বেশি বিপদাপন্ন করে তুলছে। স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় হাসপাতালটিতে ৫৫ জন চিকিৎসক নিয়োগের অনুমোদন দিলেও বর্তমানে এখানে কর্মরত স্থায়ী ডাক্তারের সংখ্যা মাত্র ১৬ জন। যে কারণে ঠিকমতো চিকিৎসাসেবা পাচ্ছেন না রোগীরা। গুরুতর রোগীদের নিয়মিত পাঠানো হচ্ছে বরিশাল বা ঢাকার হাসপাতালগুলোতে।
বরগুনা ২৫০ শয্যা হাসপাতাল সূত্রে জানা গেছে, ১০টি সিনিয়র কনসালট্যান্ট পদের মধ্যে নয়টিই শূন্য। কেবল অ্যানেস্থেসিয়া বিভাগে একজন সিনিয়র কনসালট্যান্ট রয়েছেন। এছাড়া কার্ডিওলজি, অর্থোপেডিক্স, গাইনি, মেডিসিন, শিশু, প্যাথলজি, সার্জারি, ইএনটি ও চক্ষু বিভাগে কোনো সিনিয়র কনসালট্যান্ট নেই। জুনিয়র কনসালট্যান্টের ১২টি পদের মধ্যে সাতটিই শূন্য। যার মধ্যে আছে সার্জারি, কার্ডিওলজি, প্যাথলজি ও রেডিওলজির মতো গুরুত্বপূর্ণ বিভাগ। হাসপাতালে মেডিকেল অফিসার ও সমমানের ২৯টি পদ থাকলেও এর মধ্যে ২২টিই শূন্য।
তবে চিকিৎসকের তুলনায় নার্সের সংখ্যা তুলনামূলক বেশি। ১০১টি পদের মধ্যে ৭৯টি পূরণ হয়েছে। কিন্তু প্রশাসনিক ও সহায়ক বিভাগগুলোতে জনবলের তীব্র সংকট রয়েছে। চিফ অ্যাসিস্ট্যান্ট, হিসাবরক্ষক, স্টোরকিপার, কম্পিউটার অপারেটর ও মর্গ স্টাফের মতো গুরুত্বপূর্ণ পদগুলো এখনো শূন্য। জনবল সংকটের কারণে হাসপাতালের দৈনন্দিন কার্যক্রমই চলছে না ঠিকমতো।
গতকাল সরজমিন দেখা গেছে, অধিকাংশ ওয়ার্ডেই শয্যা সংকট দেখা দিয়েছে। বহু রোগীকে মেঝেতে রেখে চিকিৎসা দিতে হচ্ছে। নারী ও শিশু ওয়ার্ডসহ মেডিসিন ইউনিটেও একই অবস্থা। অনেক রোগীকে বারান্দা ও করিডোরে বিছানা পেতে রাখা হয়েছে।
এ ব্যাপারে হাসপাতালের তত্ত্বাবধায়ক রেজয়ানুল আলম বণিক বার্তাকে বলেন, ‘রোগীর চাপ সামাল দিতে তারা সর্বোচ্চ চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছেন। তবে প্রয়োজনীয় চিকিৎসা উপকরণ দ্রুত সরবরাহ না হলে পরিস্থিতি আরো খারাপের দিকে যেতে পারে।’
সিভিল সার্জন অফিসের সবশেষ তথ্য অনুযায়ী, গত ২৪ ঘণ্টায় শুধু বরগুনা হাসপাতালে ডেঙ্গু আক্রান্ত রোগীর সংখ্যা ৮০ জন। জেলার বিভিন্ন হাসপাতালে আরো ভর্তি রয়েছেন ১৩ জন। এর মধ্যে আমতলী উপজেলায় এক, বেতগীতে দুই, বামনায় ছয় এবং পাথরঘাটায় আক্রান্ত রোগীর সংখ্যা চারজন। বর্তমানে জেলার বিভিন্ন হাসপাতালে মোট ভর্তি রোগীর সংখ্যা ২৪২ জন। চলতি বছরের জানুয়ারি থেকে ১১ জুন পর্যন্ত বরগুনায় ডেঙ্গু রোগী শনাক্ত হয়েছে ২ হাজার ৪৯৫ জন। এর মধ্যে সুস্থ হয়ে বাড়ি ফিরেছেন ২ হাজার ২৫৩ জন। এসব রোগীর অধিকাংশই বরগুনা পৌর শহর ও সদর উপজেলার বাসিন্দা। এছাড়া বরগুনা হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় এখন পর্যন্ত ডেঙ্গু আক্রান্ত হয়ে ছয়জনের মৃত্যু হয়েছে।
তবে বেসরকারি হাসপাতালের তথ্য বলছে, ডেঙ্গু আক্রান্ত হয়ে ঢাকা ও বরিশালের বিভিন্ন হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় মৃত্যু হয় ১৬ জনের। যাদের সবার বাড়ি বরগুনা সদর উপজেলায়।
সার্বিক বিষয়ে সিভিল সার্জন ডা. মোহাম্মদ আবুল ফাত্তাহ বণিক বার্তাকে বলেন, ‘গত ২৪ ঘণ্টায় বরগুনায় ডেঙ্গু আক্রান্তের সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ৯৩ জনে। প্রতিদিনই ডেঙ্গু আক্রান্ত রোগী বেড়েই চলছে।’ এমন পরিস্থিতিতে ডেঙ্গুর প্রকোপ কমাতে স্থানীয়দের সচেতন হওয়ার পাশাপাশি ব্যাপক পরিসরে পরিষ্কার পরিচ্ছন্নতা অভিযান এবং মশক নিধন কার্যক্রম পরিচালনার তাগিদ দেন তিনি।
ডা. মোহাম্মদ আবুল ফাত্তাহ বলেন, ‘পরিস্থিতি মোকাবেলায় বরগুনা ২৫০ শয্যা জেনারেল হাসপাতালে আটজন চিকিৎসক ও ১০ জন নার্স পদায়ন করা হয়েছে। এছাড়াও স্যালাইন ও রক্ত পরীক্ষার যে কিট সংকট তৈরি হয়েছে, সে বিষয়ে পদক্ষেপ নেয়া হয়েছে।’










