ফিলিস্তিনকে আনুষ্ঠানিকভাবে রাষ্ট্রের স্বীকৃতি দিয়েছে যুক্তরাজ্য, কানাডা ও অস্ট্রেলিয়া। একযোগে গতকাল এ তিন দেশ ফিলিস্তিনকে স্বীকৃতি দেয়। বিশ্লেষকদের মতে, এ উদ্যোগে পশ্চিমা দেশগুলোর পররাষ্ট্রনীতিতে বৈপ্লবিক পরিবর্তনের সুর উঠেছে। ফিলিস্তিনকে স্বীকৃতি দেয়ার অঙ্গীকার করেছে পর্তুগালও। তবে পশ্চিমা দেশগুলোর এ উদ্যোগে ক্ষিপ্ত হয়েছেন ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনয়ামিন নেতানিয়াহু ও তার মন্ত্রিসভার সদস্যরা।
বিশ্বের সবচেয়ে ধনী সাত দেশের জোট জি৭-এর সদস্যদেশ হিসেবে গতকাল ফিলিস্তিনকে প্রথমে রাষ্ট্রের স্বীকৃতি দেয় কানাডা। দেশটির প্রধানমন্ত্রী মার্ক কার্নি সামাজিক মাধ্যম এক্সে পোস্ট করে এ সিদ্ধান্ত জানান। শিগগিরই এ তালিকায় যুক্ত হতে যাচ্ছে আরেক প্রভাবশালী পশ্চিমা দেশ ফ্রান্স। এটা হলে জাতিসংঘের নিরাপত্তা পরিষদের পাঁচটি স্থায়ী সদস্যদেশের মধ্যে চারটি দেশেরই স্বীকৃতি পাবে ফিলিস্তিন। এর আগে ১৯৮৮ সালে অন্য দুই স্থায়ী সদস্য রাশিয়া ও চীন ফিলিস্তিনকে স্বীকৃতি দিয়েছিল।
কানাডার প্রধানমন্ত্রী মার্ক কার্নি তার পোস্টে উল্লেখ করেন, ‘কানাডা ফিলিস্তিন রাষ্ট্রকে স্বীকৃতি দিচ্ছে এবং ফিলিস্তিন রাষ্ট্র ও ইসরায়েল রাষ্ট্রের শান্তিপূর্ণ ভবিষ্যৎ গঠনের অঙ্গীকার প্রতিষ্ঠা করতে সহযোগিতার প্রস্তাব দিচ্ছে।’
এর পর পরই অস্ট্রেলিয়া এক বিবৃতির মাধ্যমে ফিলিস্তিনকে স্বীকৃতি দেয়। দেশটির প্রধানমন্ত্রী অ্যান্থনি অ্যালবানিজের বিবৃতিতে উঠে আসে, কানাডা ও যুক্তরাজ্যের সঙ্গে যৌথ উদ্যোগে নেয়া এ পদক্ষেপ দুই রাষ্ট্র সমাধান বাস্তবায়নের পথে একটি আন্তর্জাতিক প্রয়াস। এ ফিলিস্তিন রাষ্ট্রে হামাসের কোনো ভূমিকা থাকবে না বলেও তিনি উল্লেখ করেন বিবৃতিতে।
যুক্তরাজ্যের প্রধানমন্ত্রী স্যার কিয়ার স্টারমার এর কিছুক্ষণ পর ঘোষণা দেন, যুক্তরাজ্যও ফিলিস্তিনকে রাষ্ট্র হিসেবে স্বীকৃতি দিয়েছে। এক ভিডিও বার্তায় তিনি বলেন, ‘যুক্তরাজ্যের প্রধানমন্ত্রী হিসেবে আমি ঘোষণা করছি যে যুক্তরাজ্য ফিলিস্তিনকে আনুষ্ঠানিকভাবে রাষ্ট্র হিসেবে স্বীকৃতি দিচ্ছে।’
ভিডিও বার্তার শুরুতে স্টারমার বলেন, ‘মধ্যপ্রাচ্যে যে ভয়াবহতা চলছে, সেটির বিপরীতে আমরা শান্তি ও দ্বিরাষ্ট্রীয় সমাধানের চেষ্টা টিকিয়ে রাখার চেষ্টা করছি। এর মানে হলো একটি নিরাপদ ও সুরক্ষিত ইসরায়েল এবং পাশাপাশি একটি কার্যকর ফিলিস্তিন রাষ্ট্র থাকবে। কিন্তু বর্তমানে আমাদের কাছে কোনোটিই নেই।’ এর পরই ফিলিস্তিনকে রাষ্ট্রের স্বীকৃতি দেন স্টারমার।
ফিলিস্তিনকে রাষ্ট্র হিসেবে স্বীকৃতি দেয়ার ব্যাপারে গত জুলাইয়ে ঘোষণা দিয়েছিলেন স্টারমার। তখন শর্তের কথা উল্লেখ করে তিনি বলেছিলেন, ‘ইসরায়েল যুদ্ধবিরতি ও দ্বিরাষ্ট্র সমাধানের মাধ্যমে দীর্ঘমেয়াদি শান্তিচুক্তিতে সম্মত না হলে যুক্তরাজ্য ফিলিস্তিনকে রাষ্ট্রের স্বীকৃতি দেবে।’
গাজায় যুদ্ধবিরতির বিষয়ে এখনো কোনো অগ্রগতি হয়নি। বরং গত সপ্তাহে গাজা সিটিতে স্থল অভিযান শুরু করে ইসরায়েল। হামলা চালায় উপত্যকাটির প্রাণকেন্দ্রে। এতে বহু বাসিন্দা নিহত হয়। গাজা সিটি ছেড়ে অন্য এলাকায় যেতে বাধ্য হচ্ছে হাজারো মানুষ।
বিবিসির প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, যুক্তরাজ্যের এ সিদ্ধান্ত তাদের পররাষ্ট্রনীতির একটি বড় পরিবর্তন নির্দেশ করে। যদিও ইসরায়েলি সরকার, জিম্মিদের পরিবার ও কিছু ডানপন্থী সংগঠন স্টারমার প্রশাসনের এমন সিদ্ধান্তের কড়া সমালোচনা করেছে।
এদিকে কানাডা, অস্ট্রেলিয়া ও যুক্তরাজ্য পর্যায়ক্রমে ফিলিস্তিনকে রাষ্ট্র হিসেবে আনুষ্ঠানিকভাবে স্বীকৃতি দেয়ার পর এক ভিডিও বার্তায় এর প্রতিক্রিয়া জানিয়েছেন ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু। ভিডিওতে তিনি বলেন, ‘২০২৩ সালের ৭ অক্টোবরে ভয়াবহ হত্যাযজ্ঞের পর যে নেতারা ফিলিস্তিনকে রাষ্ট্র হিসেবে স্বীকৃতি দিয়েছেন, তাদের প্রতি আমার স্পষ্ট বার্তা—আপনারা সন্ত্রাসবাদকে এক বিশাল পুরস্কারে পুরস্কৃত করছেন। আপনাদের জন্য আমার আরো একটি বার্তা আছে, তা হলো এটি (ফিলিস্তিন রাষ্ট্র) কখনো ঘটবে না। জর্ডান নদীর পশ্চিম তীরে একটি ফিলিস্তিন রাষ্ট্র কখনো প্রতিষ্ঠা পাবে না।’
বহু বছর ধরে চাপের মুখে তিনি ‘একটি সন্ত্রাসী রাষ্ট্র’ প্রতিষ্ঠা পাওয়াকে ঠেকিয়ে রেখেছেন উল্লেখ করে নেতানিয়াহু বলেন, ‘বাস্তবে আমরা জুডিয়া (জেরুজালেমের শহর) এবং সামারিয়ায় (পশ্চিম তীরের নাবলুসের কাছের শহর) ইহুদি বসতি দ্বিগুণ করেছি। আমরা বসতি সম্প্রসারণ করে যাব।’










