রোগ-ব্যাধি লেগেই ছিল বুধরাই মাঝির।
যক্ষ্মায় আক্রান্ত হয়ে হাসপাতালে ভর্তি ছিলেন তিন মাস। সেই যাত্রায় প্রাণে বেঁচে
ফেরার পর গ্রাম ছেড়ে চলে যান অন্যত্র। বিয়ে করে সেখানে কাটান একযুগ। কিন্তু দুই শিশু
কন্যা রেখে হঠাৎই মারা যান স্ত্রী। শেষে সন্তানদের নিয়ে গ্রামে ফেরেন নিরুপায়
বুধরাই। কিন্তু গ্রামে ফিরে দেখেন তার পৈত্রিক সম্পত্তি বেদখল হয়ে গেছে। দখলদারদের
সঙ্গে গত এক যুগ ধরে আইনী লড়াই চলছে তার। এই ফাঁকে জমির দখল নিয়েছেন ইউনিয়ন পরিষদ
চেয়ারম্যান। গত পাঁচ বছর ধরে সেই জমি চাষ করছেন ইউনিয়ন পরিষদের মহল্লাদার। আর
বুধরাইকে নিজের জমিতেই শ্রমিক হিসেবে কাজ করতে হয়েছে।
ঘটনাটি নওগাঁর নিয়ামতপুর উপজেলার
রসুলপুর ইউনিয়নের নিমদীঘি মহাপাড়া এলাকার। ভুক্তভোগী বুধরাই মাঝি ওরফে বুধরাই
মুর্মু ওই গ্রামের টুরকা মাঝির ছেলে। দিনমজুর বুধরাই এখন দ্বিতীয় স্ত্রী ও
দুপক্ষের তিন সন্তান নিয়ে অসহায় জীবনযাপন করছেন।
স্থানীয় প্রভাবশালীরা তার পৈত্রিক
সম্পত্তির দখলে নিয়েছেন অভিযোগ করে নিজের সম্পত্তি ভোগদখলের আশা ছেড়েই দিয়েছেন বলে
জানালেন বুধরাই। তিনি বলেন, ‘পৈত্রিক সূত্রে ৬ বিঘা ধানি জমি পেয়েছিলেন তারা দুই
ভাই। মা ও দুই ছেলেকে রেখে বছর চল্লিশেক আগে তার বাবা মারা যান। দীর্ঘদিন তারা দুই
ভাই সেই জমি আবাদ করে সংসার চালিয়েছেন।’
তিনি জানান, যক্ষ্মা থেকে সেরে উঠলেও অসুখ-বিসুখ
পিছু ছাড়ছিল না। আর্থিক সংকটে একেবারেই বিপর্যস্ত হয়ে তাই গ্রাম ছেড়ে পাড়ি দেন জেলার
সাপাহারে। সেখানে বিয়ে করে সংসার শুরু করেন। কিন্তু তার স্ত্রীর মৃত্যুর পর ফের ফিরে
আসেন গ্রামে।
বুধরাই জানান, গ্রামে ফিরে দেখেন তার পৈত্রিক
সম্পত্তির অংশ টুকু পাশের মদনাকান্দর গ্রামের হুমায়ুন আলীর দখলে। খোঁজ নিয়ে জানতে
পারেন- চাচাতো ভাই সুনীল মাঝি সেই জমি হুমায়ুনের কাছে বিক্রি করেছেন। আরো জানা
যায়, তারই দানপত্র দলিলে সুনীল মাঝি সেই জমির মালিক হন। এরপর হাতবদল। চাচাতো
ভাইয়ের জালিয়াতিতে পথে বসেন বুধরাই।
নিজের পৈত্রিক সম্পত্তি ফিরে পেতে
আইনের পথে হাঁটেন বুধরাই। ২০১১ সালের ১১ এপ্রিল নওগাঁর সহকারী জজ (নিয়ামতপুর)
আদালতে মামলা করেন। মামলা নম্বর ৬৮/১১। আদালতে দানপত্র দলিলটি জাল প্রমাণিত হয়।
২০১২ সালের ১০ জানুয়ারি দানপত্র দলিল বাতিল করে তাকে একতরফা ডিক্রি দেন আদালত।
বুধরাই আরো জানান, আদালতের রায় নিয়ে
২০১৩ সালের ১৩ জানুয়ারি তিনি রসুলপর ইউনিয়ন পরিষদে যান। জমি দখলমুক্ত করে বুঝিয়ে দিতে
গ্রাম আদালতে আর্জিও দেন তিনি। মামলা নম্বর ২৭/২০১৩। এই মামলায় বিবাদি করা হয়
দখলদার হুমায়ুন ও তার ভাই মকবুলসহ ১২ জনকে।
নথিপত্র পর্যালোচনায় দেখা যায়, চার
কার্যদিবস অভিযোগের শুনানি করেন তৎকালীন চেয়ারম্যান সাজ্জাদ আলী টিটু। কিন্তু
একটিতেও হাজির করা যায়নি বিবাদিপক্ষকে। প্রায় ১ বছর পর ২০১৩ সালের ২১ ডিসেম্বর
মামলাটি নথিজাত করা হয়।
ওই সময় গ্রাম আদালত জানায়, বার বার
নোটিশ দেয়ার পরও বিবাদিরা হাজির হননি। এমনকি তারা নোটিশ নিতেও চাননি। বিবাদিদের
অসহযোগীতায় উভয়পক্ষের নথিপত্র পর্যালোচনার সুযোগও পায়নি গ্রাম আদলত। বিষয়টি আপোষের
উদ্যোগ নিয়েও ব্যর্থ হয় হয়ে বাদিকে ঊর্ধ্বতন উধ্বতন আদালতের আশ্রয় নেয়ার পরামর্শ
দেন চেয়ারম্যান।
বুধরাই জানান, গ্রাম আদালতের বিচার
দেয়ার পর দখলদাররা নিস্ক্রিয় ছিল। এরপর নিজের জমিতে মাটির ঘরতুলে পরিবার নিয়ে
বসবাস শুরু করেন। চাষাবাদ করে ফসলও তোলেন ঘরে।
কিন্তু দুই বছরের মাথায় দেড় বিঘা জমির দখল নেন হুমায়ুনের দুই ছেলে ফুয়াদ আলী ও নজরুল ইসলাম। উল্টো জবরদখলের মামলাও দেন তারা।
সম্পত্তি দখলমুক্ত করতে ২০১৭ সালের ২৩
জানুয়ারি তিনি ফের গ্রাম আদালতে আর্জি দেন। মামলা নম্বর ২০১৭/৬। এই বার বিবাদি করা
হয় ফুয়াদ আলী ও তার ভাই নজরুল ইসলামকে। চার দফা নোটিশ পাঠিয়ে তাদেরও গ্রাম আদালতে
হাজির করতে পারেননি তৎকালীন ইউনিয়ন পরিষদ চেয়ারম্যান আব্দুর রাজ্জাক।
ওই বছরেরই ১৯ মার্চ বাদিকে আদালতে
যাবার পরামর্শ দিলেও নিজেই সেই জমির দখল নেন চেয়ারম্যান। গত পাঁচ বছর ধরে ইউনিয়ন
পরিষদের মহল্লাদার ও একই গ্রামের বাসিন্দা মাধব চন্দ্র মুন্ডা সেই জমি চাষাবাদ
করছেন। সেই জমিতে দিন কয়েক আগেও বোরো ধানের চারা রোপন করেছেন মাধব। আর নিজের
জমিতেই শ্রমিক হিসেবে খেটেছেন বুধরাই।
তার অভিযোগ, দখলদার ফুয়াদ আলী স্থানীয়
প্রভাবশালী ও সাবেক ইউনিয়ন পরিষদ সদস্য মোশারফ হোসেন ভিখুর ভগ্নিপতি।
খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, ২০২১ সালের ২
মার্চ মারা যান ইউনিয়ন পরিষদ চেয়ারম্যান আব্দুর রাজ্জাক। এরপর ২০২২ সালের ৩১
জানুয়ারি চেয়ারম্যান নির্বাচিত হন আব্দুর রাজ্জাকের ছোটোভাই মোতালেব হোসেন বাবর।
যোগাযোগ করা হলে বুধরাই মাঝির জমি তার
দখলে থাকার কথা স্বীকার করেছেন মহল্লাদার মাধব চন্দ্র মুন্ডা। তিনি বলেন, তৎকালীন
চেয়ারম্যান আব্দুর রাজ্জাক তাকে ওই জমি চাষ করার নির্দেশ দেন। তাতে দুপক্ষেরই
সম্মতি ছিল। বিষয়টি বর্তমান চেয়ারম্যানও জানেন বলে দাবি করেন মহল্লাদার। তবে কয়েক
দফা চেষ্টা করেও এনিয়ে বর্তমান ইউনিয়ন পরিষদ চেয়ারম্যান মোতালেব হোসেন বাবরের
মন্তব্য পাওয়া যায়নি।
চেয়ারম্যানের এমন কাণ্ড আইন বহির্ভূত
কি-না জানতে চাইলে বলে নিয়ামতপুর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মো. ফারুক সুফিয়ান
বলেন, ‘বিষয়টি অবশ্যই গ্রাম আদালতের বিধিবর্হিভূত। তবে কোন পরিপ্রেক্ষিতে এ ঘটনা
ঘটেছে সেটি খতিয়ে দেখতে হবে।’
অন্যদিকে, বিষয়টি তদন্ত করে যথাযথ
ব্যবস্থা নেয়ার আশ্বাস দিয়েছেন নওগাঁর জেলা প্রশাসক খালিদ মেহেদী হাসান।
কেবল বুধরাই মাঝি নন, এমন সম্পত্তির
অধিকার হারিয়েছেন উত্তরাঞ্চলের বহু ছোট জাতিগোষ্ঠীর মানুষ। এ প্রসঙ্গ উঠে এসেছে
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতি বিভাগের অধ্যাপক আবুল বারাকাতের গবেষণায়। ২০১৬
সালে ‘পলিটক্যিাল ইকোনমি অফ আনপিপলিং অফ ইন্ডিজিনাস পিপলস: দ্য কেইস অফ বাংলাদেশ'
শিরোনামে একটি গবেষণা গ্রন্থ প্রকাশ করেন এই অর্থনীতিবিদ।
তিনি দেখিয়েছেন, ৬৪ বছরে সমতলের ১০টি
ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠীর দুই লাখ দুই হাজার ১৬৪ একর জমি কেড়ে নেয়া হয়েছে, যার দাম প্রায়
১০ হাজার কোটি টাকা।৷ ওই গবেষণায় ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠীকে জমিজমা এবং বসতবাড়ি থেকে
উচ্ছেদের ১৬টি কৌশলের কথাও বলেছেন গবেষক।প্রধানত রক্ষার নামেই রাজনৈতিক
প্রভাবশালী ও ভূমি দস্যুরা ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠীকে উচ্ছেদ করে বলে উল্লেখ করেন তিনি।
লেখক ও গবেষক পাভেল পার্থ বলেন,
ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠীর উপর যত ধরনের নিপীড়ন-হত্যা তার অধিকাংশই ভূমি দখলকে কেন্দ্র
করে। এছাড়া জমির জাল কাগজ-পত্র তৈরি করে অথবা ভয় দেখিয়ে কিংবা প্রতারণার মাধ্যমে
তাদের উৎখাত করা হচ্ছে৷কিন্তু প্রভাবশালীদের কারণে তারা ন্যয় বিচার পাচ্ছেননা।
প্রান্তিক এ জনগোষ্ঠী ভূমির অধিকার
হারিয়ে প্রথমেই ইউনিয়ন পরিষদের গ্রাম আদালতে যান। কিন্তু সেখানে কোনো ধরনের
প্রতিকার পাননা। স্থানীয় ভূমি অফিসেরও এনিয়ে তেমন মাথাব্যথা নেই। অনেক সময় ক্ষুদ্র
নৃগোষ্ঠির মানুষ আদালতে গেলেও অর্থাভাবে মামলা চালাতে ব্যর্থ হন। এইসব ক্ষেত্রে
ভুক্তভোগীদের রাষ্ট্রীয় খরচে আইনগত সহায়তা দেয়া প্রয়োজন।
এবিষয়ে জাতীয় আদিবাসী পরিষদের সাধারণ
সম্পাদক গণেশ মার্ডি বলেন, ‘আমরা দীর্ঘদিন ধরে সমতলের আদিবাসীদের জন্য আলাদা ভূমি
কমিশন গঠনের দাবি জানিয়ে আসছি। ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগ ২০০৮ সালে তাদের নির্বাচনী
ইশতেহারে সমতলের আদিবাসীদের জন্য পৃথক ভূমি কমিশন গঠনের প্রতিশ্রুতি দিয়েছিল।
কিন্তু ক্ষমতার দুই মেয়াদেও সেই
প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়ন হয়নি। কেবল পৃথক ভূমি কমিশন গঠন করে সমতলের আদিবাসীদের ভূমি
অবৈধ দখলমুক্ত করা গেলে দীর্ঘদিন ধরে চলে আসা শোষন-বঞ্চনার অবসান ঘটতে পারে।’
২০২২ সালের জনশুমারি অনুযায়ি, দেশে
মোট ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীর সংখ্যা ১৬ লাখ ৫০ হাজার। যা মোট জনসংখ্যার ১ শতাংশ। সমতলে
রাজশাহী বিভাগে ২ লাখ ২৪ হাজার ৫৯২ জন এবং রংপুর বিভাগে ৯১ হাজার ৭০ জন ক্ষুদ্র
নৃগোষ্ঠীর বসবাস।










