রাশিয়ার ওপর যুক্তরাষ্ট্রের নিষেধাজ্ঞা এড়িয়ে দ্বিপক্ষীয় বাণিজ্য জোরদার করতে বিকল্প পথ খুঁজছে বাংলাদেশ। এরই অংশ হিসেবে রুশ কেন্দ্রীয় ব্যাংকের সঙ্গে বাংলাদেশ ব্যাংক সোয়াপ স্বাক্ষরের উদ্যোগ নিয়েছে। এটি হলে দুই দেশের মধ্যে করেসপন্ডিং ব্যাংকিং চালু না করেও আমদানি-রফতানি করা সম্ভব হবে।
তবে এটি করতে গিয়ে অন্য কোনো দেশের সঙ্গে সম্পর্কে যেন প্রভাব না পড়ে, সে দিকটি বিবেচনায় অত্যন্ত সতর্কতার সঙ্গে এগোচ্ছে সরকার। বাণিজ্য মন্ত্রণালয় ও বাংলাদেশ ব্যাংক সূত্রে এ তথ্য জানা গেছে।
সূত্র জানিয়েছে, বাংলাদেশ ব্যাংকের কর্মকর্তাদের একটি দল এরই মধ্যে রাশিয়া সফর করে এসে প্রস্তাবিত সোয়াপ চুক্তির খসড়া তৈরি করেছে। সেটি নিয়ে বাণিজ্য সচিব মো. জাফরউদ্দিনের সভাপতিত্বে গতকাল একটি বৈঠকও হয়েছে। বৈঠকে বৈশ্বিক রাজনীতিতে সম্ভাব্য এ চুক্তির প্রভাব গভীরভাবে পর্যালোচনা করার সিদ্ধান্ত হয়েছে। এজন্য একটি কমিটি গঠন করা হতে পারে। আর সবকিছু ঠিকঠাক থাকলে এটিই হতে যাচ্ছে কোনো দেশের সঙ্গে বাংলাদেশের প্রথম সোয়াপ চুক্তি।
এ বিষয়ে জানতে চাইলে বাণিজ্য সচিব ড. মো. জাফরউদ্দিন বণিক বার্তাকে বলেন, বৈঠকের উদ্দেশ্য ছিল এক্ষেত্রে সমস্যাগুলো চিহ্নিত করা। পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়, আর্থিক প্রতিষ্ঠান বিভাগ, বাংলাদেশ ব্যাংকের প্রতিনিধিসহ ব্যবসায়ীরা বৈঠকে উপস্থিত ছিলেন। আমরা প্রাথমিকভাবে আলোচনা করে প্রাথমিক সমস্যাগুলো জানার চেষ্টা করেছি, আবার বসতে হবে। আগামীতে আমরা উন্নয়নশীল দেশে রূপান্তরিত হব। এজন্য আমাদের রফতানি বাড়াতে হবে। তাই রাশিয়ার সঙ্গে ব্যাংকিং ব্যবস্থাটা যেন প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি না করে, এ বিষয়েই আমরা উদ্যোগ নিয়েছি।
সচিব আরো বলেন, রাশিয়া যেহেতু ইউরেশিয়ান কাস্টমস ইউনিয়নের নেতৃস্থানীয় সদস্য, সেহেতু বাংলাদেশ রাশিয়ার সঙ্গে ব্যাংকিং লেনদেন স্থাপন করতে পারলে ওই কাস্টমস ইউনিয়নের সদস্য দেশগুলোর সঙ্গে সরাসরি বাণিজ্য পরিচালনার সুযোগ তৈরি হবে।
বৈঠকে উপস্থিত বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের ঊর্ধ্বতন এক কর্মকর্তা বলেন, তবে তাড়াহুড়ো করে কিছু হচ্ছে না। এক্ষেত্রে আর্থিক, বৈশ্বিক রাজনীতি ও কূটনৈতিক ইস্যু জড়িত। এ ধরনের কার্যক্রমে আমাদের আগের কোনো অভিজ্ঞতা নেই। এখান থেকে ভালো পজিশনে যাওয়ার জন্যই এমন উদ্যোগ নেয়া হয়েছে। ভালো কিছু করতে গিয়ে যেন নতুন করে কোনো চ্যালেঞ্জে না পড়ে যাই। এটা করতে গিয়ে যেন বৈশ্বিক রাজনৈতিক ক্ষেত্রে ঝামেলার সৃষ্টি না হয়, সেগুলো মাথায় রেখেই এ কাজটা করতে হবে। আমাদের এক্সপোর্ট বাড়ানোর জন্য এ ধরনের উদ্যোগ নিতে হবে। তবে একটা-দুটো মিটিংয়েই এটা করা সম্ভব হবে না বলেই মনে হচ্ছে। সেজন্য আজকের বৈঠকে এসব বিষয়ে আরো স্টাডি করার সিদ্ধান্ত হয়েছে।
সোয়াপ চুক্তি হলে লেনদেনের প্রক্রিয়াটা কেমন হবে এ ব্যাপারে জানতে চাইলে বাংলাদেশ ব্যাংকের ফরেন এক্সচেঞ্জ পলিসি ডিপার্টমেন্টের কর্মকর্তারা জানান, চুক্তি হলে বাংলাদেশের কেউ রাশিয়ায় পণ্য রফতানি করলে রফতানিমূল্য বাংলাদেশ ব্যাংক টাকায় পরিশোধ করবে। ওই পরিমাণ অর্থ রাশিয়ার কেন্দ্রীয় ব্যাংকের কাছে বাংলাদেশ ব্যাংকের পাওনা থাকবে।
একইভাবে রাশিয়া থেকে বাংলাদেশ পণ্য আমদানি করলে রাশিয়ার কেন্দ্রীয় ব্যাংক ওই পণ্যের রফতানিমূল্য স্থানীয় মুদ্রা রুবলে নিজ দেশের রফতানিকারককে পরিশোধ করবে। ওই পরিমাণ অর্থ বাংলাদেশ ব্যাংকের কাছে রুশ কেন্দ্রীয় ব্যাংকের পাওনা থাকবে। তিন মাস পরপর দুই দেশের কেন্দ্রীয় ব্যাংক দেনা-পাওনার হিসাব করে সমন্বয় করবে।
জানা গেছে, উভয় দেশের মধ্যে যে দেশ রফতানির তুলনায় আমদানি বেশি করবে, অর্থাৎ বাণিজ্য ঘাটতিতে থাকবে, সেই দেশের আমদানিমূল্য থেকে রফতানিমূল্য বাদ দেয়ার পর অবশিষ্ট পাওনা সুদসহ তিন মাস অন্তর তৃতীয় কোনো বৈদেশিক মুদ্রায় পরিশোধ করবে সংশ্লিষ্ট কেন্দ্রীয় ব্যাংক।
বাণিজ্য মন্ত্রণালয় বলছে, ২০১৭-১৮ অর্থবছরে রাশিয়ায় রফতানি হয়েছে বাংলাদেশের ৮৮ কোটি ২০ লাখ ডলারের পণ্য, যা আগের বছরের চেয়ে ৩০ দশমিক ৯ শতাংশ বেশি। আর একই সময়ে রাশিয়া থেকে বাংলাদেশের আমদানি হয়েছে ৭৬ কোটি ২৯ লাখ ডলারের পণ্য, যা আগেরবারের চেয়ে দশমিক ৬ শতাংশ কম।
বাণিজ্য মন্ত্রণালয় জানায়, তৈরি পোশাক, টেক্সটাইল ও চামড়া ছাড়াও কৃষিপণ্যের ব্যাপক চাহিদা রয়েছে রাশিয়াতে। কিন্তু বাণিজ্যিক সম্পর্ক না থাকায় বাংলাদেশের পণ্য ইউরোপীয় ইউনিয়নভুক্ত (ইইউ) দেশগুলোর মাধ্যমে রাশিয়ায় যায়। ইউরোপের কোম্পানিগুলো ক্রেডিট সেলের মাধ্যমে দেশটিতে বাংলাদেশের পণ্য সরবরাহ করে। এর ফলে দামও বেশি পড়ে। উপরন্তু দ্বৈতকরের মুখে পড়তে হয় বাংলাদেশী পণ্যের।
সূত্র জানায়, চীনের পর বাংলাদেশ বিশ্বে দ্বিতীয় বৃহত্তম তৈরি পোশাক রফতানিকারক দেশ। আর তৃতীয় বৃহত্তম পোশাকের বাজার রাশিয়া। আনুমানিক ২৩ থেকে ৩০ বিলিয়ন ডলারের তৈরি পোশাকের বাজার রয়েছে দেশটিতে, এর বার্ষিক প্রবৃদ্ধি ২০ থেকে ৩০ শতাংশ। রাশিয়ার মাধ্যমে সাবেক সোভিয়েত ইউনিয়নভুক্ত ১১ দেশের জোট কমনওয়েলথ অব ইনডিপেনডেন্ট স্টেটসের বাজারে প্রবেশের সুযোগ রয়েছে বাংলাদেশের। প্রায় ১৫ হাজার কোটি ডলারের রফতানি বাজার রয়েছে এ জোটে। সুযোগ রয়েছে আর্মেনিয়া, বেলারুশ, কাজাখস্তান, কিরগিজস্তানকে নিয়ে রুশ নেতৃত্বাধীন ইউরেশিয়ান কাস্টমস ইউনিয়নেও রফতানি সম্প্র্রসারণের। সেই সুযোগটিই এবার নিতে চাচ্ছে বাংলাদেশ।
এর আগে রাশিয়ার সঙ্গে একাধিকবার ব্যাংকিং সম্পর্ক স্থাপনের উদ্যোগ নেয়া হয়েছিল। ২০১৬ সালে এশিয়া-ইউরোপ মিটিং (আসেম) সম্মেলনে যোগ দিতে মঙ্গোলিয়া সফর করেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। ওই সময় দ্বিপক্ষীয় সম্পর্ক নিয়ে রাশিয়ার প্রধানমন্ত্রী মেদভেদেভের সঙ্গে একটি সাইডলাইন বৈঠক করেন তিনি। ওই বৈঠকে দুই দেশের সরকারপ্রধান বাংলাদেশ ও রাশিয়ার মধ্যে সরাসরি ব্যাংকিং সম্পর্ক স্থাপনের যৌথ সিদ্ধান্ত নেন। তবে সে সময় দুই রাষ্ট্রনেতার এ সিদ্ধান্ত আটকে যায় বাংলাদেশ ব্যাংকের মতামতে।
সংশ্লিষ্টরা জানান, বাংলাদেশ ব্যাংক এ বিষয়ে সেই সময় অর্থ মন্ত্রণালয়ে পাঠানো এক মতামতে জানায়, ‘রাশিয়ার সঙ্গে করেসপন্ডিং ব্যাংকিং সম্পর্ক স্থাপনের বিষয়ে সরকারের তত্পরতার সঙ্গে বাংলাদেশ ব্যাংক সম্পূর্ণ একমত পোষণ করে। তবে রাশিয়ার প্রথম সারির ব্যাংকগুলোর ওপর ইইউ ও যুক্তরাষ্ট্রের অফিস অব ফরেন অ্যাসেটস কন্ট্রোল কর্তৃক আরোপিত নিষেধাজ্ঞার কারণে ওই ব্যাংকগুলোর সঙ্গে করেসপন্ডিং ব্যাংকিং সম্পর্ক স্থাপন করা যাচ্ছে না।’
তাই এবার বাংলাদেশ ও রাশিয়ার কেন্দ্রীয় ব্যাংকের মধ্যে সোয়াপ ব্যবস্থা স্থাপনের পদক্ষেপ নিয়েছে সরকার।










