ঢাকার চারপাশের নদ-নদীর তীরভূমিতে পিলার স্থাপন, তীররক্ষা, ওয়াকওয়ে, জেটিসহ আনুষঙ্গিক অবকাঠামো নির্মাণে ২ হাজার ২২৭ কোটি টাকার একটি প্রকল্প পাসের কার্যক্রম চূড়ান্ত করেছে অভ্যন্তরীণ নৌ-পরিবহন কর্তৃপক্ষ (বিআইডব্লিউটিএ)। তৃতীয় পর্যায়ের এ প্রকল্পের মেয়াদ ধরা হয়েছে ২০২০ সালের জুলাই থেকে ২০২৩ সালের জুন পর্যন্ত। মূলত ঢাকার চারপাশের প্রবহমান নদ-নদী তথা বুড়িগঙ্গা, তুরাগ, শীতলক্ষ্যা, ধলেশ্বরী ও বালুর তীরভূমি অবৈধ দখলমুক্ত করে তীররক্ষা, ওয়াকওয়ে, জেটি ও অন্যান্য সুবিধার জন্য এ প্রকল্প হাতে নেয়া হয়েছে।
যদিও এর আগে দুই দফায় প্রায় হাজার কোটি টাকা ব্যয়ে এসব নদ-নদী রক্ষা ও অবৈধ দখলমুক্ত করে উদ্যোগ বাস্তবায়ন করেছিল বিআইডব্লিউটিএ। প্রথম পর্যায়ে ২০১১ সালের জুলাই থেকে ২০১৫ সালের জুন পর্যন্ত বেশ সাফল্যের সঙ্গে প্রকল্পটি বাস্তবায়ন করা হয়। ফলে সে সময় বদলে গিয়েছিল নদ-নদীগুলোর চেহারা। কিন্তু প্রকল্পের প্রথম পর্বের কাজ সমাপ্তির বছর না ঘুরতেই বদলে যেতে থাকে দৃশ্যপট। ফিরতে শুরু করে দখলদাররা। এমন বাস্তবতায় ২০১৮ সালের জুলাই থেকে দ্বিতীয় পর্যায়ের কাজ হাতে নেয়া হয়, যা এখনো চলমান। এরই মধ্যে নতুন করে তৃতীয় পর্যায়ের কাজে হাত দেয়ার পরিকল্পনা করছে সংস্থাটি।
নতুন প্রস্তাবিত প্রকল্পের খসড়ায় বলা হয়, এটি বাস্তবায়ন হলে ঢাকার চারপাশের নদ-নদীর তীরভূমি অবৈধ দখলমুক্ত থাকার পাশাপাশি নদীর তীরভূমি এলাকার সৌন্দর্য বাড়বে। এছাড়া কার্যকরী নদী ও নৌ-পরিবহন ব্যবস্থার বাস্তবায়ন সম্ভব হবে এবং নদী ও নদীতীরবর্তী এলাকার পরিবেশগত উন্নয়নের সঙ্গে সঙ্গে রাজধানীর চারপাশে কৃষি ও মত্স্য শিল্প বিকাশে কার্যকরী ভূমিকা রাখবে। ঢাকা দক্ষিণ ও উত্তর সিটি করপোরেশন, কেরানীগঞ্জ, পাগলা, শ্যামপুর, নারায়ণগঞ্জ ও টঙ্গী এলাকায় এ প্রকল্প বাস্তবায়ন করা হবে বলেও প্রাথমিক সিদ্ধান্ত নেয়া হয়েছে।
প্রায় দ্বিগুণ বাজেটের এ প্রকল্পে ১৪৬ কিলোমিটার এলাকাজুড়ে ওয়াকওয়ে নির্মাণসহ মোট ২১ ধরনের কার্যক্রম পরিচালনা করা হবে। এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য কাজ হলো জমি অধিগ্রহণ, আরসিসি ওয়াকওয়ে নির্মাণ, পার্কিং ইয়ার্ড, ফুটওভার ব্রিজ, সীমানা প্রাচীর নির্মাণ, আরসিসি বসার বেঞ্চ, ড্রেনেজ ব্যবস্থা, আরসিসি জেটি, স্টিল জেটি, ইকোপার্ক, সবুজ বনায়ন, জলজ উদ্ভিদ বেষ্টনী ইত্যাদি নির্মাণ করা হবে।
তবে স্থানীয়দের অভিযোগ, এসব নির্মাণের পর আর নজরদারি থাকে না বিআইডব্লিউটিএর। ফলে দ্রুত এসব অবকাঠামো নষ্ট হয়ে যায়। এর আগে প্রথম পর্যায়ে ২০ কিলোমিটার ওয়াকওয়ে নির্মাণ করা হয়েছিল। দ্বিতীয় পর্যায়ে ৫২ কিলোমিটার ওয়াকওয়ে নির্মাণসহ বিভিন্ন সুবিধাদি নির্মাণ প্রকল্পের কাজ চলমান। প্রকল্পের প্রথম পর্বে ব্যয় হয়েছে ১০৮ কোটি ও দ্বিতীয় পর্বে ১ হাজার ১৮১ কোটি টাকা। ২০২০ সালের জুনে প্রকাশিত প্রথম পর্বের কাজের মূল্যায়ন সম্পর্কে পরিকল্পনা মন্ত্রণালয়ের বাস্তবায়ন পরিবীক্ষণ ও মূল্যায়ন বিভাগের (আইএমইডি) প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, টঙ্গী নদীবন্দরের উচ্ছেদকৃত ফোরশোর ভূমিতে ভৌত অবকাঠামো নির্মাণের পর উচ্ছেদকৃত জায়গা যেন ফের দখল করতে না পারে, এজন্য বৃক্ষ রোপণ করা হয়েছে। মানুষের সুবিধার জন্য বসার বেঞ্চ নির্মাণ করা হয়েছে। এছাড়া প্রকল্পটি বাস্তবায়নের ফলে স্থানীয় মানুষের জীবনযাত্রায় উন্নয়নের ছোঁয়া লেগেছে এবং কৃষিকাজের নতুন নতুন সুযোগ সৃষ্টি হয়েছে।
কিন্তু সম্প্রতি সরেজমিন পরিদর্শনে গিয়ে ফোরশোর ভূমিতে কোনো গাছ বা বেঞ্চ দেখতে পাওয়া যায়নি। কৃষিকাজের কোনো সুযোগও সেখানে সৃষ্টি হয়নি। স্থানীয়রা জানিয়েছেন, নির্মিত ভৌত অবকাঠামো তাদের জীবনযাত্রায় কোনো প্রভাব ফেলতে পারেনি। বরং কয়েকদিন পরপর দখল ও উচ্ছেদ হয়। আর এতে সমস্যায় পড়তে হয় সাধারণ মানুষকেই।
একইভাবে গাবতলী অংশের ফোরশোর ভূমি ও ওয়াকওয়ের আশপাশেও ওই প্রকল্পের অর্থায়নে লাগানো কোনো গাছ দেখা যায়নি। অথচ এ অংশের বর্ণনায় পরিকল্পনা মন্ত্রণালয়ের প্রভাব মূল্যায়ন সমীক্ষা প্রতিবেদন ২০২০-এ বলা হয়েছে বৃক্ষরোপণ ও ওয়াকওয়েতে হাঁটতে আসা মানুষজনের বিশ্রামের জন্য বেঞ্চ নির্মাণের কথা। তবে রক্ষণাবেক্ষণের অভাবে নির্মিত অবকাঠামোগুলো নষ্ট হয়ে যাচ্ছে এবং আলোকস্বল্পতার কারণে ওয়াকওয়েতে রাতে চলাফেরা করতে মানুষজন ভয় পায়। প্রতিবেদনে আরো বলা হয়েছে, মাদকসেবীদের আড্ডাও বসে এসব অবকাঠামোয়।
তদারকির অভাবে নির্মিত অবকাঠামো নষ্ট হওয়ার বিষয়টি স্বীকার করেছেন বিআইডব্লিউটিএর চেয়্যারম্যান কমডোর গোলাম সাদেকও। তিনি বণিক বার্তাকে বলেন, আমাদের জনবল সংকটের কারণে সবসময় তদারক করা সম্ভব হয় না। ফলে অনেক জায়গায় অবকাঠামো ভেঙে যায়। তবে সেগুলো আবার মেরামতও করি। এবার আমরা তৃতীয় পর্যায়ে ১৪৬ কিলোমিটার ওয়াকওয়ে ও অবকাঠামো নির্মাণ করার পরিকল্পনা নিচ্ছি। এসব রক্ষণাবেক্ষণের জন্য বিআইডব্লিউটিএ ও নৌ-পুলিশের সক্ষমতা বাড়ানো জরুরি।
বিআইডব্লিউটিএর রক্ষণাবেক্ষণের অবহেলার কথা তুলে ধরে গত ২০ ফেব্রুয়ারি অযত্ন-অবহেলায় আগের দশায় ফিরছে তুরাগ এবং ২২ ফেব্রুয়ারি ৩৬ কোটি টাকার প্রকল্পে নষ্ট হচ্ছে তুরাগতীরের অবকাঠামো, ফিরছে দখলদাররা শিরোনামে বণিক বার্তায় দুটি প্রতিবেদন প্রকাশিত হয়। সেখানেও বলা হয়, মূলত রক্ষণাবেক্ষণের অভাবে হাজার কোটি টাকার চমত্কার প্রকল্পটি ভেস্তে গেছে।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, রক্ষণাবেক্ষণের ব্যবস্থা না করে এভাবে অবকাঠামো তৈরি এবং বারবার দখল-উচ্ছেদ অভিযান পরিকল্পনা খামখেয়ালিপনা ছাড়া কিছুই নয়। এতে নদীও বাঁচবে না, দখলমুক্তও হবে না। মাঝ থেকে রাষ্ট্রের বিপুল অর্থের অপচয় হচ্ছে।
প্রসঙ্গত, দ্বিতীয় পর্যায়ে বিআইডব্লিউটিএর চলমান প্রকল্পের আওতায় ৫২ কিলোমিটার ওয়াকওয়ে নির্মাণের পাশাপাশি ৪৪ হাজার ৭৮৩ মিটার ব্যাংক প্রটেকশন, এক হাজার মিটার কি-ওয়াল, ১৯টি আরসিসি স্টেপসহ আরসিসি জেটি, তিনটি ইকোপার্ক ও ১০ হাজার ৮২০টি সীমানা পিলার নির্মাণ করা হচ্ছে। আগামী বছরের জুনে শেষ হবে প্রকল্পটির মেয়াদ। এ প্রকল্পের আওতায় ঢাকা নদীবন্দরের অন্তর্ভুক্ত রামচন্দ্রপুর থেকে বসিলা পর্যন্ত ৩ দশমিক ৫৫ কিলোমিটার, রায়ের বাজার খাল থেকে কামরাঙ্গীর চর পর্যন্ত ৪ দশমিক ৪৫, হাসনাবাদ-কাওটাইল ৮ দশমিক ৩৫, সদরঘাট থেকে বাবুবাজার ব্রিজ পর্যন্ত এক, ফতুল্লা-ধর্মগঞ্জ সাড়ে তিন, টঙ্গী নদীবন্দরের আওতায় বাতুলিয়া-উজানপুর ৩ দশমিক ৭২৫, পাগার মৌজা-হারবাইদ ৩ দশমিক শূন্য ৬৮, আশুলিয়া-কামারপাড়া (ঢাকা প্রান্ত) ৩ দশমিক ৫৬, আশুলিয়া-কামারপাড়া (গাজীপুর প্রান্ত) ৩ দশমিক ৭৫০, নারায়ণগঞ্জ নদীবন্দরের আওতায় ডিইপিটিসি এলাকা ২ দশমিক ৫০, নারায়ণগঞ্জ সাইলো থেকে কুমুদিনী ৮ দশমিক ৫৫ ও সুলতানা কামাল থেকে কাঁচপুর সেতু এলাকা পর্যন্ত ছয় কিলোমিটার ওয়াকওয়ে নির্মাণের কাজ চলছে।
এর আগে প্রথম পর্যায়ে ঢাকা, টঙ্গী ও নারায়ণগঞ্জ নদীবন্দরের অধীনে ২০ কিলোমিটার ওয়াকওয়ে এবং ঢাকার শ্যামপুরে ও নারায়ণগঞ্জে দুটি ইকোপার্ক নির্মাণ করা হয়েছে।










