দিনাজপুরের ফুলবাড়ী উপজেলা থেকে কয়লা উত্তোলনের জন্য গত শতকের শেষ দশকে ব্রিটিশ কোম্পানি এশিয়া এনার্জির সঙ্গে ৩০ বছর মেয়াদি একটি চুক্তি করেছিল সরকার। চুক্তি অনুযায়ী উন্মুক্ত পদ্ধতিতে উত্তোলিত কয়লার সিংহভাগই রয়্যালটি হিসেবে কোম্পানিটিকে দিয়ে দেয়ার কথা ছিল। যদিও এ চুক্তির বিরোধিতা করে স্থানীয় জনসাধারণ। তাদের এ আন্দোলনে যুক্ত হয় ‘তেল-গ্যাস-খনিজ সম্পদ ও বিদ্যুৎ-বন্দর রক্ষা জাতীয় কমিটি’। এ আন্দোলন গতি পায় চলতি শতকের শুরুতে বিএনপি সরকারের আমলে—২০০৫ সালে। ২০০৬ সালের আগস্টে এশিয়া এনার্জির কার্যালয় ঘেরাওয়ের এক কর্মসূচি হাতে নেয় তেল-গ্যাস-খনিজ সম্পদ ও বিদ্যুৎ-বন্দর রক্ষা জাতীয় কমিটি। দাবি ছিল উন্মুক্ত পদ্ধতিতে কয়লা উত্তোলনের সিদ্ধান্ত থেকে সরে আসার পাশাপাশি এশিয়া এনার্জির সঙ্গে সই করা চুক্তি বাতিল করতে হবে। এ কর্মসূচি চলাকালে তৎকালীন বিডিআর গুলি চালালে ব্যাপক তীব্রতা পায় এ আন্দোলন। এরপর ওই মাসেই আন্দোলনকারীদের দাবি মেনে নিতে বাধ্য হয় সে সময়কার ক্ষমতাসীন বিএনপি সরকার।
এখন পর্যন্ত ফুলবাড়ী আন্দোলনকেই দেখা হচ্ছে তেল-গ্যাস-খনিজ সম্পদ ও বিদ্যুৎ-বন্দর রক্ষা জাতীয় কমিটির সবচেয়ে বড় সফলতা হিসেবে। বিএনপি সরকারের আমলে দাবি আদায়ের ক্ষেত্রে সাফল্য দেখাতে পারলেও পরে আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে তেমন কোনো উল্লেখযোগ্য অর্জন নেই আন্দোলনকেন্দ্রিক প্লাটফর্মটির। গত দেড় দশকে কোনো আন্দোলনেই সাফল্যের দেখা পায়নি এ কমিটি।
রাজনৈতিক বিশ্লেষক ও পর্যবেক্ষকদের মতে, কমিটির অন্তর্ভুক্তদের একাংশ সরকারের সঙ্গে সহযোগিতামূলক অবস্থান গ্রহণের পাশাপাশি জনসম্পৃক্ততা তৈরি করতে না পারা ও সাংগঠনিক দুর্বলতার কারণে গত দেড় দশকে প্লাটফর্মটি তেমন কোনো সাফল্য অর্জন করতে পারেনি।
প্রাণ-প্রকৃতি-পরিবেশ ও জাতীয় স্বার্থের সুরক্ষা নিশ্চিত করে স্থানীয় খনিজ ও জ্বালানি সম্পদ, বিদ্যুৎ ও বন্দর ব্যবহারের দাবি থেকে ১৯৯৮ সালে গড়ে তোলা হয় ‘তেল-গ্যাস-খনিজ সম্পদ ও বিদ্যুৎ-বন্দর রক্ষা জাতীয় কমিটি’। এটি মূলত একটি আন্দোলনকেন্দ্রিক প্লাটফর্ম, যা গড়ে উঠেছে বামপন্থী কয়েকটি রাজনৈতিক দল, পরিবেশবাদী ও বিশিষ্ট নাগরিকদের নিয়ে।
গত দেড় দশকে প্লাটফর্মটির সবচেয়ে বড় আন্দোলন গড়ে উঠেছিল রামপাল কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎ কেন্দ্রের বিরোধিতা করতে গিয়ে। বিদ্যুৎ কেন্দ্র থেকে নির্গত ধোঁয়া, ছাই, রাসায়নিক পদার্থ সুন্দরবন ও এর আশপাশের বায়ু-পানি-মাটিকে দূষিত করার পাশাপাশি গোটা বনের অস্তিত্বকে বিপন্ন করবে অভিযোগ তুলে এর বিরুদ্ধে শক্ত অবস্থান নিয়েছিল তেল-গ্যাস-খনিজ সম্পদ ও বিদ্যুৎ-বন্দর রক্ষা জাতীয় কমিটি। সভা-সেমিনার, গণসংযোগ থেকে শুরু করে লংমার্চ, সমাবেশ এমনকি হরতালের মতো কর্মসূচিও নেয়া হয়েছিল। যদিও শেষ পর্যন্ত আন্দোলনটি সফলতার মুখ দেখেনি।
এ বিষয়ে জানতে চাইলে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতি বিভাগের অধ্যাপক এমএম আকাশ বণিক বার্তাকে বলেন, ‘ফুলবাড়ীতে কয়লা খননের প্রকল্প তৎকালীন সরকার বাস্তবায়ন করতে না পারার কারণ হলো সাধারণ মানুষ সেটির বিরুদ্ধে অবস্থান নিয়েছিল অর্থাৎ জাতীয় চেতনা জাগ্রত ছিল। একই সঙ্গে আন্দোলনগুলোও তীব্র ছিল। কিন্তু রামপালে আমরা সেটি পারিনি। এসব চুক্তির মাধ্যমে শাসকশ্রেণী তাদের স্বার্থ দেখে। রামপালকে কেন্দ্র করে দেশী-বিদেশী লবিগুলো অনেক শক্তিশালী ছিল। এছাড়া স্থানীয় জনসম্পৃক্ততা তৈরি ও জাতীয় চেতনা জাগ্রত করতে না পারা এবং আমাদের সাংগঠনিক দুর্বলতার কারণে সরকারকে রামপাল তাপবিদ্যুৎ কেন্দ্রের মতো চুক্তি থেকে সরাতে পারিনি। আন্দোলনের মাধ্যমে আমরা তাদের পায়ের নিচের মাটি অসহনীয় রকমের উত্তপ্ত করে তুলতে পারিনি। তবে যেসব বিষয় থেকে সরকার সরে এসেছে, সেগুলো আমরা আন্দোলনের মাধ্যমেই আদায় করতে পেরেছি।’
রাজনৈতিক বিশ্লেষক ও পর্যবেক্ষকরা বলছেন, যেকোনো আন্দোলনে সফলতার সবচেয়ে বড় অনুঘটক হলো স্থানীয় জনসম্পৃক্ততা। জনসাধারণের যেকোনো অংশে গড়ে ওঠা আন্দোলনের বুনন শক্ত হলে তা অন্যান্য অংশেও দ্রুত ছড়িয়ে পড়ে বলে রণজিৎ গুহের মতো ইতিহাসবিদদের ভাষ্যে উঠে এসেছে। স্থানীয় জনসাধারণের মধ্যে এ বুনন গড়ে তোলা যায়নি বলেই রামপাল বিদ্যুৎ কেন্দ্রবিরোধী আন্দোলন সফল হয়নি।
তেল-গ্যাস-খনিজ সম্পদ ও বিদ্যুৎ-বন্দর রক্ষা জাতীয় কমিটির নেতা ও বাংলাদেশের কমিউনিস্ট পার্টির (সিপিবি) সাধারণ সম্পাদক রুহিন হোসেন প্রিন্স বণিক বার্তাকে বলেন, ‘আগের আন্দোলনগুলোয় আমরা জনসম্পৃক্ততা তৈরি করতে পেরেছিলাম। স্থানীয় নানা শ্রেণী-পেশার মানুষকে সঙ্গে নিয়ে আমরা লাগাতার কর্মসূচি দিয়ে জাতীয় ইস্যুতে পরিণত করে ওইসব প্রকল্প থেকে সরকারকে সরাতে বাধ্য করেছিলাম। সে সময় প্রগতিশীল দলগুলোর কোনো পিছুটান ছিল না। তারা মনে করত পিছু ফেরার কোনো জায়গা নেই।’
তিনি আরো বলেন, ‘এখন তেল-গ্যাসভিত্তিক বিষয়গুলোর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে সিন্ডিকেট, লুটেরা এবং দেশী-বিদেশী কোম্পানি। সে সিন্ডিকেটের লোকেরাই এখন ক্ষমতার কেন্দ্রবিন্দুতে। ফলে আন্দোলন সফলতার মুখ দেখছে না। এছাড়া আন্দোলনে জনসম্পৃক্ততা মূলত তৈরি করে থাকে স্থানীয় রাজনীতিবিদরা। কিন্তু আমাদের যারা জনসম্পৃক্ততা তৈরি করত তারা এখন ভয়ে থাকে। ফলে জনসম্পৃক্ততা তৈরিতে বড় ধরনের শূন্যতা তৈরি হয়েছে। এছাড়া আমাদেরও সাংগঠনিকভাবে কিছু সংকট রয়েছে।’
রামপালে সাফল্য না পেলেও এর আগে বিভিন্ন সময় সরকারের গ্যাস ও সার রফতানির সিদ্ধান্ত, ফুলবাড়ীতে উন্মুক্ত পদ্ধতিতে কয়লা উত্তোলন এবং সরকারি কয়লা নীতির বিরুদ্ধে সফল আন্দোলনের নজির রয়েছে তেল-গ্যাস-খনিজ সম্পদ ও বিদ্যুৎ-বন্দর রক্ষা জাতীয় কমিটির। কিন্তু গত দেড় দশকে প্লাটফর্মটির আন্দোলন সফল না হওয়ার পেছনে অংশীদার রাজনৈতিক দলগুলোর অবস্থান পরিবর্তন ও দলীয় স্বার্থকে প্রাধান্য দেয়ার বিষয়টিকেও অনেকাংশে দায়ী করছেন সংশ্লিষ্টদের একাংশ। নাম অপ্রকাশিত রাখার শর্তে তেল-গ্যাস-খনিজ সম্পদ ও বিদ্যুৎ-বন্দর রক্ষা জাতীয় কমিটির সামনের সারির একজন বণিক বার্তাকে বলেন, ‘২০১৩, ১৪ ও ১৫ সালের দিকে আন্দোলনগুলো গতি পেয়েছিল। এর পরই রাজনীতিতে নিজেদের স্বার্থের কথা চিন্তা করে কিছু বাম দল তাদের অবস্থান পাল্টাতে থাকে। রামপালের আন্দোলনে ২০১৭ সালে খুলনার সমাবেশে সে অবস্থাটি আরো স্পষ্ট হয়। সে সময় কয়েকটি দল ক্ষমতাসীনদের আস্থা অর্জনের চেষ্টা করেছিল, যাতে করে নির্বাচনে নিজেদের একটা জায়গা করে নিতে পারে। তাদের জন্যই রামপালের মতো ইস্যুর মৃত্যু ঘটে।’
বিদ্যুৎ ও জ্বালানি খাত নিয়ে অতীতে দীর্ঘদিন ধরেই সোচ্চার ভূমিকা রেখেছে তেল-গ্যাস-খনিজ সম্পদ ও বিদ্যুৎ-বন্দর রক্ষা জাতীয় কমিটি। তবে সাম্প্রতিক সময় বিদ্যুৎ ও জ্বালানি খাতে রাষ্ট্রের ব্যয় ও লোকসান বাড়লেও প্লাটফর্মটিকে এখন পর্যন্ত এ নিয়ে তেমন কোনো জোরালো অবস্থান নিতে দেখা যায়নি। যদিও সরকারের তথ্য অনুযায়ী, গত এক দশকে শুধু ক্যাপাসিটি চার্জ হিসেবে ১ লাখ কোটি টাকার বেশি অর্থ ব্যয় হয়েছে সরকারের, যার বেশির ভাগই নিয়েছে বেসরকারি খাতের বিদ্যুৎ উৎপাদন কোম্পানিগুলো। আবার বাংলাদেশ বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ডের (বিপিডিবি) লোকসানও ক্রমেই বেড়ে চলেছে। সংকটকে বাড়িয়ে তুলছে এলএনজি আমদানিনির্ভর জ্বালানি নীতিও।
গাইবান্ধার গোবিন্দগঞ্জের ভূমিপুত্র আখচাষী কৃষকদের আন্দোলনের সঙ্গেও প্লাটফর্মটির নেতারা যুক্ত হয়েছিলেন। কয়েক বছর আগের ওই আন্দোলন জাতীয় সংবাদমাধ্যমগুলোয় বড় ধরনের আলোড়ন তৈরি করেছিল। সেখানে রংপুর চিনিকল স্থাপনের সময় আখ চাষের জন্য স্থানীয় সাঁওতাল কৃষকদের জমি অধিগ্রহণ করা হয়েছিল। ওই চুক্তিতে উল্লেখ করা ছিল—আখ চাষ না হলে জমি তার মালিকদের ফেরত দেয়া হবে। কিন্তু এখন সেখানে আর আখ চাষ হয় না। উল্টো চুক্তিমতো জমি ফেরত না দিয়ে ইপিজেড নির্মাণের পরিকল্পনা চলছে। ওই এলাকার ভূমিপুত্র কৃষকরা এখনো তাদের জমি ফেরত পাননি।
সার্বিক বিষয়ে জানতে চাইলে তেল-গ্যাস-খনিজ সম্পদ ও বিদ্যুৎ-বন্দর রক্ষা জাতীয় কমিটির সদস্য সচিব অধ্যাপক আনু মুহাম্মদ বণিক বার্তাকে বলেন, ‘ফুলবাড়ী আন্দোলন কয়েক লাখ মানুষের সঙ্গে সম্পৃক্ত ছিল। তারা নিজেরাই এ বিষয়ে সচেতন ছিল। তারা বিভিন্ন ধরনের রক্ষা কমিটি গড়ে তুলেছিল। আন্দোলনের ভিত্তিও গ্রাম থেকেই তৈরি হয়েছিল। পরে তারা আমাদের সঙ্গে যোগাযোগ করে। স্থানীয় লোকজনের সম্পৃক্ততায় আমরা আন্দোলনটিকে জাতীয় পর্যায়ে রূপ দিতে সচেষ্ট হই। সরকারও ফুলবাড়ী আন্দোলনের অভিজ্ঞতাকে পরের ইস্যুগুলোয় কাজে লাগিয়েছে। রামপাল কয়লা বিদ্যুৎ প্রকল্পের ওখানে কয়েকশ পরিবার ছিল। তাদের নানা ভয়ভীতি দেখিয়ে আইন না মেনে প্রকল্প হওয়ার আগেই উচ্ছেদ করে দেয়া হয়েছে। তাছাড়া রামপাল বিদ্যুৎ কেন্দ্রের কারণে সরাসরি ক্ষতিগ্রস্ত হবে সুন্দরবন। সুন্দরবনের পক্ষে তো মানুষের মতো প্রতিরোধ করা সম্ভব না। সারা দেশের মানুষের সমর্থন থাকায় এটি দীর্ঘস্থায়ী হলেও আমাদের দীর্ঘ সময় ধরে আন্দোলন চালিয়ে নেয়ার মতো সাংগঠনিক ক্ষমতা ছিল না।’
তিনি আরো বলেন, ‘রামপাল আন্দোলনের শুরুতেই আমরা নানা হামলার শিকার হই। ১৪৪ ধারা জারি করা হয়। ২০১৪ সালের পর দমন-পীড়ন অনেক বেড়ে যায়। ওই এলাকায় সুন্দরবন আন্দোলনের সঙ্গে যুক্তরা নানা ধরনের হয়রানির শিকার হয়। তাদের অনেকের পক্ষেই কাজ চালিয়ে যাওয়া সম্ভব হয়নি। সুন্দরবন আন্দোলনের বৈশিষ্ট্য হলো এটি দীর্ঘ সময় ধরে দেশব্যাপী ছড়িয়েছে এবং সারা দেশের মানুষের সমর্থন ছিল। আমাদের আন্দোলনের ফলে একটি ইউনিট তারা বন্ধ করেছে। কিন্তু পুরোপুরি প্রত্যাহার করেনি। তবে আন্দোলনকে ব্যর্থ বলা যাবে না। কারণ এ আন্দোলনের ফলে পরিবেশ বিষয়টা নিয়ে মানুষ ভাবছে, কথা বলছে। আন্দোলনের ফলেই বিষয়গুলো নিয়ে ভবিষ্যৎ প্রজন্মের মধ্যে প্রশ্ন উঠবে।’










