ইউক্রেনে চলমান যুদ্ধ নিয়ে বাংলাদেশের গণমাধ্যমের বিরুদ্ধে পক্ষপাতমূলক সংবাদ প্রকাশের অভিযোগ করেছেন রাশিয়ার রাষ্ট্রদূত আলেকজান্ডার ভি মানতিতস্কি। বাংলাদেশে নিযুক্ত এ উচ্চপদস্থ রুশ কর্মকর্তা বলেছেন, এ দেশের গণমাধ্যম-সম্প্রচারমাধ্যমগুলো পশ্চিমাদের মতোই ‘রাশিয়া-বিরোধী প্রচারণা’ শুরু করেছে।

রাশিয়ার প্রতি ঘৃণা, পক্ষপাত ও কুসংস্কারের বশবর্তী হয়ে প্রতিবেদনগুলো করা হচ্ছে উল্লেখ করে বাংলাদেশের গণমাধ্যম-সম্প্রচারমাধ্যমের প্রতি একটি খোলা চিঠি লিখেছেন আলেকজান্ডার ভি মানতিতস্কি। বাংলাদেশে নিযুক্ত রাশিয়ার দূতাবাসের অফিশিয়াল ফেসবুক পেইজে চিঠিটি প্রকাশ করা হয়েছে।

চিঠিতে রুশ রাষ্ট্রদূত বলেন, আমি ইউক্রেন ইস্যুতে গত কয়েকদিনের পশ্চিমা সংবাদ সংস্থার বিভিন্ন প্রতিবেদন সংগ্রহ করেছি। একই সঙ্গে ইউরোপ ও আমেরিকার কিছু বিশ্লেষণও আমার কাছে আছে। এসব লেখা মূলত রাশিয়াবিরোধী প্রোপাগান্ডা। অনেক সময় এসব লেখার মাধ্যমে এমন কিছু প্রচার করা হয়েছে যা সম্পূর্ণ পক্ষপাতমূলক। এসব লেখা পশ্চিমা মূলধারার গণমাধ্যম থেকে স্পষ্টতই রুশো-ফোবিক হিস্টিরিয়া'র দিকে পরিচালিত হচ্ছে। বাংলাদেশী কয়েকটি পত্রিকা ও সম্প্রচারমাধ্যম বিস্তৃতভাবে সেরকম কিছুই করছে।

তিনি আরো বলেন, আমি বাংলাদেশের সংবাদ পাঠকদের কাছে ব্যাখ্যা করতে চাই কেন রাশিয়ান ফেডারেশন ইউক্রেনে বিশেষ সামরিক অভিযান পরিচালনা করছে, এর পেছনে লক্ষ্য কী।

ইউক্রেনে সামরিক অভিযানের লক্ষ্য ব্যাখ্যা করতে গিয়ে আলেকজান্ডার ভি মানতিতস্কি বলেন, গত আট বছর ধরে কিয়েভে বসবাসরত রুশ ভাষাভাষীদের ওপর গণহত্যা চালাচ্ছে ইউক্রেন। আমরা সেটি বন্ধ করতে চাই। নব্য ফ্যাসিবাদ নির্মূল, দেশটিতে পারমাণবিক অস্ত্রের বিকাশ রোধ ও ন্যাটো সামরিক ঘাঁটি স্থাপন রুখে দিতে চাই আমরা।

অভিযানের পরের কাজ সম্পর্কে ব্যাখ্যা করতে গিয়ে রাশিয়ার এ রাষ্ট্রদূত জানান, নাৎসি মতাদর্শ থেকে মুক্তি ও দেশপ্রেমিক হিসেবে নব্য ফ্যাসিবাদের অবসান ঘটাতে কাজ করতে চান তারা। এ ছাড়া সীমান্তে সামরিক হুমকি দূর করতে, শান্তিপূর্ণ সহাবস্থানের জন্য হুমকিস্বরূপ ইউক্রেনের আগ্রাসী সত্তাকে নিরস্ত্র করা, ও রাশিয়ার আদালতে আইনি প্রক্রিয়ার মাধ্যমে ইউক্রেনের বেসামরিক জনসংখ্যা এবং রাশিয়ান ফেডারেশনের নাগরিকদের বিরুদ্ধে অপরাধ করেছে এমন ব্যক্তিদের চিহ্নিত করা এবং শাস্তি দিতেও তারা কাজ করতে চান।

মানতিতস্কি দাবি করেছেন, রাশিয়ার পার্লামেন্টের অনুমতি নিয়ে জাতিসংঘ সনদের ৫১ ধারার সপ্তম অধ্যায় অনুসরণ করেই ইউক্রেনে রুশ বাহিনীর অভিযান পরিচালিত হচ্ছে। দোনেৎস্ক পিপলস রিপাবলিক ও লুহানস্ক পিপলস রিপাবলিকের সঙ্গে বন্ধুত্ব ও পারস্পরিক সহায়তার চুক্তি যা ২২ ফেব্রুয়ারি স্বাক্ষর হয় সেটি বাস্তবায়নে মস্কো একটি বিশেষ সামরিক অভিযান শুরু করেছে। চিঠিতে তিনি আরো বলেন, আমরা ইউক্রেনের ভূখণ্ড দখল করার পরিকল্পনা করছি না। দেশটির জনগণের সঙ্গে আমরা যুদ্ধেও জড়াতে চাই না। জোর করে কিছু আদায়ের লক্ষ্যেও আমরা কিছু করছি না। সীমান্তে রাশিয়া সরাসরি হুমকির মুখে আছে, তাই আমরা বর্তমান অবস্থান নিতে বাধ্য হয়েছি।

চিঠিতে যুক্তরাষ্ট্র, ন্যাটো, যুক্তরাষ্ট্রের ডিফেন্স থ্রেট রিডাকশন এজেন্সি (ডিটিআরএ), প্লেগ, অ্যানথ্রাক্স, টুলারেমিয়া, কলেরা, প্যাথোজেনিক এইচ৫এন১ ইনফ্লুয়েঞ্জা সিনথেটিক জীববিজ্ঞানের সাহায্যে নিউক্যাসল রোগ নিয়েও কথা বলেন রাষ্ট্রদূত আলেকজান্ডার ভি মানতিতস্কি।

ইউক্রেনে রাশিয়ার সামরিক অভিযান নিয়ে বাংলাদেশি গণমাধ্যমের পক্ষপাতমূলক দৃষ্টিভঙ্গি একটি অপশক্তির ইচ্ছাকৃত প্রচেষ্টার ফল বলে উল্লেখ করেন রাশিয়ার রাষ্ট্রদূত। তিনি বলেন, এই অপশক্তি রাশিয়ান ফেডারেশন এবং বাংলাদেশের মধ্যে পারস্পরিক সহযোগিতাপূর্ণ সম্পর্ককে ক্ষুণ্ণ করতে চেয়েছিল।

চিঠিতে বাংলাদেশ ও রাশিয়ার ৫০ বছরের বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্কের কথাও উল্লেখ করেন রুশ রাষ্ট্রদূত। তিনি আশ্বাস দেন, রাশিয়া তার বর্তমান অর্থনৈতিক সমস্যা মোকাবেলা করবে এবং বাংলাদেশের সঙ্গে সহযোগিতা অব্যাহত রাখবে। রাশিয়ার রাষ্ট্রদূত আরো বলেন, আমি আপনাদের নিশ্চিত করতে পারি যে, এবার আমরা একটি সুস্থ মানসিকতা নিয়ে এই সংকট থেকে বেরিয়ে আসবো। পশ্চিমারা তাদের স্বার্থে নিজস্ব মূল্যবোধ ত্যাগেও দ্বিধা করে না। এতে আমাদের আর কোনো বিভ্রান্তি নেই। আমাদের জনগণের জন্য গুরুত্বপূর্ণ এমন ক্ষেত্রগুলোয় যেন পশ্চিমের ওপর নির্ভর করতে না হয়, সে চেষ্টাই করবো।

গতকালকের চিঠিতে ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধের কথাও উল্লেখ করেন তিনি। বলেন, ভারত ও সোভিয়েত ইউনিয়নের সমর্থনে অবাঙালি শাষকদের অধিপত্য, বাঙালি জাতির ওপর হয়রানি, বৈষম্য ও সহিংসতার পতন ঘটাতে নয় মাসের যুদ্ধের পর স্বাধীনতা পায় বাংলাদেশ, নিজেদের ভাষায় কথা বলার অধিকার পায়। ডনবাসের (দোনেৎস্ক ও লুহানস্ক) জনগণও গত ৮ বছর ধরে গণহত্যার শিকার হচ্ছে। তারাও নিজেদের অধিকার পেতে লড়াই-সংগ্রাম করছে। তাদের মাতৃভাষা বলার অধিকার নিশ্চিত ও ভাষাভিত্তিক বৈষম্যের অবসান ঘটাতে রাশিয়া এগিয়ে এসেছে।

সবশেষে বাংলাদেশের গণমাধ্যমকে পক্ষপাতদুষ্ট খবর প্রচার না করার অনুরোধ করেন বাংলাদেশে নিযুক্ত রাশিয়ার রাষ্ট্রদূত আলেকজান্ডার ভি মানতিতস্কি।