কভিড-১৯ মহামারীতে বিশ্বজুড়ে লকডাউন ও অচলাবস্থার কারণে চাকরি হারিয়ে দেশে ফিরেছেন অন্তত ৩ লাখ ২৬ হাজার প্রবাসী। কর্মহীন এসব প্রবাসী শ্রমিক, প্রশিক্ষিত তরুণ ও বেকার যুবকদের ব্যবসা ও আত্মকর্মসংস্থান সৃষ্টির জন্য ৩ হাজার ২০০ কোটি টাকার প্রণোদনা প্যাকেজ ঘোষণা করেছে সরকার। এ প্যাকেজ থেকে প্রবাসী কল্যাণ ব্যাংকের মাধ্যমে স্বল্প সুদে ৫০০ কোটি টাকার ঋণ বিতরণের লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে। ঋণের জন্য বরাদ্দকৃত এ অর্থের অর্ধেক গত বছরের আগস্টে ছাড় করেছে অর্থ মন্ত্রণালয়। এরপর প্রায় ছয় মাস পেরিয়ে গেলেও এ পর্যন্ত ছাড়কৃত অর্থের মাত্র সাড়ে ৬ শতাংশের কিছু বেশি ঋণ হিসেবে বিতরণ করতে পেরেছে প্রবাসী কল্যাণ ব্যাংক।

অথচ একই সময় সমান বা দ্বিগুণ অর্থ বরাদ্দ পেয়ে তার পুরোটাই বিতরণ করতে সক্ষম হয়েছে কর্মসংস্থান ব্যাংক, পল্লী সঞ্চয় ব্যাংক ও পল্লী কর্ম সহায়ক ফাউন্ডেশন (পিকেএসএফ)। প্রথম দফার বরাদ্দ শেষ করতে পারায় প্রতিষ্ঠানগুলোকে এখন দ্বিতীয় দফায়ও বরাদ্দ দেয়া হয়েছে।

অর্থ মন্ত্রণালয় ও প্রবাসী কল্যাণ ব্যাংক থেকে পাওয়া তথ্য বিশ্লেষণে দেখা যায়, গত বছরের আগস্টের শুরুতে ব্যাংকটির অনুকূলে ২৫০ কোটি টাকা ছাড় করে আর্থিক প্রতিষ্ঠান বিভাগ। কিন্তু এ অর্থ থেকে গত ছয় মাসে ব্যাংকটি ঋণ বিতরণ করতে পেরেছে মাত্র ১৬ কোটি ৫৫ লাখ টাকা বা মোট বরাদ্দকৃত অর্থের ৬ দশমিক ৬২ শতাংশ। এর কারণ হিসেবে ব্যাংকটির কর্তৃপক্ষ বলছে, জনবল সংকট ও শাখার সংখ্যা তুলনামূলক কম হওয়ায় কাঙ্ক্ষিত হারে ঋণ বিতরণ করতে পারেনি ব্যাংকটি।

অর্থ মন্ত্রণালয় সূত্রে জানা গেছে, কর্মহীন প্রবাসীদের জন্য ঘোষিত প্রণোদনা প্যাকেজের মধ্যে আরো ১ হাজার কোটি টাকা গত বছরের আগস্টে কর্মসংস্থান ব্যাংক, পল্লী সঞ্চয় ব্যাংক ও  পিকেএসএফ—এ তিন প্রতিষ্ঠানকে দেয়া হয়। এর মধ্যে কর্মসংস্থান ব্যাংক ও পল্লী সঞ্চয় ব্যাংককে ২৫০ কোটি টাকা করে এবং পিকেএসএফকে ৫০০ কোটি টাকা বরাদ্দ দেয়া হয়। এ তিন প্রতিষ্ঠানই গত ডিসেম্বরের মধ্যে প্রথম দফায় বরাদ্দকৃত এ অর্থের পুরোটাই ঋণ হিসেবে বিতরণে সক্ষম হয়েছে। তাই এ প্রতিষ্ঠানগুলোকে দ্বিতীয় দফায়ও বরাদ্দ দেয়া হয়েছে। কিন্তু প্রবাসী কল্যাণ ব্যাংক এখনো ছাড়কৃত অর্থের ১০ শতাংশও ঋণ হিসেবে বিতরণ করতে পারেনি।

এ বিষয়ে জানতে চাইলে প্রবাসী কল্যাণ ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক (অতিরিক্ত দায়িত্ব) মো. এবনুজ জাহান বণিক বার্তাকে বলেন, আমাদের ঋণ দেয়া অধিক্ষেত্র হচ্ছে দেশে এক কোটি জনগণ। অন্যান্য ব্যাংকের কিন্তু পুরো ১৬ কোটি। আমাদের নিয়মিত জনবল হচ্ছে ২৭০ জন। অন্যদিকে কর্মসংস্থান ব্যাংকের আছে ১ হাজার ৪৫০ জনের মতো। আর পল্লী সঞ্চয় ব্যাংকের আছে ৫ হাজার ৮০০ জনের মতো। প্রবাসী কল্যাণ ব্যাংকের শাখা এখন পর্যন্ত ৭১টি। অন্যদিকে কর্মসংস্থান ব্যাংকের শাখা আছে ২৫৫টি। পল্লী সঞ্চয় ব্যাংকের আছে ৪৯০টি। এ অবস্থায় আমরা তো তাদের সমান কাজ করতে পারি না।

তিনি বলেন, প্রবাসী কল্যাণ ব্যাংকের নিজস্ব কোনো সফটওয়্যার নেই। তবে সেটা কেনা হচ্ছে। আশা করছি এক সপ্তাহের মধ্যে ক্রয় আদেশ দিতে পারব। এছাড়া জনবল বাড়ানোর জন্য বাংলাদেশ ব্যাংকের মাধ্যমে ২৮৭ জনের মতো জনবল নিয়োগের উদ্যোগ গ্রহণ করা হয়েছে। জনবল নিয়োগ ও সফটওয়্যার কেনা হলে ২০২১ সাল হবে এ ব্যাংকের যৌবনের বছর।

সম্প্রতি ব্যাংকটির কাছে কাঙ্ক্ষিত মাত্রা ঋণ বিতরণ করতে না পারার কারণ জানতে চায় আর্থিক প্রতিষ্ঠান বিভাগ। এ বিষয়ে ব্যাখ্যা দিয়ে প্রবাসী কল্যাণ ব্যাংক কর্তৃপক্ষ আর্থিক প্রতিষ্ঠান বিভাগে একটি চিঠি দেয়। এতে ব্যাংক কর্তৃপক্ষ জানায়, তাদের অনুকূলে গত বছরের আগস্টের শুরুতে ২৫০ কোটি টাকা ছাড় করে আর্থিক প্রতিষ্ঠান। সংশ্লিষ্ট অন্যান্য কার্যক্রম শেষ করে ১৬ আগস্ট থেকে এ ঋণ কার্যক্রম চালু করা সম্ভব হয়। এ তহবিল থেকে সেপ্টেম্বরে ৯৫ জনকে ১ কোটি ৮০ লাখ টাকা ঋণ দেয়া হয়। এরপর অক্টোবরে ২০৬ জনকে ৪ কোটি ৪১ লাখ টাকা, নভেম্বরে ২৩১ জনকে ৪ কোটি ২৫ লাখ, ডিসেম্বরে ২৬৮ জনকে ৪ কোটি ৮১ লাখ ও জানুয়ারির প্রথম ছয়দিনে ৬৭ জনকে ১ কোটি ২৮ লাখ টাকা ঋণ দেয়া হয়।

চিঠিতে ঋণের প্রবাহ বাড়াতে ঋণ সহজীকরণের উদ্যোগ নেয়া হচ্ছে বলে চিঠিতে উল্লেখ করা হয়। এতে আরো বলা হয়, আগে জামানত ছাড়া ২ লাখ টাকা পর্যন্ত ঋণ বিতরণ করা হতো। গত ১ জানুয়ারি থেকে এ জামানতবিহীন ঋণের সর্বোচ্চ পরিমাণ ৩ লাখ টাকায় উন্নীত করা হয়েছে। সার্বিক কার্যক্রম বৃদ্ধিতে শাখার সংখ্যা বাড়ানোর উদ্যোগ নিয়েছে ব্যাংকটি। বর্তমানে ব্যাংকের শাখার সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ৭১টিতে। চলতি বছরের জুনের মধ্যে এ সংখ্যা ১০০-তে উন্নীত করা হবে।