দেশে ভোজ্যতেল হিসেবে সবচেয়ে বেশি ব্যবহার হয় পাম অয়েল। পণ্যটির চাহিদা পূরণ হয় মূলত ইন্দোনেশিয়া থেকে আমদানির ভিত্তিতে। শুক্রবার এক বিবৃতির মাধ্যমে ইন্দোনেশিয়া থেকে পাম অয়েল রফতানিতে নিষেধাজ্ঞার ঘোষণা দিয়েছেন দেশটির প্রেসিডেন্ট জোকো উইডোডো। চলতি সপ্তাহেই তার এ ঘোষণা কার্যকর হচ্ছে। দেশে ভোজ্যতেলের বাজার সরবরাহ নিয়ে বড় ধরনের উদ্বেগ তৈরি করেছে ইন্দোনেশিয়া থেকে পাম অয়েল আমদানি বন্ধ হয়ে যাওয়ার খবর।

করোনাকালীন সংকটে উৎপাদন হ্রাস ও শ্রমিকের অভাবে টানা দুই বছর ঊর্ধ্বমুখী ছিল বৈশ্বিক ভোজ্যতেলের বাজার। রাশিয়া-ইউক্রেন সংকট পণ্যটির বৈশ্বিক বাজারকে আরো টালমাটাল করে তুলেছে। বৈশ্বিক পাম অয়েলের বাজারে অর্ধেকের বেশি সরবরাহ আসে ইন্দোনেশিয়া থেকে। আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমগুলোর তথ্য অনুযায়ী, বিশ্বব্যাপী ভোজ্যতেলের বাজারমূল্যের ঊর্ধ্বমুখিতার সুবিধা নিতে গিয়ে দীর্ঘদিন ইন্দোনেশিয়ার উৎপাদনকারীরা বিশ্ববাজারে রফতানি বাড়িয়েছেন। স্থানীয় বাজারে সরবরাহ বা মজুদের দিকে তাদের মনোযোগ ছিল কম। দেশটির বাজারেই সরবরাহ কমে গিয়ে ভোজ্যতেলের দাম ক্রমেই বেড়েছে। এ অবস্থায় স্থানীয় বাজার নিয়ন্ত্রণে পণ্যটি রফতানি বন্ধের উদ্যোগ নিয়েছে ইন্দোনেশিয়া সরকার। এ ঘোষণার কথা প্রকাশ হওয়ার সঙ্গে সঙ্গেই ভোজ্যতেলের আন্তর্জাতিক বাজারে পণ্যটির দাম আরো ঊর্ধ্বমুখী হয়ে উঠেছে। প্রতিবেশী ভারতে এরই মধ্যে সব ধরনের ভোজ্যতেলের দাম বেড়ে গিয়েছে। শিকাগো বোর্ড অব ট্রেডে (সিবিওটি) শুক্রবার সাপ্তাহিক লেনদেনের শেষ দিনে পাম অয়েলের বিকল্প সয়াবিন তেলের মূল্য বেড়েছে সাড়ে ৪ শতাংশ।

দেশে মোট ব্যবহূত ভোজ্যতেলের প্রায় ৬৫ শতাংশই পাম অয়েল। পণ্যটির চাহিদার পুরোটাই পূরণ হয় ইন্দোনেশিয়া ও মালয়েশিয়া থেকে আমদানির মাধ্যমে। এর মধ্যে ৮৭ শতাংশ আসে ইন্দোনেশিয়া থেকে। মালয়েশিয়া থেকে আমদানি করা হয় বাকি ১৩ শতাংশ। ভোজ্যতেলের স্থানীয় ও আন্তর্জাতিক বাজার বেশ কিছুদিন ধরেই ব্যাপক ঊর্ধ্বমুখিতার মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। বিশ্বব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, আন্তর্জাতিক বাজারে ২০১৯ সালেও সারা বছর পাম অয়েলের গড় মূল্য ছিল টনপ্রতি ৬০১ ডলার। সেখানে গত মাসে পণ্যটির টনপ্রতি মূল্য উঠেছে ১ হাজার ৭৭৭ ডলারে। একই সময়ে সয়াবিন তেলের মূল্য দাঁড়িয়েছে টনপ্রতি ১ হাজার ৯৫৭ ডলারে। যেখানে ২০১৯ সালেও পণ্যটির বার্ষিক গড় মূল্য ছিল ৭৬৫ ডলার। চলতি মাসেও ভোজ্যতেলের আন্তর্জাতিক বাজারমূল্য বাড়তির দিকে রয়েছে।

ভোজ্যতেলের দাম সহনীয় পর্যায়ে রাখতে গত মাসে এ-জাতীয় আমদানি ও বিপণনে মোট ২০ শতাংশ শুল্ক প্রত্যাহার করে নিয়েছিল সরকার। ওই সময় সরকারিভাবে খোলা সয়াবিনের দাম পাইকারিতে লিটারপ্রতি ১৪০ ও পাম অয়েলের দাম ১৩০ টাকা নির্ধারণ করে দেয়া হয়। বোতলজাত সয়াবিনের দাম ধরা হয় ১৬৮ টাকা। ওই সময়ে পাইকারি পর্যায়ে পাম অয়েলের দাম মণপ্রতি (৩৭ দশমিক ৩২ কেজি) ৫ হাজার ৫০ ও সয়াবিনের পাইকারি দাম ৫ হাজার ৬০০ টাকায় নেমে আসে। কিন্তু সরবরাহ সংকটসহ নানা কারণে ভোজ্যতেলের দাম আবারো বাড়তে থাকে। বর্তমানে পাইকারিতে খোলা পাম অয়েল বিক্রি হচ্ছে মণপ্রতি ৬ হাজার ২০০ থেকে ৬ হাজার ৫০০ টাকায় (মিলগেট থেকে পাইকারি পর্যায়ের বিভিন্ন ধাপে)। এছাড়া সয়াবিন তেল বিক্রি হচ্ছে মণপ্রতি ৭ হাজার থেকে সাড়ে ৭ হাজার টাকার মধ্যে।

এর আগে জানুয়ারিতেও পাম অয়েল রফতানি সীমিত করে আনার ঘোষণা দিয়েছিল ইন্দোনেশিয়া। দেশটির ওই ঘোষণা আমদানিকারক সব দেশেই ভোজ্যতেলের বাজার অস্থিতিশীল করে তোলে। এরপর গত মাসে তা আবার প্রত্যাহার করে নেয়া হয়। দেশটির রফতানি বন্ধের সর্বশেষ ঘোষণার পর আগে ক্রয়কৃত পাম অয়েল ছাড় করানো নিয়ে আশঙ্কায় রয়েছেন বাংলাদেশী আমদানিকারকরা।

দেশের অন্যতম ভোজ্যতেল আমদানি, পরিশোধন ও বিপণনকারী প্রতিষ্ঠান সিটি গ্রুপের পরিচালক (করপোরেট অ্যান্ড রেগুলেটরি অ্যাফেয়ার্স) বিশ্বজিৎ সাহা বিষয়টি নিয়ে বণিক বার্তাকে বলেন, আশপাশের সব দেশই এককভাবে ইন্দোনেশিয়ার পাম অয়েলের ওপর নির্ভরশীল। ইন্দোনেশিয়া রফতানি বন্ধ করায় আমাদের এখন স্থানীয় মজুদ ও জাহাজে থাকা পণ্যের ওপর নির্ভর করতে হবে। বর্তমানে বিকল্প উৎসের কোনো সুযোগ না থাকায় সয়াবিনের ওপর নির্ভরশীলতা বাড়াতে হবে। দেশের সব আমদানিকারকের কাছেই পাম অয়েল আমদানিতে কম-বেশি এলসি খোলা রয়েছে। সেগুলো যদি ইন্দোনেশিয়ার কর্তৃপক্ষ ছাড় না করে, তবে দ্রুত বিকল্প চিন্তা করা ছাড়া উপায় নেই।

পাম অয়েলের মতো সয়াবিন তেলের চাহিদা পূরণে আমদানির ওপর নির্ভরশীল বাংলাদেশ। দেশে কিছু সয়াবিন উৎপাদন হলেও তা একেবারেই যৎসামান্য। তেল উৎপাদনের জন্য প্রয়োজনীয় সয়াবিনের সিংহভাগই আসে আমদানির মাধ্যমে। দেশে সয়াবিনের মোট আমদানির ৭৬ শতাংশ আসে লাতিন আমেরিকার দেশ আর্জেন্টিনা থেকে। বাদবাকি সয়াবিন আসে প্যারাগুয়ে (১৩ শতাংশ), ব্রাজিল (৯ শতাংশ) ও অন্যান্য (২ শতাংশ) দেশ থেকে। সরবরাহের জন্য মাত্র দুটি দেশের ওপর নির্ভরতা দেশে ভোজ্যতেলের বাজার ঊর্ধ্বমুখিতার জন্য দায়ী বলে মনে করছেন সরকার ও খাতসংশ্লিষ্টরা। এছাড়া শুল্ক কাঠামোও এক্ষেত্রে বড় নেতিবাচক ভূমিকা রাখছে বলে দাবি কোনো কোনো ব্যবসায়ীর।

নাম অপ্রকাশিত রাখার শর্তে এক ভোজ্যতেল আমদানিকারক বলেন, ভারতের মতো দেশে ভোজ্যতেলের শুল্ক ৪৫ শতাংশ থেকে কমিয়ে সাড়ে ৪ শতাংশে নামিয়ে আনা হয়েছে। তাতেও ভারতে লিটারপ্রতি ২০০ রুপির বেশি দামে ভোজ্যতেল বিক্রি হচ্ছে। বাংলাদেশেও ভোজ্যতেলের শুল্ক কাঠামোয় ব্যাপক ছাড় দেয়া উচিত।

তবে সাময়িক এ নিষেধাজ্ঞাও দ্রুত তুলে নেয়া হবে বলে আশাবাদী আমদানিকারকরা। তারা বলছেন, আবারো হয়তো দ্রুতই ইন্দোনেশিয়া পাম অয়েল রফতানি উন্মুক্ত করে দিতে পারে। সেক্ষেত্রে আপত্কালে দেশের ভোজ্যতেলের বাজার নিয়ন্ত্রণে আমদানিকারক বা ব্যবসায়ীদের কিছুই করার থাকছে না। তবে সরকারি হস্তক্ষেপের পাশাপাশি বাজার নিয়ন্ত্রণে রাখতে কার্যকর পন্থা নির্ধারণ করা গেলে এ বিপত্তিও অনেকটাই কাটানো যাবে।

ব্যবসায়ীরা বলছেন, দেশে ভোজ্যতেলের বার্ষিক গড় ব্যবহার প্রবৃদ্ধি ৪ শতাংশ। বর্তমানে দেশে প্রতি বছর প্রায় ২৫ লাখ টন ভোজ্যতেল ব্যবহার হয়। ব্যবহার বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে আগামীতে এসব পণ্যের আমদানিনির্ভরতাও বাড়বে। এখন থেকেই বিকল্প উৎসের সন্ধান বা স্বয়ংসম্পূর্ণতার বিষয়টি বিবেচনায় না নিলে সংকটের দীর্ঘস্থায়ী সমাধান হবে না। এজন্য পরিকল্পিত উপায়ে দেশীয় উৎপাদনের মহাপরিকল্পনা হাতে নেয়া উচিত।

দেশের আরেক শীর্ষস্থানীয় ভোজ্যতেল আমদানিকারক প্রতিষ্ঠান টিকে গ্রুপের পরিচালক মো. শফিউল আতহার তাসলিম (ফাইন্যান্স অ্যান্ড অপারেশন) বণিক বার্তাকে বলেন, ভোজ্যতেলের বাজারদর নির্ধারণে সরকার কঠোর। ফলে প্রধান আমদানিকারক দেশের রফতানি বন্ধের ঘোষণায় সরকারকেই পদক্ষেপ নিতে হবে কীভাবে দাম বাড়লেও সেটি ভোক্তাদের জন্য সহনীয় হয়। এক্ষেত্রে সংকটকালে প্রতিবেশী দেশ ভারতের ভোজ্যতেল আমদানি শুল্ক পর্যালোচনা করে বাংলাদেশেও সেটি প্রয়োগ করা উচিত।

এনবিআরের তথ্য বলছে, দেশে জানুয়ারি থেকে মার্চ পর্যন্ত ১০ লাখ ২২ হাজার টন ভোজ্যতেল আমদানি হয়েছে বিভিন্ন দেশ থেকে। এর মধ্যে ৬ লাখ ৬১ হাজার টন পাম অয়েল ও ৩ লাখ ৬১ হাজার টন সয়াবিন। দেশে ভোজ্যতেলের মাসিক চাহিদা দেড় থেকে পৌনে দুই লাখ টন। মাসভিত্তিক গড় ব্যবহার বিবেচনায় নিয়ে মার্চ পর্যন্ত পাঁচ থেকে সাড়ে পাঁচ লাখ টন ভোজ্যতেল ব্যবহার হওয়ার কথা। তবে রোজার কারণে চলতি মাসে আরো দুই লাখ টন ভোজ্যতেল ব্যবহার হতে পারে। এ মুহূর্তে সারা দেশের মিল, পাইকারি বাজার, ডিলার, খুচরা ও পাইকারি ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান, ভোক্তার মজুদ মিলিয়ে পাঁচ লাখ টনের বেশি ভোজ্যতেল রয়েছে। এ মুহূর্তে কোনো পাম অয়েল আমদানি না হলেও এখনকার মজুদ দিয়েই অন্তত এক মাসের চাহিদা পূরণ সম্ভব।

বাংলাদেশ পাইকারি ভোজ্যতেল ব্যবসায়ী সমিতির সভাপতি মো. গোলাম মাওলা বণিক বার্তাকে বলেন, বর্তমান সময়ে সবচেয়ে বড় সংকটে রয়েছেন পাইকারি ব্যবসায়ীরা। আমদানিকারক কিংবা ট্রেডিং ব্যবসায়ী পর্যায়ে সরকার নির্ধারিত দামে পণ্য বিক্রির কথা বলা হচ্ছে। কিন্তু সরকার নির্ধারিত দামে লোকসান দিয়ে একজন আমদানিকারক কেন পণ্য বিক্রি করবেন? ফলে সরবরাহ আগের তুলনায় অনেক কমে গিয়েছে। আবার মিলগেট থেকে পণ্য সংগ্রহের পর বিক্রি করতে গেলেই সংকটের কারণে দাম বেড়ে যাচ্ছে। অথচ প্রশাসন, বাজার মনিটরিং কমিটি আসলে জরিমানা করছে সাধারণ পাইকারি ব্যবসায়ীদের। এসব সংকটের সুষ্ঠু সমাধান ছাড়া দেশের ভোজ্যতেলের বাজার অস্থিরতা প্রতিরোধ করা সম্ভব নয়।