বিনিয়োগের
ক্ষেত্রে শেয়ারপ্রতি আয়কে (ইপিএস)
রিটার্ন হিসেবে বিবেচনা
করলেও আর্নিং ইল্ড বা ডিভিডেন্ড ইল্ড হিসাব করতে কখনো ভোলেন না ওয়ারেন বাফেট। কারণ
ডিভিডেন্ড ইল্ডের মাধ্যমে বিনিয়োগের বিপরীতে প্রকৃত রিটার্নের পরিমাণ বোঝা যায় এবং
খুব সহজে অন্য বিনিয়োগের রিটার্নকে এর সঙ্গে তুলনা করা যায়। বাফেট কোম্পানির
আর্নিং ইল্ডকে দীর্ঘমেয়াদি সরকারি বন্ডের সঙ্গে তুলনা করতে পছন্দ করেন। কোনো
কোম্পানির আর্নিং ইল্ড সরকারি বন্ড ইল্ডের যত কাছাকাছি, সেটিকে ততই আকর্ষণীয় মনে করেন তিনি।
ওয়ারেন বাফেটের
দর্শন বিবেচনায় নিলে বলতে হয়,
বাংলাদেশে বিনিয়োগের
ক্ষেত্রে শেয়ারবাজারের তুলনায় ট্রেজারি বিল ও বন্ডের প্রতি আকর্ষণ এখন অনেক বেশি।
কারণ এখানে শেয়ারবাজারে সার্বিক ডিভিডেন্ড ইল্ড ও রিটার্ন হার এখনো ট্রেজারি বিল ও
বন্ড ইল্ডের তুলনায় বেশ কম। গত বছরের
ডিসেম্বর শেষে সরকারের বিভিন্ন মেয়াদি ট্রেজারি বিলের ইল্ডের ন্যূনতম হার ছিল ৭ শতাংশের
বেশি। বন্ডের ক্ষেত্রে এ হার আরো বেশি,
৮ শতাংশ। অথচ একই সময়ে
ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জের (ডিএসই)
সার্বিক ডিভিডেন্ড ইল্ড
ছিল মাত্র ৩ দশমিক ৯ শতাংশ। অর্থাৎ
ট্রেজারি বিল ও বন্ডে বিনিয়োগের ক্ষেত্রে প্রাপ্তি ছিল শেয়ারবাজারের তুলনায়
দ্বিগুণ।
ট্রেজারি বিল ও
বন্ড হচ্ছে সরকারের ইস্যুকৃত এক ধরনের ঋণপত্র বা সিকিউরিটিজ, যা স্বল্প ও দীর্ঘমেয়াদি হতে পারে। বিনিয়োগকারীরা ট্রেজারি
বিল ও বন্ডে বিনিয়োগের বিপরীতে নির্দিষ্ট হারে সুদ পান। এক্ষেত্রে গড় রিটার্ন
পরিমাপ করা যায় ইল্ডের মাধ্যমে। বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, গত বছরের ডিসেম্বর শেষে ৯১ দিন মেয়াদি ট্রেজারি বিলের
ক্ষেত্রে ইল্ডের হার ছিল ৭ দশমিক শূন্য ১ শতাংশ। আর ২০ বছর মেয়াদি ট্রেজারি বন্ডের
ক্ষেত্রে ইল্ডের হার ছিল ৯ দশমিক ৪০ শতাংশ। অন্যদিকে দুই বছর মেয়াদি সরকারি
ট্রেজারি বন্ডের ইল্ড ছিল ৮ দশমিক ১৬ শতাংশ। এ হার পাঁচ বছর মেয়াদি বন্ডের
ক্ষেত্রে ৮ দশমিক ৯৩, ১০ বছর মেয়াদি বন্ডের ক্ষেত্রে ৯ দশমিক ২, ১৫ বছর মেয়াদি
বন্ডের ক্ষেত্রে ৯ দশমিক ৩ ও ২০ বছর মেয়াদি বন্ডের ক্ষেত্রে ছিল ৯ দশমিক ৪০ শতাংশ।
অন্যদিকে
ট্রেজারি বিল ও বন্ডের তুলনায় অনেক পিছিয়ে ছিল শেয়ারবাজারের সার্বিক ও খাতভিত্তিক
ডিভিডেন্ড ইল্ড। ডিএসইর তথ্য অনুযায়ী,
গত বছরের ডিসেম্বর শেষে
শেয়ারবাজারে টেলিযোগাযোগ এবং জ্বালানি ও বিদ্যুৎ ছাড়া আর কোনো খাতেরই ডিভিডেন্ড
ইল্ড ৬ শতাংশের বেশি ছিল না। ওই সময় টেলিযোগাযোগ খাতের ইল্ড ছিল ৯ দশমিক ৪ এবং
জ্বালানি ও বিদ্যুৎ খাতের ৬ দশমিক ১ শতাংশ।
অন্য খাতগুলোর প্রতিটিরই ডিভিডেন্ড ইল্ড ১ থেকে সাড়ে ৩ শতাংশের মধ্যে সীমাবদ্ধ ছিল। টেলিযোগাযোগ খাতের গ্রামীণফোন এবং জ্বালানি ও বিদ্যুৎ খাতের কোম্পানিগুলোর লভ্যাংশ দেয়ার হার বেশি হওয়ার কারণেই এ দুই খাতের ডিভিডেন্ড ইল্ড অন্যান্য খাতের তুলনায় অনেক বেশি ছিল ওই সময়।
প্রসঙ্গত, শেয়ারপ্রতি আয়কে শেয়ারের মূল্য দিয়ে ভাগ করলে ডিভিডেন্ড
ইল্ড পাওয়া যায়। শেয়ারবাজারে তালিকাভুক্ত কোম্পানিগুলোর খাতভিত্তিক লভ্যাংশ আয়ের
মাধ্যমে প্রকৃত আয় নিরূপণ করা যায় না। কেননা শেয়ারের বাজারমূল্য ইস্যু মূল্যের
চেয়ে কম বা বেশি হতে পারে। এ কারণে বিনিয়োগের বিপরীতে সঠিক আয়ের হার বোঝার জন্য
ডিভিডেন্ড ইল্ডই ভালো নির্দেশক। শেয়ারের দাম কমে গেলে ডিভিডেন্ড ইল্ডের হার বেড়ে
যায়. অন্যদিকে শেয়ারের দাম বাড়লে ডিভিডেন্ড ইল্ড কমে।
শুধু ডিভিডেন্ড
ইল্ড নয়, রিটার্নের দিক থেকেও বেশ খারাপ অবস্থানে আছে
দেশের শেয়ারবাজার। ডিএসইর তথ্য বলছে,
গত এক বছরে একমাত্র সাধারণ
বীমা খাতে প্রায় ৩২ শতাংশ রিটার্ন এসেছে। এর বাইরে বাকি ১৮ খাতে বিনিয়োগের বিপরীতে
রিটার্নের হার ঋণাত্মক। এমনকি সার্বিকভাবে গত বছর শেয়ারবাজারের রিটার্নও ছিল
ঋণাত্মক ১৭ দশমিক ৩ শতাংশ। অথচ কোনো ধরনের ঝুঁকি ছাড়াই সরকারের বিভিন্ন ধরনের
ট্রেজারি বিল ও বন্ডে বিনিয়োগ করে ৯ শতাংশের বেশি রিটার্ন পেয়ে আসছেন
বিনিয়োগকারীরা।
তত্ত্বাবধায়ক
সরকারের সাবেক অর্থ উপদেষ্টা ও বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশনের (বিএসইসি)
সাবেক চেয়ারম্যান ড. এবি মির্জ্জা আজিজুল ইসলাম এ প্রসঙ্গে বণিক বার্তাকে বলেন, পুঁজিবাজারের ডিভিডেন্ড ইল্ড কম। তবে প্রাইস আর্নিংস রেশিও (পিই রেশিও)
কেমন রয়েছে সেটিও দেখতে
হবে। পিই রেশিও কম থাকা মানে হচ্ছে বর্তমানে বিনিয়োগ করলে ভবিষ্যতে ডিভিডেন্ড
ছাড়াও আকর্ষণীয় হারে মূলধনি মুনাফা আসবে। বর্তমানে অনেক ভালো ও মৌলভিত্তির
কোম্পানির শেয়ারের দাম যথেষ্ট কম। ফলে এসব কোম্পানিতে বিনিয়োগ করলে ভালো রিটার্ন
পাওয়া সম্ভব। অন্যদিকে ট্রেজারি বিল ও বন্ডে সাধারণ বিনিয়োগকারীদের অংশগ্রহণ নেই।
এখানে মূলত প্রাতিষ্ঠানিক বিনিয়োগকারীরাই বিনিয়োগ করে। ট্রেজারি বিল ও বন্ডের ইল্ড
পুঁজিবাজারের তুলনায় বেশি হওয়ার কারণে বেশি রিটার্নের আশায় তারা এখানে বিনিয়োগ
করতেই পারে। তবে প্রাতিষ্ঠানিক বিনিয়োগকারীদের এমনভাবে বিনিয়োগ করা উচিত, যাতে পুঁজিবাজারের
স্থিতিশীলতা বজায় থাকে ।
সংশ্লিষ্টরা
বলছেন, প্রাতিষ্ঠানিক বিনিয়োগকারীদের পরিচালন খাতে ভালো
অংকের অর্থ ব্যয় করতে হয়। ফলে বিনিয়োগের বিপরীতের উল্লেখযোগ্য হারে রিটার্ন না এলে
প্রতিষ্ঠানগুলোর পরিচালন লোকসানে পড়ার আশঙ্কা থাকে। শেয়ারবাজারে বিনিয়োগে ঝুঁঁকির
পরিমাণ বেশি থাকে বলে এখান থেকে বেশি রিটার্ন প্রত্যাশা করাটাই স্বাভাবিক। যদিও
বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে শেয়ারবাজারে বিনিয়োগের ক্ষেত্রে ঝুঁকির তুলনায় রিটার্ন
অনেক কম। এ কারণে অনেক প্রাতিষ্ঠানিক বিনিয়োগকারী অস্থিতিশীল শেয়ারবাজারে
বিনিয়োগের চেয়ে বন্ডের মতো নিরাপদ বিনিয়োগে স্বাচ্ছন্দ্য বোধ করেন।
বাংলাদেশ
মার্চেন্ট ব্যাংকার্স অ্যাসোসিয়েশনের
(বিএমবিএ) প্রেসিডেন্ট এবং একই সঙ্গে ইস্টার্ন ব্যাংক লিমিটেডের
সাবসিডিয়ারি ইবিএল ইনভেস্টমেন্টের পরিচালক ও ইবিএল সিকিউরিটিজের ব্যবস্থাপনা
পরিচালকের দায়িত্বে থাকা মো.
ছায়েদুর রহমান বণিক
বার্তাকে বলেন, শেয়ারবাজারের চেয়ে ট্রেজারি বিল ও বন্ডের রিটার্ন
বেশি হওয়ার কারণে প্রাতিষ্ঠানিক বিনিয়োগকারীদের পুঁজিবাজারবিমুখ হওয়ার বিষয়টি
আংশিক সত্য। ব্যাংকের ট্রেজারি বিভাগ সরকারের বিভিন্ন ধরনের ট্রেজারি বিল ও বন্ডে
বিনিয়োগ করে। তাছাড়া সংবিধিবদ্ধ সঞ্চিতি,
রেপো ও নিরাপদ বিনিয়োগ
হিসেবে ব্যাংকগুলোকে ট্রেজারি বিল ও বন্ডে বিনিয়োগ করতেই হয়। অন্যদিকে ব্যাংকগুলোর
শেয়ারবাজারকেন্দ্রিক যেসব সাবডিয়ারি প্রতিষ্ঠান রয়েছে, সেগুলো কিন্তু ট্রেজারি বিল ও বন্ডে বিনিয়োগ করছে না। তবে
এটা ঠিক, গত দুই বছরে শেয়ারবাজারে বিনিয়োগ করে তেমন কোনো
রিটার্ন আসেনি।
দেশের
শেয়ারবাজারের অন্যতম প্রাতিষ্ঠানিক বিনিয়োগকারী হচ্ছে ব্যাংক। ব্যাংকগুলো তাদের সাবসিডিয়ারির পাশাপাশি
নিজেরাও শেয়ারবাজারে বিনিয়োগ করে। ২০০৯-১০ সালে দেশের শেয়ারবাজারে যে বাবল তৈরি
হয়েছিল, এর অন্যতম কারণ ছিল ব্যাংকের বিপুল পরিমাণ অলস
অর্থ শেয়ারবাজারে বিনিয়োগ। কিন্তু বর্তমানে মন্দার কারণে ব্যাংকগুলো আর সেভাবে শেয়ারবাজারে
বিনিয়োগ করছে না। অনেক ব্যাংকেরই শেয়ারবাজারে বিনিয়োগ নির্ধারিত সীমার নিচে থাকলেও
তারা সেটি আর বাড়াতে আগ্রহী নয়।
তবে তারল্য সংকট
কিংবা বিনিয়োগ নয়, বরং আস্থা ও সুশাসনের ঘাটতিকেই পুঁজিবাজারের বড়
সমস্যা বলে মনে করেন অ্যাসোসিয়েশন অব ব্যাংকার্স বাংলাদেশের (এবিবি)
সাবেক চেয়ারম্যান ও
মিউচুয়াল ট্রাস্ট ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক সৈয়দ মাহবুবুর রহমান। বণিক
বার্তাকে তিনি বলেন, আস্থার সংকট ও সুশাসনের অভাবের কারণেই বাংলাদেশের
পুঁজিবাজার দাঁড়াতে পারছে না। এ বাজারে বিদেশী কিংবা দেশী প্রাতিষ্ঠানিক
বিনিয়োগকারীরা চাইলেই শেয়ার বিক্রি করতে পারে না। বরং শেয়ার বিক্রির ক্ষেত্রে
নিয়ন্ত্রক সংস্থা থেকে হস্তক্ষেপ করা হয়। নিয়ন্ত্রকদের কাজ শেয়ারের মূল্য নির্ধারণ
করে দেয়া নয়। কিন্তু আমাদের নিয়ন্ত্রক সংস্থা বাজারের পতনের সময় ফোন করে ব্রোকারেজ
হাউজগুলোকে শেয়ার বিক্রি না করার নির্দেশনা দেয়। ফলে দেশী ও বিদেশী প্রাতিষ্ঠানিক
বিনিয়োগকারীরা শেয়ারবাজারে বিনিয়োগে নিরুৎসাহিত হয়ে অপেক্ষাকৃত নিরাপদ খাতে
বিনিয়োগ করছে।










