যাদের হাত ধরে দেশে তৈরি পোশাক খাতের যাত্রা হয়েছিল তাদের অন্যতম মেজর (অব.) আবদুল মান্নান। বস্ত্র, ওষুধ, এভিয়েশন, ফিশিং, শিপিং, আর্থিক প্রতিষ্ঠান, বীমা, কোমল পানীয়, সিএনজি, রিয়েল এস্টেট ও টেলিযোগাযোগ খাতে ব্যবসা সম্প্রসারণ করেছিলেন তিনি। এমনকি দেশের বাইরে কম্বোডিয়া ও যুক্তরাষ্ট্রে ব্যবসায়িক কার্যালয় খোলেন। মেজর (অব.) আবদুল মান্নানের প্রতিষ্ঠিত সানম্যান গ্রুপ অব কোম্পানিজের আওতায় ৪৮টি প্রতিষ্ঠান রয়েছে। একসময় দেশের শীর্ষস্থানীয় শিল্পগোষ্ঠী হিসেবে পরিচিতি ছিল এটির। অথচ সানম্যান গ্রুপের বেশির ভাগ ব্যবসা প্রতিষ্ঠানই এখন দুরবস্থায় রয়েছে। দেশের শীর্ষস্থানীয় ঋণখেলাপি প্রতিষ্ঠানের তালিকায় রয়েছে মেজর (অব.) আবদুল মান্নানের গড়ে তোলা বাংলালায়ন কমিউনিকেশন, বাংলাদেশ ইন্ডাস্ট্রিয়াল ফাইন্যান্স কোম্পানি (বিআইএফসি) ও গোল্ডেন হরাইজন লিমিটেড।
স্বাধীনতা-পরবর্তী সময়ে সামরিক বাহিনীর চাকরি শেষে ব্যবসা শুরু করেছিলেন মেজর (অব.) আবদুল মান্নান। সফলও হয়েছিলেন তিনি। নিজ জন্মস্থান নোয়াখালীতে বেশকিছু শিল্পপ্রতিষ্ঠান স্থাপনের মাধ্যমে অনেকেরই কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা করেছিলেন। লক্ষ্মীপুর-৪ আসনের বর্তমান এ সংসদ সদস্যের নিজ হাতে গড়ে তোলা ব্যবসা জীবদ্দশাতেই বেহাল অবস্থায় পড়েছে।
পোশাক খাতে ১০টিরও বেশি কারখানা ইউনিট আছে সানম্যান গ্রুপের। প্রতিষ্ঠান-সংশ্লিষ্টদের দাবি, দেশে পোশাক শিল্পের বিকাশের শুরুর দিকে যারা ব্যবসা শুরু করেছে, তাদের মধ্যে অন্যতম ব্যবসায়িক গ্রুপ হলো সানম্যান। এ গ্রুপের পোশাক কারখানাগুলোয় অ্যাসেম্বলি লাইন ছিল ২০০-এর বেশি। নিট ও ওভেন পণ্য উৎপাদনে সানম্যান গ্রুপের সামর্থ্য প্রতি মাসে ৪০ লাখ পিসের বেশি। এ গ্রুপের উল্লেখযোগ্য পোশাক কারখানাগুলোর মধ্যে রয়েছে আলফা টেক্সটাইল লিমিটেড, ডেল্টা ফ্যাশনস লিমিটেড, ড্রেসকো লিমিটেড, গোল্ডেন হাইটস লিমিটেড, গোল্ডেন হরাইজন লিমিটেড, ইসহাকপুর সোয়েটার ইন্ডাস্ট্রিজ লিমিটেড, পেনিনসুলা গার্মেন্টস লিমিটেড, ইউনাইটেড ড্রেসেস ও পাইওনিয়ার ড্রেসেস লিমিটেড।
টানা এক যুগের সোয়েটার উৎপাদনের ব্যবসা বন্ধ করে এখন মুরগির হ্যাচারি দিয়ে ঘুরে দাঁড়ানোর চেষ্টা করছে সানম্যান গ্রুপের অঙ্গপ্রতিষ্ঠান নোয়াখালী ইসহাকপুর সোয়েটার ইন্ডাস্ট্রিজ লিমিটেড। বিশ্ববাজারে মন্দার কারণে ২০১৬ সাল থেকে পর্যায়ক্রমে এসব প্রতিষ্ঠান বন্ধ করে দেয়া হয়। প্রতিষ্ঠানের কর্মীদের দাবি, জেলা সদরের মান্নান নগর এলাকার প্রধান কারখানাটিতে এখনো ১০টি অটো মেশিনে উৎপাদন চালু রয়েছে।
খোঁজ নিয়ে জানা যায়, সদর উপজেলার মান্নান নগরে ২০০৩ সালের দিকে কার্যক্রম শুরু করে ইসহাকপুর সোয়েটার ইন্ডাস্ট্রিজ লিমিটেড। ২০০৭ সালে লক্ষ্মীপুর জেলার রামগতিতে ইসহাকপুর সোয়েটার ইন্ডাস্ট্রিজ লিমিটেডের অধীন ইউনিট-১ নাম দিয়ে দ্বিতীয় সোয়েটার ফ্যাক্টরি স্থাপন করেন মেজর (অব.) আবদুল মান্নান। ২০০৯ সালে সুবর্ণচর উপজেলায় চালু হয় ইসহাকপুর সোয়েটার ইন্ডাস্ট্রিজ লিমিটেডের ইউনিট-২। এ তিন কারখানায় কর্মকর্তা-কর্মচারী মিলিয়ে প্রায় দুই হাজার লোকবল ছিল। বর্তমানে তিনটি কারখানাই বন্ধ।
প্রতিষ্ঠানগুলোর একাধিক কর্মকর্তার সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, কারখানা তিনটিতে বছরে ৩০ কোটি টাকার বেশি সোয়েটার উৎপাদন হতো। প্রতিষ্ঠান তিনটিতে ভূমি, ভবন, মেশিনপত্র মিলিয়ে প্রায় শতকোটি টাকা বিনিয়োগ করা হয়েছিল। তবে ২০১৬ সালের দিকে শ্রমিক অসন্তোষ, ক্রয়াদেশের সংকট, রাজনৈতিক অস্থিতিশীলতা, বিশ্ববাজারে চাহিদার মন্দায় কোম্পানি লোকসান গুনতে শুরু করে। ফলে এসব কারখানা বন্ধ করে দিতে বাধ্য হয় কোম্পানি।
তবে কারখানাগুলোয় দীর্ঘদিন কাজ করা একাধিক শ্রমিক নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, কোম্পানির অভ্যন্তরীণ সমস্যার কারণে এসব প্রতিষ্ঠান বন্ধ হয়ে গেছে। বৈশ্বিক বাজারে ধস কিংবা শ্রমিক অসন্তোষ প্রধান কারণ নয়। যদি শ্রমিক কিংবা বাজারের ধস হতো তাহলে টানা এক যুগেরও বেশি সময় ধরে প্রতিষ্ঠান চলত না বা একের পর এক নতুন প্রতিষ্ঠান গড়ে উঠত না। ২০১৬ সালের দিকে হঠাৎ করে বেতন-ভাতা বন্ধ করে দেয়া হয় শ্রমিকদের। তাও ছয় মাসের বেশি সময় ধরে শ্রমিকরা কোনো আন্দোলনে যাননি। কিন্তু বারবার বেতন দিতে সময়ক্ষেপণ করার কারণে বাধ্য হয়ে তখন শ্রমিকরা আন্দোলনে যান। পরবর্তী সময়ে স্থানীয় প্রশাসন ও রাজনৈতিক নেতাদের হস্তক্ষেপে বেতন-ভাতা দেয়ার শর্তে শ্রমিকরা তখন আন্দোলন থেকে সরে দাঁড়ান। কিন্তু সময় নিয়েও শ্রমিকদের বেতন দিতে গড়িমসি করে কর্তৃপক্ষ। তার পরই মূলত শ্রমিক অসন্তোষ চরম আকার ধারণ করে। এক পর্যায়ে কর্তৃপক্ষ শ্রমিকদের জানায়, কারখানা লোকসানে থাকার কারণে বন্ধ করে দেয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছে কর্তৃপক্ষ।
সানম্যান গ্রুপের এ তিন কারখানার সর্বশেষ অবস্থা নিয়ে কথা হয় সহকারী ব্যবস্থাপক (উন্নয়ন) মো. আলাউদ্দিন ভূঁঞার সঙ্গে। তিনি বণিক বার্তাকে বলেন, ক্রয়াদেশ সংকট ও বিশ্ববাজারে মন্দার কারণে মূলত কোম্পানি এ তিনটি প্রতিষ্ঠান বন্ধ করে দেয়া হয়। এগুলোতে শতকোটি টাকার বেশি লোকসান দিয়েছে কোম্পানি। তার পরও নানাভাবে এ তিনটি প্রতিষ্ঠানকে বাঁচিয়ে রাখার চেষ্টা করা হয়েছিল। কিন্তু বারবার লোকসান গুনতে গিয়ে অবশেষে বন্ধ হয়ে যায়। তবে এখনো মান্নান নগর এলাকার কারখানাটিতে উৎপাদন অব্যাহত রয়েছে।
এ কর্মকর্তা বলেন, তিন প্রতিষ্ঠানে সোয়েটার উৎপাদন বন্ধ করা হলেও অন্যভাবে ঘুরে দাঁড়ানোর চেষ্টা করা হচ্ছে। এরই মধ্যে মুরগির ডিম ও বাচ্চা উৎপাদন করার বিষয়ে আলোচনা শুরু হয়েছে। বন্ধ হওয়া প্রতিষ্ঠানগুলোকে হ্যাচারিতে রূপান্তর করার প্রক্রিয়া চলমান।
প্রযুক্তির পরিবর্তনের কারণে এরই মধ্যে সেবা বন্ধ হয়েছে মেজর (অব.) আবদুল মান্নানের গড়ে তোলা ওয়াইম্যাক্স প্রতিষ্ঠান বাংলালায়ন কমিউনিকেশন লিমিটেড। সেলফোন অপারেটরদের থ্রিজি ও ফোরজি সেবা চালুর পাশাপাশি ওয়াইম্যাক্সের প্রযুক্তিগত উন্নয়ন না হওয়ায় বিপাকে পড়ে বাংলালায়ন। এরপর লং টার্ম ইভোল্যুশনের (এলটিই) অনুমোদন দেয়া হলেও তা কাজে লাগাতে পারেনি প্রতিষ্ঠানটি। এরই মধ্যে বিআইএফসি ও সানলাইফ ইন্স্যুরেন্স থেকে বাংলালায়নে বিনিয়োগ ঝুঁকিতে পড়েছে।
সাভারে ন্যাশনাল বেভারেজ অ্যান্ড সানম্যান ফুডের কারখানায় সানক্রেস্ট ব্র্যান্ডের কোমল পানীয় উৎপাদনের ব্যবসা শুরু করেছিলেন মেজর (অব.) আবদুল মান্নান। যদিও শেষ পর্যন্ত তার এ ব্যবসাও মুখ থুবড়ে পড়েছে। বহুজাতিক কোমল পানীয় উৎপাদকদের সঙ্গে পাল্লা দিয়ে যেখানে আকিজ ও পারটেক্স গ্রুপ ব্যবসা করে যাচ্ছে, সেখানে বাজার থেকে হারিয়ে গেছে সানক্রেস্ট।
চট্টগ্রামের বায়েজিদ বোস্তামি রোডে সানম্যান গ্রুপের পোশাক কারখানা গোল্ডেন হরাইজন লিমিটেড। প্রায়ই কারখানা বন্ধ ও শ্রমিক অসন্তোষের ঘটনায় আলোচনায় থাকে প্রতিষ্ঠানটি। বর্তমানে সাব-কন্ট্রাক্টে কারখানাটির কার্যক্রম চলছে।
সানম্যান গ্রুপের ব্যবস্থাপক মাহমুদ হোসেনের কাছে গ্রুপটির সার্বিক ব্যবসায়িক দুরবস্থার বিষয়ে জানতে চাইলে তিনি বণিক বার্তাকে বলেন, গ্রুপের দুরবস্থার কারণ জানার চেষ্টা করছি আমরা। এ বিষয়ে বিস্তারিত জানতে মেজর (অব.) আবদুল মান্নানের সঙ্গে কথা বলার পরামর্শ দেন তিনি।
সার্বিক বিষয়ে মেজর (অব.) আবদুল মান্নানের বক্তব্য জানতে বণিক বার্তার পক্ষ থেকে একাধিকবার তার ব্যক্তিগত সহকারী জাহাঙ্গীর আলম চৌধুরীর সঙ্গে যোগাযোগ করা হয়। তিনি জানান, মেজর (অব.) আবদুল মান্নান এ প্রতিবেদকের সঙ্গে কথা বলবেন। যদিও পরবর্তী সময়ে মেজর (অব.) আবদুল মান্নানের বক্তব্য পাওয়া যায়নি।
মেজর (অব.) আবদুল মান্নান সবচেয়ে বেশি আলোচনায় এসেছেন ব্যাংক-বহির্ভূত আর্থিক প্রতিষ্ঠান বিআইএফসির আর্থিক কেলেঙ্কারির সঙ্গে সংশ্লিষ্টতার কারণে। ২০১৫ সালে বিআইএফসির ঋণ প্রদানে অনিয়ম ও জালিয়াতির বিষয়টি বাংলাদেশ ব্যাংকের তদন্তেই উঠে আসে। বাংলাদেশ ব্যাংকের বিশেষ পরিদর্শন প্রতিবেদন অনুসারে, বিআইএফসি থেকে অনিয়ম ও জালজালিয়াতির মাধ্যমে সানম্যান গ্রুপের অনুকূলে ৫১৮ কোটি টাকার ঋণ দেয়ার প্রমাণ পাওয়া যায়। কেন্দ্রীয় ব্যাংকের তদন্তে আরো উঠে আসে, এসব ঋণের সুবিধাভোগী সানম্যান গ্রুপের চেয়ারম্যান ও বিআইএফসির সাবেক চেয়ারম্যান মেজর (অব.) আবদুল মান্নান।
পুঁজিবাজারে তালিকাভুক্ত বিআইএফসি ২০১৭ সালের পর থেকে আর আর্থিক প্রতিবেদন প্রকাশ করছে না। ২০১৭ সালের আর্থিক প্রতিবেদনে প্রতিষ্ঠানটির ভয়াবহ আর্থিক বিপর্যয়ের বিষয়টি উল্লেখ করে নিরীক্ষক তার মতামতে উল্লেখ করেছেন, বিআইএফসি ধীরে ধীরে দেউলিয়া হওয়ার পথে এগোচ্ছে। আলোচ্য হিসাব বছরে কোম্পানিটির ৭০০ কোটি টাকা কর-পরবর্তী লোকসান হয়েছে। ২০১৭ সালের ডিসেম্বর শেষে সানম্যান গ্রুপের বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের কাছে বিএফআইসির ঋণের পরিমাণ ছিল ৬২১ কোটি টাকা, যার পুরোটাই খেলাপি।
বিআইএফসির ঋণ কেলেঙ্কারির মামলায় দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক) ২০১৯ সালে মেজর (অব.) আবদুল মান্নানসহ সংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধে দুটি মামলা করে। মামলায় বিআইএফসি থেকে প্রতারণার মাধ্যমে দুটি প্রতিষ্ঠানের নামে ঋণ অবমুক্ত করে ৪৩ কোটি ১৫ লাখ টাকা আত্মসাতের অভিযোগ করা হয়। দুদকের অনুসন্ধানে জানা যায়, ক্লিক টু ডিজাইনের নামে জালিয়াতির মাধ্যমে বরাদ্দ অতিরিক্ত টাকার ইস্যুকৃত চেকগুলোর অধিকাংশ অর্থই ক্লিক টু ডিজাইনের পরিবর্তে বিআইএফসির সাবেক চেয়ারম্যান মেজর (অব.) আবদুল মান্নানের স্বার্থসংশ্লিষ্ট বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান—সানম্যান ইন্ডাস্ট্রিয়াল করপোরেশন, বাংলালায়ন কমিউনিকেশনস, সানম্যান ফার্মাসিউটিক্যালস ও গোল্ডেন হরাইজনের অনুকূলে সরাসরি গেছে। অনুসন্ধানে প্রাপ্ত তথ্যের ভিত্তিতে মামলার এজাহারে বলা হয়েছে, জালিয়াতির মাধ্যমে উত্তোলিত টাকার মূল সুবিধাভোগী মেজর (অব.) আবদুল মান্নান। তিনি সংশ্লিষ্ট এ অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডের সঙ্গে প্রত্যক্ষভাবে জড়িত।
প্রতিবেদনটি তৈরিতে সহায়তা করেছেন বণিক বার্তার নোয়খালী প্রতিনিধি সুমন ভৌমিক










