দুর্নীতি দমন কমিশনের (দুদক) চেয়ারম্যান মোহাম্মদ মঈনউদ্দীন আবদুল্লাহ ও দুই কমিশনার মো. জহুরুল হক ও মোছা. আছিয়া খাতুন পদত্যাগ করেছেন। মঙ্গলবার (২৯ অক্টোবর) দুপুর সোয়া দুইটার দিকে তারা অফিস ত্যাগ করেন। এর আগে পদত্যাগপত্র জমা দেন তারা। তিন শীর্ষ কর্মকর্তার ব্যক্তিগত সহকারী (পিএস) ও দুদকের জনসংযোগ বিভাগ বণিক বার্তাকে এ তথ্য নিশ্চিত করেছে। তবে দুদকের মুখপাত্র মহাপরিচালক (প্রতিরোধ) মো. আক্তার হোসেন এই বিষয়ে কোনো মন্তব্য করেননি।

দুদকের একজন উচ্চপদস্থ একজন কর্মকর্তা বণিক বার্তাকে বলেন, ‘পদ শূন্য না হলে সার্চ কমিটি গঠন করা যায় না। মন্ত্রিপরিষদ বিভাগ থেকে আভাস পেয়েই তিন শীর্ষ কর্মকর্তা পদত্যাগপত্র জমা দিয়েছেন। আজ সার্চ কমিটিও গঠন হয়েছে। আগামী সপ্তাহের মধ্যেই নতুন কমিশন নিয়োগ হয়ে যাবে। শনিবার রাতেই প্রজ্ঞাপন প্রকাশ করা হতে পারে। রোববার নতুন কমিশন যোগ দিতে পারে।’

দুদক সূত্রে জানা গেছে, অফিস ত্যাগের আগে তিন শীর্ষ কর্মকর্তা মহাপরিচালকদের সঙ্গে কুশল বিনিময় করেন। তখন সেখানে দুয়েকজন পরিচালকও ছিলেন। শীর্ষ তিন কর্মকর্তার পদত্যাগে এক ধরনের আতঙ্কও তৈরি হয়েছে দুদকে। অনেকেই বদলির চিন্তায় পড়েছেন। নতুন কমিশন এসে কীভাবে দুদককে সাজাবে সে চিন্তায় তারা অস্থির। এ কমিশনের কাছের লোক হিসেবে পরিচিতদের মাঝে বেশি আতঙ্ক বিরাজ করছে। এছাড়া দুদকের নিজস্ব জনবল থেকে পদোন্নতি পাওয়া মহাপরিচালক শিরিন পারভীন আগামী ৩০ নভেম্বর অবসরে যাবেন। মহাপরিচালক পদে পদোন্নতির দৌড়ে এগিয়ে থাকা চেয়ারম্যানের কাছের লোক হিসেবে পরিচিতদের মাঝেও হতাশা বিরাজ করছে।

শীর্ষ তিন কর্মকর্তার অফিস ত্যাগের সময় বণিক বার্তার এ প্রতিনিধি তখন দুদকে অবস্থান করছিলেন। তিনি দেখেন কমিশনার (তদন্ত) মো. জহুরুল হক দুদক ভবনের নিচতলার জরুরি গেট (লাল গেট) দিয়ে দ্রুতগতিতে বেরিয়ে যান। সেখানে তার গাড়ি আগে থেকেই প্রস্তুত ছিল। কমিশনার (অনুসন্ধান) মোছা. আছিয়া খাতুন নিচতলার প্রশাসন শাখার সামনের গেট দিয়ে বের হন। তার আগে তিনি সচিবের সঙ্গে দেখা করেন। তখন তার সঙ্গে থাকা ব্যক্তিগত সহকারী কামরুজ্জামানের কাছে জানতে চাইলে তিনি বণিক বার্তাকে বলেন, ‘স্যারেরা বাড়ি যাচ্ছেন!’

একই বিষয়ে দুদকের কয়েকজন জানান, কমিশনার (অনুসন্ধান) মোছা. আছিয়া খাতুন সচিব খোরশেদা ইয়াসমীনকে জড়িয়ে ধরে কাঁদেন। দুই কমিশনার একসঙ্গে পাঁচতলা থেকে নিচতলায় নামেন। তারপর সামনের গেট দিয়ে চেয়ারম্যান অফিস ত্যাগ করেন। তিনি আজ ভবনের সামনের লিফট ব্যবহার করেছেন। চেয়ারম্যান ও কমিশনার (তদন্ত) তাদের মেয়াদ শেষ করতে চেয়েছিলেন। তারা থাকার অনেক চেষ্টাও করেছেন।

প্রেষণে আসা দুদকের একজন মহাপরিচালক বণিক বার্তাকে বলেন, দুপুরে হঠাৎ চেয়ারম্যানের দপ্তর থেকে দেখা করতে বলা হয়। সেখানে গিয়ে অন্যান্য মহাপরিচালকদেরও সেখানে দেখি। তিন স্যারই স্বাভাবিক ছিলেন।

দুদক সূত্রে জানা গেছে, পদত্যাগপত্র মন্ত্রিপরিষদ বিভাগ রাষ্ট্রপতির কাছে পাঠিয়েছে। ব্যক্তিগত কারণ দেখিয়ে পদত্যাগ করেছেন তিন কর্মকর্তা। পদত্যাগ করার আগে সকালে তারা তাদের দাপ্তরিক কাজও করেন। বিকালে তাদের দুদক সংস্কার কমিশনের সঙ্গে বৈঠক করার কথাও ছিল। তবে দুপুর একটার দিকে সংস্কার কমিশন কর্তৃক বৈঠক স্থগিত করার খবর আসে। মূলত এর পরই পদত্যাগ করার বিষয়ে তারা চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেন বলে দুদকের একাধিক ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা জানিয়েছেন।

দুদক আইনে আছে, কোনো কমিশনার রাষ্ট্রপতির কাছে এক মাসের লিখিত নোটিস পাঠিয়ে পদত্যাগ করতে পারবেন। তবে চেয়ারম্যান ছাড়া অন্য পদত্যাগকারী কমিশনাররা ওই নোটিসের একটি অনুলিপি অবগতির জন্য চেয়ারম্যানের কাছে জমা দেবেন। এ বিষয়ে চেয়ারম্যানের ব্যক্তিগত সহকারী ফজলুল জাহিদ পাভেল বণিক বার্তাকে বলেন, ‘তিনি তাদের পদত্যাগের অনুলিপি পেয়েছেন।’

দুদক আইনে আছে, পদত্যাগপত্র আনুষ্ঠানিকভাবে গৃহীত না হওয়া পর্যন্ত রাষ্ট্রপতি প্রয়োজন মনে করলে পদত্যাগকারী কমিশনারকে তার দায়িত্ব পালনের জন্য অনুরোধ করতে পারবেন। পদশূন্য হওয়ার ৩০ দিনের মধ্যে রাষ্ট্রপতি উপযুক্ত ব্যক্তিকে শূন্য পদে নিয়োগ দেবেন।

দুর্নীতি দমন কমিশন একজন চেয়ারম্যান ও দুজন কমিশনারের সমন্বয়ে গঠিত। দুদক আইন ২০০৪ এর ৭ ধারা অনুযায়ী গঠিত বাছাই কমিটির সুপারিশক্রমে রাষ্ট্রপতি পাঁচ বছর মেয়াদের জন্য কমিশনারদের নিয়োগ দেন।

প্রধান বিচারপতি সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগ থেকে একজন ও হাইকোর্ট বিভাগ থেকে একজনসহ মোট দুজন বিচারপতিকে বাছাই কমিটির সদস্য হিসেবে মনোনয়ন দেবেন। এছাড়া বাংলাদেশের মহা হিসাব-নিরীক্ষক ও নিয়ন্ত্রক (সিএজি), সরকারি কর্ম কমিশনের (পিএসসি) চেয়ারম্যান ও অবসরে যাওয়া সব শেষ মন্ত্রিপরিষদ সচিব বাছাই কমিটির সদস্য হবেন।

যদি ওই ধরনের অবসরপ্রাপ্ত মন্ত্রিপরিষদ সচিবকে না পাওয়া যায় অথবা তিনি বাছাই কমিটির সদস্যপদ গ্রহণে অসম্মত হন, তাহলে সর্বশেষ অবসরে যাওয়া মন্ত্রিপরিষদ সচিবের আগে অবসরে যাওয়া মন্ত্রিপরিষদ সচিব সদস্য হবেন। যদি সেটাও পাওয়া না যায় অথবা তিনি বাছাই কমিটির সদস্য হতে অসম্মত হন, তাহলে বর্তমানে কর্মরত মন্ত্রিপরিষদ সচিব সদস্য হবেন।

বাছাই কমিটির সভাপতি হবেন প্রধান বিচারপতি মনোনীত সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগের বিচারক। ন্যূনতম চারজন সদস্যের উপস্থিতিতে বাছাই কমিটির কোরাম গঠিত হবে। বাছাই কমিটির সাচিবিক দায়িত্ব পালন করবে মন্ত্রিপরিষদ বিভাগ। কমিশন গঠনের জন্য বাছাই কমিটি ছয়জনের নাম রাষ্ট্রপতির কাছে প্রস্তাব করবে। রাষ্ট্রপতি তিনজন কমিশনারকে নিয়োগ দেবেন। তাদের মধ্যে একজন চেয়ারম্যান ও দুজন কমিশনার পদে নিয়োগ পাবেন।

রাষ্ট্রপতি তিনজন কমিশনার থেকে একজনকে চেয়ারম্যান পদে নিয়োগ করে থাকেন। চেয়ারম্যান কমিশনের সভার সভাপতিত্ব করেন এবং তার অনুপস্থিতিতে চেয়ারম্যান কর্তৃক মনোনীত কোনো কমিশনার সভায় সভাপতিত্ব করেন। চেয়ারম্যানসহ দুজন কমিশনারের উপস্থিতিতে সভার কোরাম গঠিত হয়।

কমিশন আইনে কমিশনারদের মেয়াদকালের নিশ্চয়তা বিধান করে বলা হয়েছে, ‘সুপ্রিম কোর্টের একজন বিচারক যেরূপ কারণ ও পদ্ধতিতে অপসারিত হইতে পারেন, সেইরূপ কারণ ও পদ্ধতি ব্যতীত কোনো কমিশনারকে অপসারণ করা যাইবে না’। এছাড়া মেয়াদ শেষে তারা পুনর্নিযুক্ত হওয়ার যোগ্য হবেন না।

দুদকের চেয়ারম্যান ও কমিশনার যথাক্রমে সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগ ও হাইকোর্ট বিভাগের বিচারকের সমান মর্যাদা ও সুযোগ-সুবিধা ভোগ করেন।