হাইওয়ে পুলিশের তথ্যানুযায়ী, ঢাকা-মাওয়া এক্সপ্রেসওয়েতে গত এক বছরে ১৩৫টি দুর্ঘটনায় প্রাণ গেছে ১৩১ জনের। এছাড়া অন্যান্য ঘটনায় আহত হয়েছেন অন্তত দেড় হাজারের বেশি মানুষ। মূলত যানবাহনের মাত্রাতিরিক্ত গতি, লাইসেন্সবিহীন অদক্ষ চালক, ফিটনেসবিহীন গাড়ি ও হেলমেটবিহীন দ্রুতগতির মোটরসাইকেল চলাচলসহ ফুট ওভারব্রিজ ব্যবহারে মানুষের অনিহার কারণে উদ্বেগজনক হারে বেড়েছে দুর্ঘটনা। তাই এবারের ঈদ যাত্রায় অনাকাঙ্ক্ষিত দুর্ঘটনা এড়াতে নজরদারি বৃদ্ধি করেছে পুলিশ।

আজ শনিবার (৬ এপ্রিল) সকালে সরেজমিনে ঢাকা-মাওয়া বঙ্গবন্ধু এক্সপ্রেসওয়ে ঘুরে দেখা গেছে, মহাসড়কের গুরুত্বপূর্ণ বিভিন্ন স্থানে চেকপোস্ট বসিয়ে স্পিডগানের মাধ্যমে যানবাহনের গতি মনিটরিং করছে হাঁসাড়া হাইওয়ে পুলিশ। দুর্ঘটনাসহ চুরি, ছিনতাইয়ের মতো ঘটনা এড়াতে একাধিক স্থানে সিসিটিভি স্থাপন করে নজরদারি চলছে। সব মিলিয়ে এক্সপ্রেসওয়েতে ৬টি পয়েন্টে সতর্ক অবস্থানে রয়েছে পুলিশ।

হাঁসাড়া হাইওয়ে পুলিশের পরিসংখ্যান অনুযায়ী, ২০২৩ সালের মার্চ থেকে চলতি বছরের ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত এক বছরে ঢাকা থেকে ভাঙা পর্যন্ত ৫৫ কিলোমিটার মহাসড়কে ১৩৫টি সড়ক দুর্ঘটনায় প্রাণ গেছে ১৩১ জনের। এর মধ্যে ঢাকা-মাওয়া ৩২ কিলোমিটার অংশে ৭২টি দুর্ঘটনায় মারা গেছেন ৬৪ জন ও গুরুতর আহত হয়েছে ৭৮ জন। অন্যদিকে জাজিরা থেকে ভাঙ্গা পর্যন্ত ২৩ কিলোমিটার অংশে ৬৩টি দুর্ঘটনায় ৬৭ জন নিহত ও গুরুতর আহত হয়েছেন ৯৪ জন। এসব দুর্ঘটনায় মামলা হয়েছে ৫৭টি ও জিডি ১৫টি।

এক্সপ্রেসওয়েতে নিয়মিত এমন দুর্ঘটনায় আতঙ্ক বেড়েছে এই পথে যাতায়াতকারী যাত্রীদের। অনেকের অভিযোগ শৃঙ্খলা মেনে যানবাহন না চলায় বৃদ্ধি পাচ্ছে দুর্ঘটনা। 

পদ্মা সেতুর মাওয়া প্রান্তের টোল প্লাজা এলাকায় কথা হয় পরিবারসহ ফরিদপুরের গ্রামের বাড়ির উদ্দেশে রওনা দেয়া মোহাম্মদ আলীর সঙ্গে। তিনি বলেন, ‘প্রায়ই মহাসড়কে বড় ধরনের দুর্ঘটনা ঘটছে। তবুও যানবাহন চালকদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নিচ্ছে না আইনশৃঙ্খলা বাহিনী। যাত্রীবাহী বাস চালকদের ধীর গতিতে গাড়ি চালাতে বললে কিংবা ওভার ট্রেকিং করতে বাধা দিলে চড়াও হয় আমাদের মতো যাত্রীদের ওপর।’

একই ধরনের মন্তব্য করেছেন রমজান বেপারী, সবুজ মিয়া, সাত্তার কাজী, আকবর হোসেনসহ বেশ কয়েকজন। তাদের মতে, প্রতিবছর ঈদের সময় মহাসড়কে অসংখ্য দুর্ঘটনা ঘটে। এতে স্বজনহারা হয় মানুষ। প্রশাসনের উচিত এইসব বিষয়ে কঠোর ব্যবস্থা নেয়া।

রাজধানীর যাত্রাবাড়ী থেকে শরীয়তপুরে গ্রামের বাড়িতে পরিবার নিয়ে যাচ্ছেন আব্দুল্লাহ আল মামুন। পথে শ্রীনগর ছনবাড়ি বাসস্ট্যান্ড এলাকায় তিনি বলেন, ‘মহাসড়কে সবচেয়ে বেশি দ্রুত গতিতে চলে ব্যক্তিগত যানবাহন ও মোটরসাইকেল। এসব যানবাহনের সঙ্গে গতি বৃদ্ধির প্রতিযোগিতায় দিশেহারা হয়ে উঠেন যাত্রীবাহী বাসের চালকরা।’

তবে দুর্ঘটনায় এড়াতে সর্বোচ্চ প্রস্তুতি নেয়া হচ্ছে বলে জানিয়েছে মুন্সিগঞ্জের হাঁসাড়া হাইওয়ে পুলিশ। মহাসড়কে মোটরসাইকেল চলাচল বন্ধে ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের কাছে অনুরোধ জানিয়ে হাঁসাড়া হাইওয়ে পুলিশের অফিসার ইনচার্জ (ওসি) কাঞ্চন কুমার সিংহ বলেন, ‘মহাসড়কে মোটরসাইকেল এলোমেলো চলাচলের কারণে যানবাহন নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে দুর্ঘটনার শিকার হয় সবচেয়ে বেশি। তাই ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের কাছে অনুরোধ জানাচ্ছি, যদি ঈদের সময়টুকু মহাসড়কের মূল সড়কে মোটরসাইকেল চলাচল বন্ধ রেখে পাশে থাকা সার্ভিস লাইনে চলাচল করতে বাধ্য করা হয়, তাহলে দুর্ঘটনা অনেকটাই নিয়ন্ত্রণে থাকবে।’

তিনি আরো বলেন, ‘মহাসড়কে নির্ধারিত ৮০ কিলোমিটার গতিবেগ রয়েছে যদি কোনো যানবাহন এটি অতিক্রম করে, তাহলে তাৎক্ষণিক মামলা দেয়া হচ্ছে। কিন্তু মোটরসাইকেলের গতি ও হেলমেটবিহীন চালকদের কোনোভাবেই নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব হচ্ছে না। তবুও চেষ্টা থাকবে যাতে কোনো দুর্ঘটনা না ঘটে। এছাড়া সিসিটিভি ফুটেজের মাধ্যমে পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করা হচ্ছে নিয়মিত।’

ওসি কাঞ্চন কুমার সিংহ বলেন, ‘দুর্ঘটনা প্রতিরোধে বিভিন্নভাবে মনিটরিং করা হলেও যানবাহন চালকদের মধ্যে সচেতনতা তৈরি না হওয়ায় পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে হিমশিম খেতে হচ্ছে। মার্চ মাসেও বেশ কয়েকটি সড়ক দুর্ঘটনা ঘটেছে, যেটি অত্যন্ত দুঃখজনক।’

দেশের দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের ২১টি জেলার ঘরমুখো মানুষের চাপ প্রতিদিনই বৃদ্ধি পাচ্ছে এক্সপ্রেসওয়ে ও পদ্মা সেতুতে। এ সময়ের নিরাপত্তা ব্যবস্থা প্রসঙ্গে জেলা পুলিশ সুপার মো. আসলাম খান বলেন, ‘জেলা পুলিশের পক্ষ থেকে মহাসড়কে দুর্ঘটনা ও যেকোনো অপ্রীতিকর পরিস্থিতি এড়াতে সাদা পোশাকসহ প্রায় দুই শতাধিকের বেশি পুলিশ সদস্য মোতায়েন করা হচ্ছে বিভিন্ন পয়েন্টে ও রেলওয়ে স্টেশনে কাছে। এছাড়া মোটরসাইকেল চলাচলের জন্য পদ্মা সেতুর পাশে আলাদা লেন তৈরি করে দেয়া হবে। এক্সপ্রেসওয়েসহ চলমান সব সমস্যার কথা বিবেচনা করে প্রস্তুতি নেয়া হচ্ছে।’

এদিকে জেলা প্রশাসক আবু জাফর রিপন বলেন, ‘ঢাকা ভাঙ্গা ৫৫ কিলোমিটার এক্সপ্রেসওয়ের মুন্সিগঞ্জের অংশে ঈদে যাত্রীদের নিরাপত্তা বিষয়টি গুরুত্ব দিয়ে মনিটরিং করা হবে। পদ্মা সেতু উত্তর থানা কর্তৃপক্ষসহ হাইওয়ে পুলিশের সদস্যরা বিভিন্ন পয়েন্টে নিয়োজিত থাকবে। একই সঙ্গে জেলা গোয়েন্দা বিভাগের সদস্যরা মহাসড়কে চুরি-ছিনতাই বন্ধে নজরদারি বৃদ্ধি করেছে।’